ডা: মাহতাব হোসাইন মাজেদ
ঢাকাসহ বাংলাদেশের ৪৫টির বেশি জেলার ওপর দিয়ে এখন তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দিনের গড় তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেছে। ফলে তীব্র গরম অনুভূত হওয়ায় সারা দেশেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ। তীব্র গরমে অস্বস্তি বেড়ে যায়। তাপপ্রবাহে সুরক্ষায় জাতীয় গাইডলাইনে উল্লেøখ করা হয়, ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। যদিও দেশে তাপপ্রবাহ মে এবং জুন মাসে বাড়ে।
এ বছর এপ্রিলের শুরু থেকেই পারদ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। ফলে একপ্রকার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা। তাপপ্রবাহ আমাদের শরীরের জন্য অনেক সময় ক্ষতির কারণ হতে পারে। গরম যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে ততই বাড়ছে অসুস্থতা। প্রচণ্ড গরমে নানারকম অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশু বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে গরমের সময়টা একটু বেশিই বিপজ্জনক। এ সময় ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, পেটের পীড়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ ইত্যাদির পাশাপাশি আরো কিছু স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হয় কমবেশি সবাইকে। এ সময় কিছু সতর্ক পদক্ষেপ নিলে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
এসব সমস্যা থেকে বাঁচতে যা করণীয়
এই গরমে ঘামে শরীর থেকে প্রচুর লবণ-পানি বের হয়ে যায় বলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। সাধারণত এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা গরমের খুবই সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হতে পারে। এ সময় প্রচুর পানি খেতে হবে। লবণের অভাব পূরণ করতে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানি কম হলে প্রস্রাব হলুদ ও পরিমাণে কম হবে এবং জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাবের সংক্রমণ হতে পারে। যে পর্যন্ত না প্রস্রাব স্বাভাবিক রঙ ফিরে পাবে, সে পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি খেয়ে যেতে হবে। পানির সাথে অন্যান্য তরল যেমন- ফলের রস খাওয়া যেতে পারে।
ভাজা-পোড়া, অধিক তেল, মসলাজাতীয় খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। সাধারণ খাবার যেমন- ভাত, সবজি, মাছ ইত্যাদি খাওয়াই ভালো। খাবার যেন টাটকা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
প্রখর রোদে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময়ে খোলা আকাশের নিচে হাঁটাচলা বেশি হলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি ত্বক ভেদ করে কোষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। তাই এ সময়ে বাইরে বেরোলে অবশ্যই সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করতে হবে। ছাতা ব্যবহার করতে হবে। যথাসম্ভব হালকা রঙের কিংবা সাদা রঙের পোশাক পরা গরমের জন্য উত্তম। সব সময় সুতির ঢিলা পোশাক পরতে হবে। শরীরে যাতে ঘাম না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করা যেতে পারে।
গরম এলেই ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। দুই বছরের নিচে শিশুদের ডায়রিয়ার প্রধান কারণ হলো- রোটা ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। রাস্তাঘাটের অধিকাংশ খাবার দূষিত থাকে, তাই গরমে এই দূষিত খাবার খেয়েই অনেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
দেহের পানিস্বল্পতা দূর করতে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করুন। নিরাপদ পানি বললাম, কারণ আজকাল রাস্তার পাশে ফুটপাথে বিভিন্ন পানীয় বিক্রি করা হয় যার বেশির ভাগই স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বেশির ভাগই অনিরাপদ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হয়। যাতে বিভিন্ন ধরনের রোগ জীবাণু থাকে। এসব পানি পান করা যাবে না। শিশুদের টিফিন বক্সের সাথে বোতলে করে নিরাপদ পানি স্কুলব্যাগে দিয়ে দিন। তরমুজ, বেল, কাঁচা আমের জুসসহ লেবু পানীয় পান করতে পারেন। এতে করে আপনার দেহের পানিস্বল্পতা দূর হবে।
গরমে কেউ অজ্ঞান হলে কিংবা হিটস্ট্রোক করলে তার শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করুন। যথাসম্ভব কম তাপমাত্রার ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যান। শরীর ভেজা ঠাণ্ডা কাপর দিয়ে মুছে দিন। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।
অনেকেই আছেন শারীরিক পরিশ্রম করেন। তাদেরকে কাজের জন্য বাইরে যেতেই হয়। সে ক্ষেত্রে যেন শরীরে পানি বা লবণের স্বল্পতা না হয় এই জন্য স্যালাইন খেতে পারেন। বাইরে চলাচলের সময় কাছে স্যালাইন রাখতে পারেন। যদি শরীর দুর্বল মনে হয়, সে ক্ষেত্রে সাথে সাথে স্যালাইন খেয়ে নিতে পারেন। এতে দুর্বলতা কমবে। প্যাকেটের গায়ে নির্দেশিত পরিমাণ পানির চেয়ে কম পানি দিয়ে স্যালাইন খাবেন না।
দিনের যে সময়টিতে সবচেয়ে বেশি সূর্যের তাপ থাকে সে সময় সম্ভব হলে ছায়ায় থাকুন। তাপ এড়িয়ে চলুন এতে করে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো হয় শোয়ার ঘরে। একটু স্বস্তি পেতে শোয়ার ঘরটি ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করুন। তীব্র রোদের সময় দিনের নির্দিষ্ট একটি সময়ে ঘরের পর্দা টেনে রাখুন।
পরিশেষে বলতে চাই, গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বৃদ্ধ এবং শিশুদের বেলায়। তার পরও গরমের কারণে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে অবহেলা করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লেখক : কলামিস্ট