দেশে হঠাৎ করে রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি কিছুটা সামাজিক অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার অল্পে তুষ্ট মানুষের দেশে এমন পরিবেশ অনাকাক্সিক্ষত। কিন্তু এই অস্থিরতা অনিশ্চয়তাই যেন তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কেন তাদের সন্তান ঢাকার রাস্তায় বের হলেও ছিনতাইকারীর চাপাতির আঘাতে রক্তাক্ত হবে; কেনই বা তাদের দূরপাল্লার বাসে যাতায়াত করতে ডাকাতের কবলে পড়তে হবে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের উৎখাতের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতার মসনদে বসলে বেশ কিছু দিন চরম অস্থিরতা চলে। সে সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী দাবির পর দাবি নিয়ে মাঠে নেমে ঢাকার নাগরিক জীবনে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। দাবি আদায়ে ঢাকার শাহবাগের রাস্তা দখলসহ আন্দোলনকারীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে গিয়ে পর্যন্ত বসে পড়েছিল। সে সময় দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ যে স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না তা অনুমান করা গিয়েছিল। বিষয়টি এখন পরিষ্কার। সম্প্রতি ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি দেশেই ছিলেন। বাথরুমে লুকিয়ে ছিলেন। ছাত্রদের কোন গ্রুপ তাকে উদ্ধার করেছে। ওবায়দুল কাদেরকে ছাত্রদের উদ্ধার করার দাবির কতটা সত্য বা মিথ্যা তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তিনি দেশে থাকার সময় যে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন তা-ও প্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমি বাংলাদেশেই ছিলাম তিন মাসের মতো।

আমার একটা উদ্দেশ্য ছিল ওখান থেকে কিছু করা যায় কি না। কিছু একটা করা যায় কি না। সংগঠিত করা যায় কি না। বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক অসন্তোষ, কর্মচারীদের অসন্তোষ। প্রতিদিনই এগুলো লক্ষ করতাম। ক্ষোভগুলো তখন রাস্তায় নেমে আসছিল। বিশেষ করে গার্মেন্ট। সে সময় ভাবলাম এদের সাথে যোগাযোগ করে কিছু করা যায় কি না। এই চিন্তাতেই তিন মাস পেরিয়ে গেল।

ওবায়দুল কাদেরের এমন কথার পর আর বোঝার বাকি থাকে না দেশে কারা, কী কৌশলে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। কারা মাজারে হামলার সাথে জড়িত আর কারা নানা জায়গায় গ্রন্থাগার বন্ধ করে দিয়েছে।

আমরা খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম, আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে জঙ্গিরা ক্ষমতা গ্রহণ করেছে এমন প্রচারণায় ভারতীয় মিডিয়া সরব হয়ে উঠল। আর এরই মাঝে দেশের একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন তাদের শক্তি প্রদর্শন করল। এসবই যে আওয়ামী চক্রান্তের অংশ তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আওয়ামী সরকারের পতন হলেও আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী যে পালিয়ে যায়নি তা তো সবারই জানা। তারা দেশেই লুকিয়ে আছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন দেশে গা ঢাকা দিয়ে আছেন তেমনি প্রশাসনেও ঘাপটি মেরে আছেন আওয়ামীমনা অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী। সুযোগ পেলেই তারা রাস্তায় নামার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি প্রফেসর ড. ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন রটলে আওয়ামী লীগের একটি অংশ মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিপ্লবের পক্ষের নেতাকর্মীরা তা ভালোভাবেই মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়। আওয়ামী লীগ যেন সুযোগের অপেক্ষায় তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে আছে। এতে কারো সন্দেহ নেই যে, যে কোনোভাবে রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়াই তাদের উদ্দেশ্য। আর সেই উদ্দেশ্য হাসিলের অপকৌশল হলো দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা। আওয়ামী লীগের অপরাজনীতিতে যোগ হয়েছে ভারত। দেশটি বর্তমানে পুশইনসহ বাণিজ্য ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তা অনেকের মতে শিশুসুলভ আচরণ। একটি বিশেষ দলকে ক্ষমতায় রাখার জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সাথে প্রতিনিয়ত শত্রুতামূলক আচরণ করবে এটা কূটনীতির দৈন্য ছাড়া আর কী হতে পারে!

বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সাথে কখনো শত্রুতা চায় না। কিন্তু ভারত একটি দলের সাথে সম্পর্ক করে যেভাবে বাংলাদেশ থেকে একতরফাভাবে স্বার্থ হাসিল করেছে এবং বাংলাদেশের মানুষকে শত্রুজ্ঞান করেছে তা এ দেশের মানুষ মানতে পারে না। সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেফতারের পর অভিযোগ উঠেছে, ভারত তাকে দিয়ে বাংলাদেশে কিলিং মিশনের পাঁয়তারা করেছিল। এমন খবর দেশবাসীকে আতঙ্কিত না করে পারে না।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব এখনো ভয়ানক প্রবল। কিন্তু নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের একটি ধারণা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টায় গণ-অভ্যুত্থানের সহযোগী কোনো শক্তি বা দলও কি ইন্ধন জোগাচ্ছে? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই উঠছে। একটি দলের নেতারা যখন বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিলম্ব হলে দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়বে তখন মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক, দলটির এমন ভাবনার পেছনের কারণ কি?

নির্বাচন বিলম্ব হলে কারা দেশকে আবার অস্থিতিশীল করবে? আরো একধাপ এগিয়ে একটু উৎকণ্ঠিত হওয়ার মতো কথা বলেছেন সে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হলে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা থাকবে না। কারা দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বিপন্ন করতে চায় তা আমরা জানি না। ওই বড় নেতার বক্তব্য রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অংশ বলেই আপাতত মনে করে মানুষ।

ড. ইউনূস বরাবরই আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে যে মতানৈক্য বিরাজ করছে তার একটি সুরহা হওয়া কাম্য।