ওয়ালিউল হক
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ একটি ঐতিহাসিক দিন। সে দিন ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির উদ্দেশে একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুগত বুদ্ধিজীবীরা ওই বক্তৃতাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের সাথে তুলনা করলেও অন্যরা তা মানতে রাজি নন। তারা মনে করেন, ভাষণটি বৈপরীত্যে ভরা। মজার ব্যাপার হলো, ওই ভাষণে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষও খুশি হয়েছিলেন যা কি না পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেইন রাজা তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন।
৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিব কী বলবেন তা নিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল। গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, শেখ মুজিব (UDI) করবেন অর্থাৎ একতরফাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। সে কারণে বিদেশ থেকেও অনেক সাংবাদিক এসেছিলেন জনসভার খবর সংগ্রহের জন্য।
শেখ মুজিব তার ভাষণে কী বলবেন তা নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে আলোচনার পাশাপাশি যুব নেতৃবৃন্দের সাথেও বিস্তারিত আলোচনা করেন। ড. কামাল হোসেন তার ‘মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল’ বইয়ে ওই সময়কার ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার বিপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছিল এই যুক্তিতে যে, ওই ধরনের ঘোষণা দেয়া হলে সামরিক বাহিনী সেনা অভিযান চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।
কিন্তু দলের চরমপন্থী যুব ও ছাত্রনেতারা স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল দেশকে স্বাধীন করার এটিই সুবর্ণ সুযোগ, যা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
শেখ মুজিব বুঝতে পারছিলেন না তার কী করা উচিত। কারণ প্রেসিডেন্ট ইয়াহহিয়া খান ৬ মার্চ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের আদেশ দিতে পারেন বলে হুমকি প্রদান করেন। সে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার ‘Witness to Surrender’ বইয়ে উল্লেখ করছেন। তিনি লিখেছেন, ৬ তারিখ দিবাগত রাতে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত জিওসির বাসভবনে দুই ব্যক্তি আসেন এবং তারা নিজেদের শেখ মুজিবের বিশেষ দূত হিসাবে পরিচয় দিয়ে বলেন, শেখ সাহেব দলের চরমপন্থীদের প্রচণ্ড চাপের মুখে আছেন। তারা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য শেখ মুজিবকে চাপ দিচ্ছেন। চরমপন্থীদের দাবি প্রত্যাখ্যান করার মতো শক্তি শেখ মুজিবের নেই। ভালো হয় যদি সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে সেনানিবাসে নিয়ে আসে। তখন জিওসি জবাব দেন, আমি নিশ্চিতভাবেই জানি শেখ মুজিবের মতো একজন জনপ্রিয় নেতা ভালোভাবেই জানেন কিভাবে চাপ সামাল দিতে হয়। তাকে দিয়ে তার মতের বিরুদ্ধে কিছু করানো যাবে না। তাকে বলবেন, চরমপন্থীদের রোষ থেকে তাকে বাঁচাবার জন্য আমি সেখানে (রমনা রেসকোর্সে) থাকব। তবে তাকে এ কথাও বলে দেবেন যে, দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কিছু বললে আমি আমার ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সব কিছু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব বিদ্রোহীদের হত্যা করতে। প্রয়োজনে ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবো। তখন শাসন করার মতো কেউ যেমন থাকবে না তেমনি শাসন করার মতোও কিছু থাকবে না।
যে জিওসির কাছে শেখ মুজিব বার্তাবাহক পাঠিয়েছিলেন তার নাম হচ্ছে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেইন রাজা। খাদিম হোসেইন রাজা তার লেখা ‘a stranger in my own country’ বইয়ে ওই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, ৬ মার্চ সন্ধ্যার সময় এক ভদ্রলোক ঢাকা সেনানিবাস জিওসির বাসভবনে আসেন এবং নিজেকে শেখ মুজিবের বিশেষ দূত হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জিওসিকে জানালেন, শেখ মুজিব চরমপন্থীদের চাপের মুখে আছেন। তারা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য শেখ মুজিবকে চাপ দিচ্ছেন। শেখ মুজিব একজন দেশপ্রেমিক নেতা, তিনি চান না পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিতে। সে কারণে শেখ মুজিব চান, তাকে যাতে নিরাপদ হেফাজতে এনে ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়। তাকে নিরাপদে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসার জন্য একটি সেনাদল পাঠানোর জন্যও তিনি অনুরোধ জানান।
খাদিম হোসেইন রাজা শেখ মুজিবের পাঠানো বার্র্তাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেননি এই যুক্তিতে যে, শেখ মুজিবের বাসা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকরা পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখান থেকে তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে আনতে যাওয়া পাগলামির নামান্তর হতো এবং তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনত। তার ধারণা হয়েছিল, একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সেনাবাহিনী কী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে সেটা আন্দাজ করার জন্যই ওই বার্তাবাহককে পাঠানো হয়েছিল। মেজর জেনারেল রাজা বার্তাবাহককে বলেন, আমি নিশ্চিতভাবে জানি শেখ মুজিব একজন দেশপ্রেমিক। কলকাতায় ছাত্রনেতা হিসাবে পাকিস্তান আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। যে ব্যক্তি পাকিস্তান সৃষ্টিতে সাহায্য করেছেন তিনি কিভাবে তা ধ্বংস করবেন? তবে তিনি যদি আতঙ্কিত বোধ করেন তা হলে তিনি আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তিনি গাড়ি নিয়ে চলে এলেই হবে। ক্যান্টনমেন্ট যেহেতু তার পরিচিত এলাকা সে কারণে তাকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠানোর দরকার নেই। শেখ মুজিব অবশ্য ওই জবাবে হাল ছাড়েননি। তিনি আবার রাত ২টার সময় দুই ব্যক্তিকে পাঠান জিওসির বাসায়। তারা আবারও তার দৈহিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানান।
তখন খাদিম হোসেইন রাজা তাদেরকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, শেখ সাহেবকে জানাবেন তার ভাষণের সময় ট্যাংক ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুত থাকবে। রেসকোর্সে শেখ মুজিব যে ভাষণ দেবেন তা সরাসরি শোনার ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে। শেখ মুজিব যদি দেশের অখণ্ডতার ওপর আঘাত হেনে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তাহলে আমি আমার সব শক্তি নিয়ে সভাস্থলে আঘাত হানব। প্রয়োজনে ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবো।
সিদ্দিক সালিক ও খাদিম হোসেইন রাজার লেখাকে অনেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রপাগান্ডা হিসাবে মনে করতে পারেন। কিন্তু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মুরুব্বি ও ইত্তেফাক পাত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বড় ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন-এর লেখা থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব আসলেই জীবন নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। মইনুল হোসেন তার Bangladesh Tragedy of Deceit and Duplicity বইয়ে ৭ মার্চ সকালে শেখ মুজিবের সাথে তার সাক্ষাতের যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে বোঝা যায়, শেখ মুজিব তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। মইনুল হোসেন জানান, ৭ মার্চ সকালে তিনি বঙ্গবন্ধুর বাসায় যান। তখন তিনি দেখেন বঙ্গবন্ধু তার বিছানায় শুয়ে কোনো কিছু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই বাক্যটা তাকে বলতেই হবে। এ কথা শোনার পর মইনুল হোসেন ঘাবড়ে যান এবং বলেন, এ কথা বলার পর আপনি যেমন বাসায় ফিরতে পারবেন না তেমনি আমিও আর ইত্তেফাক অফিসে ফিরতে পারব না। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, যা-ই হোক আমি যদি এই কথা না বলি তাহলে আমি আর জীবিত অবস্থায় বাসায় ফিরতে পারব না। তার ওই কথা শোনার পর মইনুল হোসেন বুঝতে পারেন যে বাইরের চরমপন্থীরা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে তার জীবন ও নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিবের জীবনের ওপর ওই হুমকি সৃষ্টিকারীরা কারা ছিল? কাদের ভয়ে শেখ মুজিব তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। সাংবাদিক শামসুদ্দীন পেয়ারার লেখা ‘আমি সিরাজুল আলম খান’ বই থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) পক্ষ থেকেই ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাক্যটি দিয়ে বক্তৃতা শেষ করার জন্য শেখ মুজিবকে বলা হয়েছিল। সে সময় বিএলএফের নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। তা হলে কি এটা ধারণা করা অসঙ্গত হবে যে, বিএলএফের তরফ থেকেই শেখ মুজিবকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল?