১. শব্দের রাজনীতি ও মানচিত্রের নিঃসরণ
ভাষা কেবল যোগাযোগের উপায় নয়, এটি রাজনীতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের বাহক। বিশেষত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ বিশ্বজনমতের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এ কারণে যখন দেখা যায়, ‘প্যালেস্টাইন’ নামটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তখন বুঝতে হয় এটি নিছক ভাষার বিষয় নয়, বরং সুপরিকল্পিত এক সাংস্কৃতিক ও ভূ-রাজনৈতিক নির্বাসন। গাজা, রামাল্লা, নাবলুসের নাম লেখা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো যে প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ড, সে তথ্যটি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলত, একটি জাতির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হচ্ছে সংবাদ শিরোনামের কৌশলে।
২. শব্দচয়ন ও জাতিগত পরিচয়ের অস্বীকার
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছে, তাকে যখন Israel-Gaza war বলা হয়, তখন বিষয়টি যেন একটি রাষ্ট্র বনাম একটি সিটি বা অঞ্চল- এইরকম অনুপাতহীন সম্পর্ক তৈরি করে। অথচ বাস্তবতা হলো, গাজা প্যালেস্টাইনের একটি অংশ। গাজার নাগরিকরা ফিলিস্তিনি। তাই ইসরাইলের হামলা গাজার ওপর নয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর। এই বাস্তবতাকে ভাষার চাতুর্যে আড়াল করা হয়।
‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটির বিলুপ্তি কেবল সাংবাদিকতা বা মিডিয়ার দায় নয়, এটি একটি প্রভাবশালী মতাদর্শিক অবস্থান, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বা অস্তিত্ব স্বীকার না করার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও অধিকাংশ পশ্চিমা রাষ্ট্র ইসরাইলের সমর্থনে যে অবস্থান নিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদমাধ্যমেও সেই প্রভাব অনুপ্রবেশ করেছে।
৩. জাতিসত্তা মুছে ফেলার কৌশল : ইতিহাসের পুনর্লিখন
ইতিহাস মুছে ফেলার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হলো ‘আধুনিক সংবাদপ্রবাহ’। আজ যারা জন্ম নিচ্ছে কিংবা নতুন প্রজন্মের মানুষ যারা মিডিয়াকে তাদের প্রধান তথ্যের উৎস হিসেবে গ্রহণ করছে, তাদের চোখে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটাই অচেনা হতে পারে। কারণ গাজার কথা বললেও বলা হচ্ছে না- Gaza in Palestine। যেমন কেউ যদি বলেন, Kandahar is under attack, তখন বলা হয় in Afghanistan; কিন্তু Gaza is under attack- এই বাক্যে Palestine অনুপস্থিত। এ যেন ‘ডিনায়াল বাই ল্যাঙ্গুয়েজ’। প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশে স্বীকৃত, জাতিসঙ্ঘে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে, সংবাদভাষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্যালেস্টাইন এখন কেবল একটি ‘অদৃশ্য ভূখণ্ড’- যেখানে জনগণ আছে, সংস্কৃতি আছে, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে তার পরিচয় মুছে দেয়া হচ্ছে।
৪. ‘গাজা’ শব্দের ব্যবহারে ফাঁকি ও ভুল পাঠ
গাজা একটি ভূখণ্ড প্যালেস্টাইনের অংশবিশেষ। ইসরাইল যে আগ্রাসন চালাচ্ছে তা কেবল গাজার ওপর নয়, প্যালেস্টাইনের ওপর। কিন্তু যখন বলা হয়, Israel’s war on Gaza, তখন ধারণা হয় যে এটি এক ধরনের প্রতিসাম্য সংঘর্ষ। অথচ বাস্তবে গাজার হাতে না আছে বিমান, না আছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ইসরাইল একতরফাভাবে বিমান হামলা, অবরোধ, বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে; শিশু, নারী, চিকিৎসক, সাংবাদিক কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।
এই একতরফা হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞকে ‘যুদ্ধ’ বলাও ভাষার বড় বিভ্রান্তি। যুদ্ধ হয় তখনই, যখন দু’টি পক্ষ সমান শক্তি নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু এখানে আমরা যা দেখছি তা হলো- একটি পরাশক্তিশালী রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। এটি war নয়, বরং genocide, ethnic cleansing।
৫. মিডিয়া ন্যারেটিভ ও মুসলিমবিশ্ব
সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো- অনেক মুসলিম দেশের সংবাদমাধ্যমও পশ্চিমা মিডিয়ার এই শব্দচয়ন ও কাঠামো অনুকরণ করছে। পাকিস্তানের Dawn কিংবা মিসরের Al-Ahram থেকেও Israel-Gaza conflict : শিরোনাম বের হচ্ছে। যেন তারাও Palestine শব্দটি উচ্চারণে ভয় পায়। ফলে এক ধরনের বৈশ্বিক মিডিয়া কনসেনসাস তৈরি হয়েছে, যেখানে প্যালেস্টাইনকে মুছে ফেলে শুধু শহর ও জনপদের নাম উচ্চারিত হয়- তা-ও নিরপেক্ষতার ভান রেখে।
৬. এই অনুপস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্য
‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটির এই অনুপস্থিতি নিছক কাকতালীয় নয়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, যাতে একটি জাতির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ধীরে ধীরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বিলুপ্ত হয়। এটি উপনিবেশবাদের নতুন ভাষা- যেখানে শাসন করা হয় শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, ভাষার দখল নিয়েও।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার এই ভূমিকা ইতিহাসের এক ভয়াবহ বিকৃতি। এটি শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের পাঠও বিকৃত করে। যদি আজকের মিডিয়া ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি মুছে দেয়, তাহলে ৫০ বছর পর ইতিহাসপাঠে প্যালেস্টাইন কেবল একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবেই থেকে যাবে- এটি কোনো স্বাধীন জাতির লড়াই হিসেবে মনে থাকবে না।
৭. ভাষার প্রতিরোধ গড়ে তোলা
আমরা যদি সত্যিই ন্যায়বিচার, মানবতা ও সত্যপথে দাঁড়াতে চাই, তাহলে আমাদের প্রতিরোধ শুরু করতে হবে ভাষা দিয়ে। আমরা বলতে পারি, লিখতে পারি, উচ্চারণ করতে পারি ‘প্যালেস্টাইন’। আমরা জোর গলায় বলতে পারি- ‘ইসরাইলের গণহত্যা চলছে প্যালেস্টাইনের গাজায়’, ‘এটি যুদ্ধ নয়, বরং জাতিনিধন’, ‘গাজার শিশুরাও প্যালেস্টিনিয়ান নাগরিক’।
প্যালেস্টাইন কোনো নিষিদ্ধ শব্দ নয়। এটি এক জাতির অস্তিত্ব, আত্মপরিচয়, স্বপ্ন ও সংগ্রামের নাম। মিডিয়ার আগ্রাসী কৌশলের বিপরীতে আমাদের দাঁড়াতে হবে সত্যের শক্তিতে, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে।
একটি শিশুর মৃত্যু, একটি স্কুলের ধ্বংসস্তূপ, একটি ধোঁয়ায় ভরা শহরের আর্তনাদ সবই হচ্ছে এক জাতির ওপর চালানো গণহত্যার প্রতিচ্ছবি। প্যালেস্টাইন এখনো বেঁচে আছে তার জনগণের আত্মত্যাগে, প্রতিবাদে এবং সেসব মানুষের কলমে- যারা এখনো সাহস করে লিখতে জানে : ‘এটি গাজা নয়, এটি প্যালেস্টাইন’।
লেখক : কলামিস্ট
bbqif1983@gmail.com