সাবরিনা নাজ

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশ আধুনিকায়নের সাথে সমানুপাতিকভাবে বেড়ে চলেছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন প্লাস্টিকের ব্যবহারের প্রহণযোগ্যতা সুস্পষ্ট। বাজারের ব্যাগ থেকে শুরু করে খাবারের প্যাকেট, ফলের রস বা কোমলপানীয় পানের জন্য প্লাস্টিক স্ট্র, দাঁত মাজার ব্রাশ, কান পরিস্কার দন্ড, প্রসাধনী প্যাকেজিং, শিশুর খেলনা, ওষুধের মোড়ক, ঝালমুড়ি বিক্রির কাগজের ঠোঙ্গার জায়গা দখল করেছে একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক গ্লাস, অনুষ্ঠান, বনভোজনে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক এখন স্মাটনেস, বাসাবাড়িতে পানি রাখার জায়গায় আছে এখন তরল পানীয়ের প্লাস্টিকের বোতল, বিদায় হয়েছে কাঁসার জগ, কাঁচের জগ, কলসী বা মাটির সরাই। কলম, প্লাস্টিকের চিরুনি, প্লাস্টিকের ডেন্টালফ্লস সেটাও প্লাস্টিক- সর্বত্র প্লাস্টিকের জয়ধ্বনি। হালকা রঙ-বেরঙ, নকশা এবং সস্তা হওয়ায় এ সকল প্লাস্টিকজাত পণ্য আমাদের আর্কষণ করছে। ঐতিহ্যকে, জাতিগত আচরণকে আমরা অবলীলায় প্রতিস্থাপিত করছি সহজলভ্য সস্তা প্লাস্টিক বিকল্পের কাছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে প্রতিনিয়ত, তারপর অবিনশ্বর প্রায় ঘাতক প্লাস্টিক বর্জ্য আকারে ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মাটিতে, পানিতে, খাদ্যচক্রে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার মাত্র ৩৬ শতাংশ পুনঃব্যবহার বা রিসাইকেল হয়, বাকি ৬৪ শতাংশ পরিবেশে থেকে যায়। প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলেছে মাটি দূষণ ও পানি দুষণ। নিঃশব্দ ঘাতকের মতো প্লাস্টিক প্রবেশ করছে আমাদের শরীরে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে। মাটি দুষণ ও পানি দূষণের ফলে গানিতিকহারে বাড়ছে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তি ঝুঁকি।

প্লাস্টিক ব্যবহার অভ্যাসগত সমস্যা

প্লাস্টিক দূষণের অন্যতম কারণ আমদের প্লাস্টিক ব্যাবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অজ্ঞতা। আমরা অসচেতন বলেই ছোট থেকে ছোট একটা জিনিস কিনেও পলিথিন ব্যাগ নেই, ব্যবহারের পরে যত্রতত্র ফেলে দেই। রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ডে, রেল স্টেশনে, নদীরপাড়, সমুদ্র উপকুল- আমরাই ছড়িয়ে দিচ্ছি পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। ১৮ কোটি মানুষের এই অভ্যাসই দ্রুতগতিতে বাড়িয়ে তুলছে এই পরিবেশগত সঙ্কট।

আইন ও বাস্তবতা

বাংলদেশ সরকার ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ (LDP POLYTHENE) নিষিদ্ধ করেছিল। এখন ২০২৫, বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা প্রায় শূন্য বা ঋনাত্মক। কারণ ২০০২ থেকে ২০২৫ অবধি এই ধরনের প্লাস্টিকের ব্যবহার কমেনি বিন্দুমাত্র। বরং বর্ধিত হয়েছে বহু গুণ। দেশের প্রতিটি কাঁচা বাজারে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতরের নজরদারির অভাব, স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা, সর্বোপরি বাংলাদেশের আপামর জনমানুষের দায়িত্বহীনতা ও অনীহার কারণে এই আইনের বাস্তবায়ন সম্ভবপর হয়নি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ আন্তঃমন্ত্রণায়ের সমন্বয়ে কঠিন বর্জ্য নীতিমালা ২০২১ প্রণয়ন করেন। জাতীয়ভাবে 3R (Reduce, Reuse and Recycle) কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংযোজিত হয়। এই নীতিমালায় প্রথমবারের মতো সংশ্লিষ্ট করা হয় EPR (Extended Producers Responsibility) এই নীতিমালার আওতায় মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রশংসনীয়ভাবে উন্নত হয়েছে। কিন্তু প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এই নীতিমালার কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ২০২৩ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি দফতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার। আমরা এটারও বাস্তবায়ন দেখতে পাইনি। ২০২৩ মালে সিপিডির জরিপে উঠে এসেছিল যে বাংলদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই ভয়াবহতাকে অনুধাবন করে ১২টি জেলার উপকূলীয় ৪০টি উপজেলাকে বেছে নেয়া হয়েছে।

অন্তবর্তীকালীন সরকার প্লাস্টিক দুষণ কমিয়ে আনতে এই অল্পসময়ে কিছু সুনির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ১ অক্টোবর ২০২৪ থেকে সুপারশপগুলোতে SINGLE USE PLASTIC ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। পরিবেশ অধিফতর মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নিষিদ্ধ পলিথিন পণ্যের বাজারজাতকরণ ও উৎপাদন বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। সুনির্দিষ্টভাবে পলিথিন ও পলিপ্রপাইলিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাটজাত ব্যাগ ব্যবহার উৎসাহিতকরণের পাশাপাশি সকল পর্যায়ে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ একটি নীরব কিন্তু দ্রুত বিস্তার লাভ করা মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, নদী থেকে সাগর পর্যন্ত প্লাস্টিক দূষণ আমাদের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থিত। যেকোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ সাময়িক। কিন্তু একমাত্র প্লাস্টিক দূষণ আমাদের প্রতিনিয়ত বিরামহীনভাবে ক্ষতি করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ এই দূষণের শিকার। অথচ এর ভয়াবহতা নিয়ে আমরা সচেতন নই। প্লাস্টিক দূষণ থামাতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা, বিকল্প পণ্যের ব্যবহার; এই সংশ্লিষ্ট ছোটবড় সকল উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনা দেয়া এবং রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে বন্ধ করতে হবে ছোট, মাঝারি ও বড় প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। না হলে প্লাস্টিক দূষণের দীর্ঘ মেয়াদী অপূরণীয় ক্ষতি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাভাবিক সুস্থ বিকাশকে সকল ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

লেখক : প্রফেসর, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়