মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইল ও হামাসকে এমন একটি চুক্তি মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা গাজাযুদ্ধের অবসান ঘটাবে। সেই সাথে সব ইসরাইলি জিম্মি যাতে মুক্তি পায়। তিনি গত শুক্রবার বলেছিলেনÑ তিনি বিশ্বাস করেন, এক সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যেতে পারে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, একটি চুক্তির সম্ভাবনা প্রবল। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা হয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সময় এসেছে। সরকারকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দিতে কয়েক হাজার ইসরাইলি নাগরিক আবারো রাস্তায় নেমে এসেছেন। তবুও ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের কিছু দিন পরও পরিবেশে একধরনের ‘দেজা ভ্যু’র আভাস ছড়িয়ে আছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩ সাল থেকে ইসরাইল আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে রেখেছে। নেতানিয়াহু গাজাযুদ্ধ ব্যবহার করে অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন কৌশলগত অর্জন নিশ্চিত করেছেন; কিন্তু এখন উচ্ছ্বাসের মধ্যেও এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন তিনি যেখানে গাজা হত্যাকাণ্ড বন্ধে অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে তার ওপর চাপ দেয়া হচ্ছে।
১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ ছিল একটি গেম-চেঞ্জার। মার্কিন হস্তক্ষেপ ছিল ট্রাম্পের জন্য একটি মহাবিজয়ের সমতুল্য, যা তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং এখন ইরানে তার ওয়ার মেশিন যে কৌশলগত অর্জন করেছে, তা যথেষ্ট নয়। গাজাযুদ্ধের অবসান তার জন্য প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেবে। হ্যাঁ, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিয়েছেন। ইরান দুর্বল হয়েছে এবং তার সহযোগীদের বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। সিরিয়ায় একটি নতুন সরকার রয়েছে যা তেলআবিবের সাথে শত্রুতা শেষ করতে আগ্রহী, অন্য দিকে একটি নম্র হিজবুল্লাহকে লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে তার অস্ত্র হস্তান্তরে চাপ দেয়া হচ্ছে।
নেতানিয়াহু আর কী চাইতে পারেন? বাস্তবতা হলো- এসব অর্জনের কোনো অর্থ নেই যদি না এগুলো ইসরাইলি চরম ডানপন্থীদের মহাপরিকল্পনা : গাজা পুনরায় দখল করা এবং এর বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা, পশ্চিমতীরকে সংযুক্ত করা এবং ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে একটি অপমানজনক রাজনৈতিক চুক্তি কার্যকর করা না যায়।
ইরানকে তীব্রভাবে আঘাত করে এবং একপাশে সরিয়ে রাখায় ইসরাইলের মিলিট্যান্ট এনিমি বা উগ্র শত্রুর এখন অভাব রয়েছে। ইরানি নেতাদের তাদের আঞ্চলিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, তাদের জাতীয় অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশের সাথে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করতে হবে। ইরানি জনগণ অবশেষে প্রকৃত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারে তাদের দাবি নবায়ন করবেন। ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্য পুনরুদ্ধার করা খুব কষ্টসাধ্য হবে।
এ দিকে ইসরাইল প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। সর্বোপরি নেতানিয়াহু এবং তার বন্ধুদের জন্য নতুন মধ্যপ্রাচ্যের অর্থ এটি। গাজায় আগুন জ্বালানো বেশ কিছু উদ্দেশ্য পূরণ করবে। এটি ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়ের তদন্ত বিলম্বিত করবে, যা ইসরাইলি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য দায়ী করবে। এর অর্থ হলো- নেতানিয়াহুকে আগাম নির্বাচন দিতে হবে না, যেখানে তার দলের হারার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এটি তার দুর্নীতির মামলার রায় বিলম্বিত করবে, যা তাকে সম্ভাব্য কারাদণ্ড থেকে রক্ষা করবে।
কিন্তু গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পেছনে অন্যান্য উদ্দেশ্য রয়েছে, এমনকি যখন ইসরাইলি সেনাবাহিনী স্বীকার করে যে, তাদের সামরিক লক্ষ্য ফুরিয়ে গেছে। যুদ্ধটি ইসরাইলের রাজনৈতিক লাভ নিশ্চিত করতে একটি ব্ল্যাকমেইল হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যেমন- আব্রাহাম চুক্তি সম্প্রসারণ। এ যুদ্ধ নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী সরকারকে পশ্চিমতীরে দমন, জমি দখল, শরণার্থীশিবির ধ্বংস, ইউএনআরডব্লিউএকে বহিষ্কার এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করায় গতি দিয়েছে।
এ ধরনের লক্ষ্য ওয়াশিংটন ও অন্য পশ্চিমা সরকারগুলো জানে। কিন্তু ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজার ওপর গণহত্যা তীব্রতর করার সময় এসব সরকারের অন্য দিকে তাকানো অমার্জনীয় ও লজ্জাজনক। গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা থেকে কেবল নেতানিয়াহু উপকৃত হবেন। হাজার হাজার গাজাবাসী যখন অনাহারের দ্বারপ্রান্তে তখন মানবিক সাহায্য প্রবেশ করতে দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী শুধু হিব্রু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উপেক্ষা করেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রতিদিন ১০ হাজার সাহায্যপ্রার্থীকে গুলি করছে, যারা তার তৈরি এবং অর্থায়ন করা একটি সংস্থা থেকে জীবন রক্ষাকারী খাবার পেতে চেষ্টা করছে।
নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প, যিনি একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী এবং এমনকি বলেছেন, তিনি চান তার দুর্নীতির বিচার শেষ হোক। তিনি জুলাইয়ে তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তবে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেননি।
এটি বিভিন্ন কারণে ইসরাইলের জন্য শুভকর আঞ্চলিক মুহূর্ত হতে পারে; কিন্তু ইসরাইলের আঞ্চলিক দাঙ্গাবাজ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য অনেক দেশ চিন্তিত হবে। এসব দেশের চিন্তিত হওয়া উচিত। এ দেশগুলোর এটি চিন্তাভাবনা করা উচিত যে, ইরানকে নত করা ভালো হলেও ইসরাইলকে প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত করা আরো খারাপ।
নেতানিয়াহু একবারও ফিলিস্তিনিদের সাথে কয়েক দশক ধরে চলা সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানোর বিষয়টি তার নতুন মধ্যপ্রাচ্য দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যুক্ত করেননি। তিনি একবারও ফিলিস্তিনিদের কিছু প্রস্তাব করেননি। গাজার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি হলো নির্মূল বা বাস্তুচ্যুতির। পশ্চিমতীর সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরো খারাপ। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পান না, তিনি কেবল ইসরাইলের সাথে সম্পূর্ণ সংযুক্তি এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্নের অবসান চান।
ট্রাম্পকে তার আরব মিত্রদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। এ দাবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিলিস্তিনি ট্র্যাজেডির একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী নিষ্পত্তি। নেতানিয়াহুর ডিস্টোপিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি সব ফিলিস্তিনিকে তাদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ দেখতে পায়। তিনি একটি ‘বৃহত্তর ইসরাইলে’ বিশ্বাস করেন, যার জন্য সার্বভৌম আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমি ছাড়াও ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের পুরো অংশ দখল করতে হবে।
ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ শেষে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত- কেননা, এটি হচ্ছে মূল কারণ। কিন্তু নেতানিয়াহু এখন যে উদীয়মান ইসরাইলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা যুদ্ধ ছাড়া থাকতে পারবে না। এমনকি জর্দান ও মিসরের মতো দেশ যাদের সাথে তার শান্তিচুক্তি রয়েছে, এসব দেশকেও সে সন্দেহের চোখে দেখে, অন্য দিকে চরমপন্থী আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যে এ দেশগুলোর বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে।
ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার মতো অবস্থানে আছেন। এখন যেহেতু ইসরাইল এ সব কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে, তাই ইসরাইলের প্রতিবেশীদের উদ্বেগ নিরসনেও প্রস্তুত থাকতে হবে। এ উদ্বেগগুলোর শীর্ষে রয়েছে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা। এটি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু এ পর্যায়ে কেবল ট্রাম্প উচ্ছ্বসিত নেতানিয়াহুকে দমন করতে পারেন। যদি অন্য সবকিছু ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ব গাজার হত্যাকাণ্ডের দিকে উদাসীনভাবে তাকিয়ে থাকবে, যখন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের এবং তাদের উদ্দেশ্য ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
লেখক : আম্মানের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার;
আলজাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন
আহমদ মতিউর রহমান