তোফাজ্জল বিন আমীন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক এক গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন হয়। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয় যান। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় আসনে আসীন হওয়ার পর থেকে একের পর এক আন্দোলন ও ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়নে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপচেষ্টা করছে। যার কিছু নমুনা পত্রপত্রিকার শিরোনাম দেখলে বোঝা যায়। ১১ মার্চের শিরোনাম ‘বেশির ভাগ ছিনতাই ডাকাতি পরিকল্পিত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগই মাস্টারমাইন্ড’ (সূত্র : ১১ মার্চ, ২০২৫, যুগান্তর), ১৮ মার্চের শিরোনাম ‘সামনে বাম পেছনে আওয়ামী লীগ’ (সূত্র : ১৮ মার্চ, ২০২৫, যুগান্তর)।

২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পর থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ এর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ শাসনামলের সব অন্যায় অবিচার ও জুলুমের ফিরিস্তি বর্ণনা করা একটি দুঃসাধ্য কাজ। এমন কোনো হীন অপকর্ম নেই যা তারা করেনি। ভোটাধিকার থেকে শুরু করে বাকস্বাধীনতা হরণ, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, আয়নাঘর তৈরি, গুম, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা, ঋণের নামে ব্যাংক লুণ্ঠন, শাপলা চত্বরে নিরীহ আলেম হত্যা, বিডিআর হত্যা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, শেয়ার কেলেঙ্কারি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে আওয়ামী সরকার।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। তার পরও বাম, রাম আর আওয়ামী দোসররা বলে আগেই ভালো ছিলাম। আগে আমরা ভালো ছিলাম নাকি ভয়ে তটস্থ থাকতার তার কিছু নমুনা এই লেখায় উপস্থাপন করা হলো :

সাগর-রুনি হত্যা : ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সাগর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টিভি এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। এ খুনের ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এ হত্যার বিচার হয়নি।

তনু হত্যা : কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর পাওয়া যায়। এই হত্যার ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তোলে। কিন্তু আজও এর কোনো কূলকিনারা হয়নি।

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সাত খুন একটি বর্বরচিত হত্যাকাণ্ড। সদর উপজেলার লামাপাড়া এলাকা থেকে অপহৃত হন সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব কর্মকর্তা থাকাকালীন তারেক সাঈদ- আরিফ ভাড়ায় খেটে ওই হত্যার ঘটনা ঘটান।

ধর্ষণ : সদ্য পতিত ফ্যাসিবাদী জমানার সাড়ে ১৫ বছরের ফিরিস্তি নয়; মাত্র শেষ ছয় বছরে সাত হাজার শিশুসহ প্রায় ৪৩ হাজারের বেশি নারী ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক লাখ ৩৭ হাজার নারী ও শিশু (সূত্র : ১১ মার্চ, আমার দেশ, ২০২৫)। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের এক জননীকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১০-১২ কর্মী মিলে গণধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৫ বছরের ওই নারীর অভিযোগ, নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ায় তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। (সূত্র : ২ জানুয়ারি, ২০১৯, ডেইলি স্টার বাংলা)

ক্রসফায়ার : দেশে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আওয়ামী সরকার শুরু করে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সিরাজ শিকদার ক্রসফায়ারের শিকার হন। আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে অন্তত এক হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার এ হিসাব বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)। (সূত্র : ৪ নভেম্বর, ২০২৪, প্রথম আলো)

বিশ্বজিৎ হত্যা : ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ চলাকালে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে সকাল ৯টায় প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী শিবির তকমা দিয়ে বিশ্বজিৎ দাসকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

আবরার ফাহাদ হত্যা : আবরার ফাহাদ একটি নাম একটি ইতিহাস। একটি প্রেরণার নাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় হলের একটি কামরায় আটকে রাতভর পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন।

মেজর সিনহা হত্যা : ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টায় কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হন। এ হত্যার ঘটনা তখন দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

পর্দা ও বালিশ কেলেঙ্কারি : ‘ওলট-পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ বিগত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী শাসনামলে অবস্থা এমন ছিল। তবে পাবনার রূপপুর প্রকল্পের বালিশ কেলেঙ্কারি এবং ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারি ঘটনা বেশ আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল। প্রতিটি বালিশের দাম পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং ফ্ল্যাটে ওঠানোর জন্য ৭৬০ টাকা ধরা হয়।

শেয়ার ও ব্যাংক কেলেঙ্কারি : শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে জনতা ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ছিল গা-শিউরে ওঠার মতো। আর ২০১১ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অন্তত এক লাখ কোটি টাকা লুণ্ঠন করা হয়। ফলে কিছু বিনিয়োগকারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

প্রহসনের নির্বাচন : ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী করে ডামি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে। আমরা ভুলপ্রবণ জাতি। উপরোক্ত ঘটনাগুলো আমাদের স্মৃতি থেকে যেন বিস্মৃত হয়ে যায়, সে জন্য ফ্যাসিবাদের দোসরা সাড়ে ১৫ বছরের নিপীড়ন, দুর্নীতি, গুম-খুনের কথা কূটকৌশলে মাত্র সাত মাসে থামাচাপা দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় তৎপর। এদের কথায় কান দিয়ে কেউ কেউ তাদের সাথে সুর মিলাচ্ছে। অথচ কে না জানে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে আমরা সবাই উত্তর কোরিয়ার মতো স্বাধীনতা উপভোগ করেছি! বিগত ১৫ বছরে যা পাইনি তা সাত মাসে পাওয়ার চেষ্টা করছি। কী আজিব জাতি আমরা! আজ ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে দেখা যায় উচ্চকণ্ঠে। কিন্তু ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপরাধে গণধর্ষণের শিকার নারীর পাশে দাঁড়াতে পারিনি আমরা। সিলেটের খাদিজার কথা বেমালুম ভুলে গেছি। দ্রব্যমূলের কথাও ভুলে গেছি। এক হালি পেঁয়াজ ৩০ টাকা করে খেয়েছি, সেটিও ভুলে গেছি। তার পরও অনেকে এখন বলতে শুরু করছেন আগেই ভালো ছিলাম। সত্যি সেলুকাস বিচিত্র এই দেশ।

লেখক : আইনজীবী