বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, যারা তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি নিয়ে দেশের উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে প্রস্তুত। কিন্তু বৈষম্যের বিরুদ্ধে এত বড় অভ্যুত্থানের পরও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। চলমান চাকরির সার্কুলারগুলোতে চোখ রাখলেই বিষয়টি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে ভূতত্ত্ব (জিওলজি), প্রত্নতত্ত্ব (আর্কিওলজি) এবং এ ধরনের বিশেষায়িত বিষয়ে পঠিত গ্র্যাজুয়েটরা বৈশিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই বৈষম্যের পেছনে লালফিতার দৌরাত্ম্য, পক্ষপাত এবং নীতিগত ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের (জজও)-এর চাকরির বিজ্ঞপ্তি এই বৈষম্যের একটি উদাহরণ। গত ২৭ মার্চ ২০২৫-এ প্রকাশিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (৯ম গ্রেড) পদে ১৫টি শূন্য পদের জন্য পুরকৌশল, তড়িৎকৌশল, পানিসম্পদ কৌশল, পদার্থবিদ্যা, গণিত এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু জিওলজি বা জিওলজিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। এটি কোনোভাবে যৌক্তিক হয়নি, কারণ জিওলজি পাঠ্যক্রমে জিওমর্ফোলজি, হাইড্রোলজি, নদী গবেষণা, পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন (EIA), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে পড়ানো হয়, যা নদী গবেষণার জন্য প্রাসঙ্গিক।

একইভাবে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিয়োগে আর্কিওলজি গ্র্যাজুয়েটদের প্রতি বৈষম্য লক্ষ করা গেছে। আর্কিওলজি পাঠ্যক্রমে মিউজিয়াম, আর্কাইভ, ঐতিহাসিক গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়গুলো বিশদভাবে পড়ানো হলেও, সংশ্লিষ্ট পদে তাদের আবেদনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এই বৈষম্য শুধু যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে না, বরং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং জাতীয় আর্কাইভ ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ সেবার ঘাটতি সৃষ্টি করছে। চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে চলামন এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে গ্র্যাজুয়েটরা প্রতিবাদ জানালেও সরকারের পক্ষ থেকে এর কোনো সদুত্তর ও প্রতিকার মেলেনি।

চাকরির আবেদনে গ্র্যাজুয়েটদের প্রতি বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত অবিচার নয়, এটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার পথে একটি গুরুতর বাধা। জিওলজি, আর্কিওলজি, এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কিন্তু এই বৈষম্য অব্যাহত থাকলে, টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

ইখতিয়ার মাহমুদ

স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
emahmudpress@gmail.com