অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় নাগরিক অমর্ত্য সেন যে ভারত সরকারের চিন্তাচেতনার প্রতিনিধিত্ব করেন, জানা ছিল না। ২১ ফেব্রুয়ারি (২০২৫) ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর প্রশ্ন করার ধরন ও অমর্ত্য সেনের জবাব ছিল ভারত সরকারের মুখপাত্রের মতোই। পুরো বিষয়টি আমাদের কাছে পাতানো এবং পরিকল্পিত বলেই মনে হয়েছে। তার জবাবও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। তিনি বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের আগ্রাসী নীতিরই প্রতিফলন ঘটালেন। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত হামলা এবং মন্দির ভাঙার অভিযোগ ভারত সরকারেরই বানানো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ভারত বাংলাদেশকে কোণঠাসা করার জন্য সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়। অথচ বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর বাস্তবে কোনো হামলাই হয়নি। জনতার বিপ্লবের মুখে ভারতীয় চর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার অনুসারী এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী ভারতীয় গুপ্তচররা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করে।
কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যগুরু মুসলিমরা ভারতের সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। মুসলমানরাই হিন্দুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং মন্দির রক্ষায় পালাক্রমে পাহারা দেয়। ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত খবর তাই হালে পানি পায়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এর কোনো প্রমাণ পায়নি। ভারত সরকারই এই ধরনের গুজব প্রচার করছে।
দেশী-বিদেশী সূত্রমতে বৈধ-অবৈধভাবে অজানাসংখ্যক ভারতীয় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। এদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন পরিচয়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে বাংলাদেশে বাস করছে। এদের অধিকাংশই ‘র’ এবং ভারতের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার চর। ইসকন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদসহ ‘র’ পোষিত বিভিন্ন সংস্থার আবরণে বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে। এরা বাংলাদেশে হাজারো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক দুষ্কর্ম চালায় এবং সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশবিরোধী জনমত তৈরি করে। বাংলাদেশকে ভারতভুক্ত করার জন্য এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করে না। ভারতীয় চর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এদের দুষ্কর্মের পরিধি বহু গুণ বেড়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতন ঘটিয়ে হাসিনা যুগের পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশকে সিকিমের মতো দখল করার দুরভিসন্ধির বাস্তবায়ন।
পিটিআই-এর সাথে সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকার একই ধরনের চক্রান্ত ও প্রচারণার ধারাবাহিকতা মাত্র। অমর্ত্য সেনের মতো কথিত মানবতাবাদী সিকিমের মতো একটি অতি ক্ষুদ্র দেশ দখলের একবারও বিরোধিতা তো দূরের কথা, প্রতিবাদও করেননি। এই সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছেন তাও ভারতের আগ্রাসী অভিলাষ বাস্তবায়নেরই অংশবিশেষ। তিনি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে বাংলাদেশে হিন্দুবিরোধী দাঙ্গার মিথ্যা অভিযোগ প্রসঙ্গে কথাই বলতেন না।
আসলে তিনি স্বৈরাচার লুটেরা ও ভারতীয় চরমুক্ত, হাসিনামুক্ত বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে সইতে পারছেন না। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বই তার এবং সতীর্থদের জন্য মাথাব্যথার কারণ। হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে অমর্ত্যরা বাংলাদেশকে ভারতভুক্ত করার যে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেন তা ভেস্তে যাওয়াতেই তিনি মূলত ব্রিবত।
আসলে অমর্ত্য সেনের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নতুন নয়। ১৯৯৯ সালের সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় ব্র্যাক আয়োজিত সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্যে তার বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পায়। পিটিআএ’কে দেয়া বক্তব্য তার সেই একই মানসিকতার নতুন প্রতিফলন।
‘ডেইলি স্টার’ জানায়, ‘বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের মৃত্যুর পরেও শান্তি পায় না। তাদেরকে কবর থেকে তুলে ফেলা হয় নতুনদের (মৃত ব্যক্তি) আগমনের কারণে। এমন একটি দেশে শিল্পায়নের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্কতা নেয়া দরকার।’
কবরস্থ মুসলমানদের কবর বহু বছর পর ভেঙে ফেললে কিভাবে তা একটি দেশকে শিল্পায়নের উপযোগী নয় কিংবা কেন বিনিয়োগকারীকে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা সৃষ্টি করে তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অমর্ত্য মগজে আছে বলে মনে হয় না। মৃত মুসলমানদের কবর দেয়া ধর্মীয়ভাবে আবশ্যিক। খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধসহ বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান প্রধান ধর্মের অনুসারীরাই স্ব স্ব ধর্মীয় রীতিমতে মৃত ব্যক্তিদেরকে কবরস্থ করেন। এই প্রক্রিয়ায় মৃত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হয়। এটি পরিবেশবান্ধব। অর্থনৈতিকভাবেও সাশ্রয়ী। মুসলমানদের কবর ভেঙে ফেলা কেন অমর্ত্য সেনের মাথাব্যথার কারণ হলো তা বোধগম্য নয়।
‘গ্লোবাল হেলথ ইক্যুইটি ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক এই সেমিনারে অমর্ত্য সেন গুলশান ও বারিধারার মতো বনেদি এলাকাকেও যুক্ত করেন। তার মতে, বায়ুদূষণের কারণে ১৯৯৯ সালেই ওই দু’টি এলাকাসহ পুরো ঢাকাই বসবাসের অযোগ্য ছিল। তার ভাষায় : ‘আমি কাউকেই এই ঢাকা শহরে বসবাসের জন্য সুপারিশ করব না, এমনকি অভিজাত গুলশান বা বারিধারাতেও না।’ যদিও ঠিক ওই সময়ে পুরো ঢাকা সম্পর্কে এমন নেতিবাচক জঘন্য মন্তব্য অন্যকোনো অর্থনীতিবিদ তো দূরের কথা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞও করেননি।
অথচ এই অমর্ত্য সেনই ঢাকার চেয়ে শত গুণ বেশি পচা শহর কলকাতায় যুগ যুগ ধরে বসবাস করছেন। ১৯৮৫ সালে রাজিব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কলকাতাকে ডেড সিটি (মৃত শহর) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু অমর্ত্য সেনেরা তাদের মৃত শহরে এখনো বসবাস করছেন। ব্রিটিশ আমলের এই শিল্পনগরী এমন দুর্গন্ধময় ও অপরিচ্ছন্ন শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। পয়ঃনিষ্কাশনজনিত সমস্যা, নিকৃষ্টতম যানজট এবং সন্ত্রাসকবলিত মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য শহর পৃথিবীতে নেই বললেই চলে। অথচ সেই শহরের অমর্ত্য সেন বসবাস করেন। কলকাতার হাজারো সমস্যা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। তার অভিযোগ বাংলাদেশকে নিয়ে। কারণ হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার কারণে তিনি বাংলাদেশকে সইতে পারছেন না।
অমর্ত্যরে নিকটবর্তী গঙ্গা নদীর মৃত মানুষ, কুকুর, বিড়াল, গরু-ছাগল, এমনকি মানুষের পায়খানা-প্রস্রাব ইত্যাদির ভাগাড়। এই দূষিত পানি জলজপ্রাণী এবং পশু-পাখি, এমনকি মানুষের জীবন ধারণের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। এগুলোর সমালোচনা অমর্ত্যরে মুখে কখনো শোনা যায়নি।
কলকাতার বাইরের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ভুয়া পরাশক্তি ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি তো বস্তির শহর হিসেবে পরিচিত। লজ্জা ঢাকার জন্য বস্তিগুলোর চার পাশ উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে দিল্লির লজ্জা বিদেশী কূটনীতিক আর পর্যটকরা না দেখেন, যদিও সংবাদমাধ্যমে কুৎসিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সম্পর্কে সারা বিশ্বই ওয়াকিবহাল। বহু বছর ধরেই এই দিল্লি বসবাসের অযোগ্য। অথচ এমন রাজধানী শহর নিয়েও অমর্ত্যরে কোনো নিন্দা, এমনকি অভিযোগসূচক মন্তব্যও শোনা যায়নি।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে দিল্লিকে পৃথিবীর দূষিত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বায়ু ও পরিবেশদূষণের কারণে দিল্লির বাসিন্দাদের গড় আয়ু প্রায় ১২ বছর হ্রাস পেয়েছে। বিবিসির (২১ নভেম্বর, ২০২৪) ভাষ্যমতে, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দিল্লিবাসী বিষময় পরিবেশে রয়েছেন।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই প্রতিবেদন মতে, কেবল দিল্লিই নয়, পৃথিবীর ১০টি শহরের মধ্যে আটটিই ভুয়া পরাশক্তি ভারতের আটটি রাজ্যে অবস্থিত। এগুলো বিহার, চণ্ডীগড়, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত, যেখানে ৫৪ লাখ ৭০ হাজার মানুষ বাস করেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন মতে, বায়ু ও পরিবেশ দূষণের কারণে এই রাজ্যগুলোর অধিবাসীদের গড় আয়ু ৫ দশমিক ৪ বছর কমে যেতে পারে।
ভারতের এসব রাজ্যে কিংবা শহরাঞ্চলের শিল্পায়ন বন্ধ করা হয়নি। কিংবা কোনো শিল্পাঞ্চল ভেঙে ফেলা হয়নি। বিনিয়োগও বন্ধ হয়নি। অথচ ২৫ বছর আগে অমর্ত্য সেন সারা বাংলাদেশে শিল্পায়নে বিনিয়োগ বন্ধের পক্ষে সতর্ক করেছেন।
অমর্ত্যরে এমন দ্বিচারিতা বাংলাদেশের স্বার্থ ও অস্তিত্ববিরোধিতারই বহিঃপ্রকাশ। অমর্ত্য সেন পিটিআই-এর সাথে সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে হিন্দুবিরোধী দাঙ্গা ও তাদের মন্দির ভাঙার যে ভুয়া অভিযোগ তুললেন, সেই সাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বন্ধ না করার যে পরামর্শ দিলেন এবং সর্বোপরি ভারতের সাথে মিলেমিশে চলার যে অনুরোধ করলেন সবই হলো বাংলাদেশকে ভারতের খোঁয়াড়ে ঢোকানোর চক্রান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরির ফন্দি।
এমন পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই বাংলাদেশবিরোধী অমর্ত্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া উচিত হবে কি না ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অস্বস্তিকর অচলাবস্থা বিরাজ করছে তার পেছনে যে ভারতের চক্রান্তই দায়ী তা বাংলাদেশীরা নিশ্চিতভাবেই জানেন। বন্ধুবেশী কূচক্রীদের খপ্পর থেকে বাংলাদেশকে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে।