আবদুর রহমান

গত বছর ৫ আগস্ট প্রথাগত রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ছাত্র-জনতার কাছে শেখ হাসিনা ও তার আশ্রয়দাতা ভারতের চানক্যবাদী রাজনীতিকদের চরম রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। এ পরাজয় তারা হজম করতে পারেনি। ফলে তারা বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান ও বিষোদ্গার আরো তীব্র করেছে। এটি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শেখ হাসিনা যেমন ১৫ বছরেও জনগণের মনোভাব বুঝতে পারেননি তেমনি তার মদদদাতা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধীদল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ রাজনীতিকরাও বুঝতে না পেরে কেয়ারফুলি কেয়ারলেস থাকায় ছাত্র-জনতার ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কারণ ও ফলাফল মূল্যায়ন করতে পারেননি।

শেখ হাসিনা বিরোধীদলগুলোর দাবি না মেনে ভারতের সহায়তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ২০০৭ সালের মতো ম্যানেজ করে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ডামি নির্বাচন করেন। আজীবন ক্ষমতায় থাকার লোভে তিনি অন্ধ হয়েছিলেন; বরং বিরোধীদলগুলোর দাবি মেনে পদত্যাগ করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে অন্তত ৬০-৭০টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে রাজনীতির মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে পারতেন। তাহলে তাকে যেমন পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হতো না তেমনি তার দল আওয়ামী লীগকেও ৭৬ বছরের মধ্যে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না। তিনি পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ থেকে অস্তমিত সূর্যের মতো মুছে গেছেন। পৃথিবীতে একমাত্র ভারতীয়রাই অস্তমিত সূর্যকে প্রণাম জানায়।

ইরানের শাহ রেজা পাহলভি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি ১৯৭৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সিংহাসনচ্যুত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে আশ্রয় দেয়নি।

আজীবন ক্ষমতায় থাকার হীনউদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা তারই ১৯৯৪-৯৬ সালের আন্দোলনের ফসল নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার লোভে সাংবিধানিক ক্ষমতা অধিগ্রহণ করেন। তার সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সব দলের বর্জনের মুখে যখন ভণ্ডুল হতে বসেছিল তখনই ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নির্বাচন সফল করতে তার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দুই দিনের মিশনে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি এসে বিভিন্ন বিরোধী দল ও জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নির্বাচনে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ১৫৪টি আসনে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সফল করে ঢাকা ত্যাগ করেন। ২০১৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখায় শেখ হাসিনা বিরোধী দল ও জনগণকে বঞ্চিত করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও জয়ের হ্যাটট্রিক করার মাধ্যমে ভারতের নিযুক্ত ভাইসরয়ে পরিণত হন।

ভারতের কংগ্রেস বা বিজেপি যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের সমর্থন বাংলাদেশের প্রতি নয়, শেখ হাসিনার প্রতি থাকার কারণেই হাসিনা স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন যার খেসারত জনগণকে দিতে হয়েছে, এখনো দিতে হচ্ছে। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা তলানীতে এসে ঠেকেছিল বলেই তাকে ক্ষমতায় রাখতে ভারত বারবার বাংলাদেশের নির্বাচনে গোপনে ও প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করে। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন না বলে ভারত গোপনে হস্তক্ষেপ করেছিল। কারণ ২০১৪ সালের মতো প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করলে তার ফল হিতে বিপরীত হতো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেমন তার দেশের মুসলমানদের পাকিস্তানের দালাল আখ্যায়িত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন তার দলের পক্ষে মেরুকরণ ঘটিয়ে ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় আসেন তেমনি শেখ হাসিনাও বাংলাদেশে তার বিরোধী সংখ্যাগুরু মুসলমানদেরকে পাকিস্তানের দালাল আখ্যায়িত করে তাদেরকে পাকিস্তান চলে যেতে বলে ভারতকে খুশি করেই ক্ষমতায় ছিলেন।

শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের জনগণ চিরকালই অসাম্প্রদায়িক বলেই ভারতের বিজেপির মতো কোনো কট্টরপন্থী দলকে ক্ষমতায় বসানো দূরে থাকুক, বিরোধী দলের মর্যাদাও দেয়নি।

ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কংগ্রেস ১৯৭১ সালের পর আর জয়ী হতে পারেনি। বিজেপিও গত তিনটি নির্বাচনেও সুবিধা করতে পারেনি। অথচ এই দু’টি দলের সরকার শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশের ক্ষমতায় রাখতে পেরেছিল যা আমাদের জন্য লজ্জার। তবে তাদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার হীনউদ্দেশ্য এখন জনগণ বুঝতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার দখলে নেয়ার লক্ষ্যেই যে বাংলাদেশের দেড় কোটি হিন্দুর নিরপত্তা নিয়ে বিজেপির এত মায়াকান্না তা বোধগম্য। বাংলাদেশে দেড় কোটি হিন্দুর স্বার্থকে বিজেপি, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ ব্যাপারে তাদেরকে সহায়তা করছেন শেখ হাসিনার দোসর বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ঐক্য পরিষদ শেখ হাসিনার পক্ষে মাঠে নেমেছিল।

গত সাড়ে ১৫ বছরের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা শেখ হাসিনার মতো তলানিতে ঠেকায় হিন্দুদের স্বার্থ দেখভালের জন্য রাতারাতি ১৩টি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ঐক্যপরিষদের রাজনীতির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যেসব হিন্দু আওয়ামী লীগের সমর্থক নন তাদেরকে তারা হিন্দু মনে করেন না বলেই সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে দেশত্যাগে ও পদত্যাগে বাধ্য করার প্রতিবাদ করেনি ঐক্যপরিষদ। অনেক এমপি ও পুলিশের আইজিসহ ঊর্ধŸতন অনেক কর্মকর্তা হিন্দুদের জমিজমা জোরপূর্বক দখল করলেও ঐক্যপরিষদ তার প্রতিবাদ করেনি। শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের প্রতি ছাত্র-জনতা এতই ক্ষুব্ধ ছিল যে প্রধানমন্ত্রীর অফিস, বাসভবন, জাতীয় সংসদ ভবন ও মন্ত্রীদের বাসভবন সরকারি তথা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি জানা সত্ত্বেও উন্মত্ত জনতা কর্তৃক তা ভাঙচুরের শিকার হয়েছিল। তেমনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হিন্দু মুসলমান সবার ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ থাকায় তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ৫ আগস্ট ভাঙচুর হয়েছিল। এতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো ছাপ ছিল না।

বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ ৯ আগস্ট ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে হিন্দু আওয়ামী নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুরের প্রতিবাদে শাহবাগে মিছিল করে এর ছবি নরেন্দ্র মোদির কাছে পাঠিয়েছিল। মোদি ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বাংলাদেশের দেড় কোটি হিন্দু নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থতার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও জনগণের সমালোচনা করেন।

পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ মুসলমান হলেও কংগ্রেসের ৩০ বছরের শাসনামলে সরকারি চাকরিতে তাদের হিস্যা ছিল মাত্র ২ শতাংশ। বাম ফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনামলে তা ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সাড়ে ১৩ বছরের শাসনামলে তা ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় বিজেপি এটিকে মমতা ব্যানার্জির মুসলমান তোষণ বলে নির্বাচনী ইস্যু করেছিল। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ৯ শতাংশ হলেও সরকারি চাকরি ও ব্যবসায় বাণিজ্যে তারা আনুমানিক ১৮-২০ শতাংশ সুবিধা ভোগ করে আসছে দীর্ঘকাল যাবত। তাই বাংলাদেশীদের সাম্প্রদায়িকতার ট্যাগ লাগানো শেখ হাসিনা ও তার ভারতীয় বন্ধুদেরই সাজে।

নরেন্দ্র মোদি বৈষম্যের শিকার ৮০ কোটি হিন্দুর জীবনমানের উন্নয়ন করতে না পারায় তার হিন্দুত্ববাদের দেয়ালে ফাটল ধরে। ফলে ২০২৪-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হন। এখন বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্ব ভারতীয় ইস্যুতে পরিণত করেছেন সেই ফাটল মেরামত এবং আগামী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্যে।

শেখ হাসিনা ও তার দোসররা গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তার ২০ শতাংশ টাকার গন্তব্যস্থল ছিল ভারত। তাই পালিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলাদেশী লুটেরাদের পুশব্যাক না করে জামাই আদরে রেখেছে দেশটি। শেখ হাসিনার আনুকূল্য পেয়ে বাংলাদেশের দু’টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি হওয়ার সুবাদে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ভারতে পাচারকারী পি কে হালদারকে বাংলাদেশে পুশব্যাক না করে জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ ভোটারবিহীন অথবা নৈশভোটের নির্বাচনী প্রহসনে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা শেখ হাসিনাকে কখনই মেনে নেয়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা বা ভারত সেটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনো তারা হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের দিবাস্বপ্নে মশগুল। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আদৌ নেই। ভারতকে তার শেখ হাসিনামুখী নীতি ছেড়ে বাংলাদেশমুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে। দুই দেশের জন্যই সেটি কল্যাণকর হবে।