গত বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছিল। বর্তমানে তা একটি নতুন সাম্যব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়ার যুগে আমাদের এই অঞ্চলে অবশ্যই ইসলামোফোবিয়াকে কৃত্রিমভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদকে’ মোকাবেলা করাটাই এখন এই অঞ্চলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ‘উগ্র-হিন্দুত্ববাদের’ উত্থানের একটি খোঁড়া যুক্তি হিসেবে ‘ইসলামোফোবিয়াকে’ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, বাংলাদেশকেও এই খেলায় যুক্ত করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে একাধিক ভিন্ন কারণে। শুধু এই ‘উগ্র-হিন্দুত্ববাদের’ উত্থানই নয়, এই অঞ্চলের সামরিক শক্তির ভারসাম্যও এখন সম্পূর্ণ বদলে যেতে বসেছে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমারে চীন সমর্থিত আরাকান আর্মিসহ আরো চার-পাঁচটি বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয় ছিল বেশ কয়েক দশক ধরেই। গত ২০২০ সালের নির্বাচনের পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সে দেশে (তাদের অনুমোদিত) যতটুকু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল, তাকেও নস্যাৎ করে সামরিক শাসন জারি করে। এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বেশ কয়েকটি মিলে একটি মোর্চা গঠন করে সে দেশের সরকার উৎখাতের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত মিয়ানমারের জনগণও তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, নিদেনপক্ষে স্বাধিকারের জন্য, এই যুদ্ধে সমর্থন জোগায়। গত ২০২৩-২৪ এর মধ্যে এই স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলো বেশ বড় রকমের সাফল্য পায়। বর্তমানে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের কর্তৃত্ব তাদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি বাহিনী এয়ারফোর্সের সাহায্যে রাজধানী ইয়াঙ্গুনসহ মাত্র এক-তৃতীয়াংশের দখল তাদের হাতে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদের মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি বিভিন্ন পরাশক্তি সেখানে তাদের ‘ফুট প্রিন্ট’ রাখার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছে।
গত ১৫ দিনে আমাদের উপমহাদেশে বিশ্বের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ভিজিট করে গেলেন। একজন হলেন মিজ তুলসী গ্যাবার্ড, আমেরিকার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক, যিনি গত ১৬ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ভারত সফর করলেন। অন্যজন মিস্টার অ্যান্তোনিও গুতেরেস যিনি জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব। তিনি ১৪ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত চার দিন বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। দু’জন দু’টি ভিন্নদেশে আপাত: সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে সফর করেছেন। কিন্তু একই উপমহাদেশে একই সময়ে তাদের এই ভ্রমণের পেছনে অন্য কোনো ‘কমন ডেনোমিনেটর’ আছে কি না, সে প্রশ্নটি এখন সামনে চলে আসছে।
প্রথমে আসি মিজ তুলসী গ্যাবার্ডের ভারত সফর প্রসঙ্গে। গত ১৬ মার্চ, ২০২৫ তারিখ মিজ তুলসী ভারতে আড়াই দিনের সফরে এসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দেখা করেন। এসব সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত ও আমেরিকার দীর্ঘ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ‘কাউন্টার টেরোরিজম, সাইবার সিকিউরিটি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। গত ১৮ মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা প্রধানদের সাথে ‘রাইসিনা’ ডায়ালগে অংশ নিয়ে মিজ গ্যাবার্ড শুধু আমেরিকা নয়; বরং বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের সুরক্ষা বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করেন, যার মধ্যে অবশ্যই ভারত অন্তর্ভুক্ত। তার এ সফরে মিজ তুলসী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাথেও কথা বলেন। এসব গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের ‘লিডিং কোশ্চেনের’ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন যে বাংলাদেশে হিন্দু, ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা সম্বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসন যে ওয়াকিবহাল, তা জানানো এবং এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে (অন্য সব ধর্মাবলম্বীদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে) রাষ্ট্র পরিচালনা ও শাসন করার যে পরিকল্পনা, ট্রাম্প প্রশাসন যে সে বিষয়টিকে অনুমোদন করে না তা তুলে ধরা।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী মিজ গ্যাবার্ডের ভারত ভ্রমণ ছিল যেমন তার কাজের অংশ, তেমনি এটি তার ধর্মভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদনও ছিল। ভারতের ক্ষমতাসীনরা মিজ গ্যাবার্ডকে ‘গঙ্গাজল’ উপহার দেয়ার মাধ্যমে তার এই সফরকে সেরকম একটি আবহ দেয়ার চেষ্টা করেছেন মর্মে পরিলক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গত মার্চ ১৪ তারিখ থেকে বাংলাদেশে যে চার দিনের সফর করেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০-১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং তাদের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যে করণীয় সম্বন্ধে আলোচনা। মিস্টার গুতেরেসের এই সফর এমন একটা সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ও নানা আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, বিশেষত যখন দেশে নির্বাচনপূর্ব সংস্কার নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে।
গুতেরেসের এই সফরে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতিতে নানা বিদেশী ‘অপপ্রচারের’ বিষয়ে বিশ্ব তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মকর্তার বয়ান থেকে সত্যটি জানার সুযোগ পেলো। বিশ্ববাসী জানতে পারল বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত চুরি, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ও গণহত্যা সম্বন্ধে। গুতেরেসের এই সফর বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের মিডিয়া ও সরকারের তরফ থেকে যে মিথ্যাচার করা হচ্ছে, তার অসারতা সম্বন্ধেও বিশ্ববাসীকে অবহিত করবে। সর্বোপরি, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার মানবেতর জীবন ও তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের আকাক্সক্ষা বিষয়েও এই সফর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো বাংলাদেশ যে সময় একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দেশ গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, তাতে বিশ্বসভার অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ।
তবে এই সফর যে শুধুই শুভ সংবাদে পূর্ণ, তা নাও হতে পারে। কক্সবাজার সফরকালে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ এক লাখ রোহিঙ্গার সাথে এক ইফতার মাহফিলে শরিক হন। সে ইফতার মাহফিলে তিনি আগামী বছরের ঈদুল ফিতরের সময় মিয়ানমারে এই রোহিঙ্গাদের সাথে ঈদ উদযাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল যে, এ ক্ষেত্রে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী কাজ করবে বলে মনে হয় না। সশস্ত্র আরাকান আর্মির দখলে থাকা আরাকান রাজ্যে মিয়ানমার সরকারের কোনো প্রভাব বা অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী আরাকান রাজ্যকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যে, সেখানে কোনো ধরনের খাদ্যশস্য বা ওষুধ পৌঁছাতে পারছে না। ফলে সেখানে একটি মানবিক বিপর্যয় ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সেটিকে নিরসনই জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের এবার বাংলাদেশ সফরের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আরাকান রাজ্যে খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দেয়ার জন্য একটি করিডোর চেয়েছেন। মহৎ উদ্দেশ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এ বিষয়ে সম্মতি জানানো এত সহজ নয়।
উল্লিখিত সফর দু’টি একসাথে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেকে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অনেকে বলছেন যে, এর মাধ্যমে আমেরিকা অপরাধী দমনে বা তাদের শায়েস্তা করার জন্য ‘ভালো পুলিশ-খারাপ পুলিশ’ শীর্ষক যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা করল কি-না!
ভারত আমেরিকার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। এটি যেমন কৌশলগত কারণে, তেমনি বাণিজ্যিক কারণেও। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সাথে আমেরিকার সম্পর্কটা তেমন হৃদ্যতাপূর্ণ মনে হচ্ছে না। তাছাড়া, গত ২০ মার্চ, ২০২৫ হোয়াইট হাউজে ব্রিফিংকালে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যা মিজ তুলসী গ্যাবার্ডের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ সফর করা সিনেটর গ্যারি পিটার্স বলেছেন, আমেরিকায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন সম্পর্কে অনেক মিথ্যা কথা ছড়ানো হয়েছে, যা এমনকি আমেরিকায় পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ সফরকালে এর কোনো সত্যতা পাননি। তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে আলাপ করে প্রকৃত ঘটনাটা জেনেছেন। এসব থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, মিজ তুলসী গ্যাবার্ডকে লিডিং কোশ্চেন করে প্রাপ্ত যে জবাব ভারতীয় সাংবাদিক প্রচার করতে চেয়েছেন, তা আসলে মাঠে মারা গেছে।
তবে এ বিষয়ে আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ২০২২ সালে অনুমোদিত THE BURMA ACT (H.R.৫৪৯৭) বা বার্মা অ্যাক্ট অব-২০২২, যাকে The Burma Unified through Rigorous Military Accountability Act of ২০২২” নামেও অভিহিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস অনুমোদিত এই অ্যাক্ট অনুযায়ী আমেরিকা মিয়ানমারের জনগণের নাগরিক অধিকার ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এবং মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা এবং সুশীল সমাজকে সমর্থন প্রদানসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সে দেশের নাগরিকদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত ও সংরক্ষণ করা। আর অঘোষিত লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব হ্রাস করা এবং সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমেরিকার সরকারের জন্য যেকোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের পথ উন্মুক্ত রাখা। সঙ্কটটা এই জায়গাতেই। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ত্রাণ সরবরাহের করিডোরের জন্য যে আবেদন, তার উদ্দেশ্যটি এ থেকে পরিষ্কার হয়। তা ছাড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সঙ্কটের সময় মানবিকতা প্রদর্শন করতে গিয়ে বাংলাদেশের উপর ১০ থেকে ১৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যে বোঝা চেপে বসেছে, তার পুনরাবৃত্তির সুযোগ দেয়া কোনো বুদ্ধিমান জাতির পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া, আমরা মানবতার নামে কোনো একটি বিশ্বশক্তিকে সহায়তা করতে গিয়ে অন্য কোনো বিশ্বশক্তির বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকিও নিতে পারি না। এ ক্ষেত্রে সবদিক বিবেচনা করে দেশের স্বার্থকে সবচেয়ে উঁচুতে স্থান দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এবারে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সংহত করার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সুযোগকে হেলায় হারানো সমীচীন হবে না।
ঐতিহাসিকভাবেই মিয়ানমারের একমাত্র বন্ধুরাষ্ট্র হলো চীন। মিয়ানমার সরকার তার দেশের সব জানালা সারা বিশ্বের জন্য রুদ্ধ করে রাখলেও চায়নার জন্য তা উন্মুক্ত ছিল চিরকালই। পরবর্তীতে বিনিয়োগের জন্য পশ্চিমাদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করলে আমেরিকাসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশ মিয়ানমারের তেল, খনিজ ও অন্যান্য সম্পদের জন্য সে দেশে ভিড় করে। এর সাথে যোগ দেয় ভারতও। পরবর্তীতে সে দেশে জাতিগত বৈষম্যের কারণে ‘আরাকান আর্মি’সহ নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির জন্ম হলে তারা ভারতের শরণাপন্ন হয় অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য লজিস্টিক্যাল সহায়তার জন্য। কিন্তু ভারত মিয়ানমার সরকারের পক্ষ নিয়ে তাদের সাথে কথিত ‘বেঈমানি’(?) করলে আরাকান আর্মির বেশ কিছু বড় নেতা নিহত হয়। এই প্রেক্ষাপটে চীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের সহায়তায়ও এগিয়ে আসে। ফলে দেখা যায় যে, মিয়ানমারের দুই পক্ষই চিনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে লড়াই করছে। তবে শেষ পর্যন্ত চিন কোন পক্ষে অবস্থান নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সেই কারণে আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী নতুন মিত্রের সন্ধানে সক্রিয় ছিল সবসময়। আর এই সুযোগটিই নিতে চাচ্ছে আমেরিকা।
অপর দিকে চীন-বিরোধী যেকোনো জোটে আগ্রহী ভারত। ফলে মিয়ানমার বিষয়ক আমেরিকার যেকোনো পদক্ষেপে ভারত অংশীদার হতে চাইবে। তা ছাড়া ভারতে ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদের’ উত্থানের কারণে তার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী বর্তমানে অস্বস্তিতে আছে। অন্য দিকে মনিপুর, অরুণাচল, মিজোরাম রাজ্যগুলোতে নতুন জাতীয়তাবাদের উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। এই রাজ্যগুলো সবাই স্বাধীনতা চায়। ভারতকে অখণ্ড রাখার বাসনার কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশ বর্তমানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারত কিছুতেই বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে মেনে নিতে পারছে না। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের পরিবর্তে তারা তাদের পুরনো কৌশল জারি রেখে বাংলাদেশের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এতে তাদের প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও তারা পিছু হঠছে না। কিন্তু ভারত ভুলে যাচ্ছে যে, আড়াই হাজার বছরের পুরনো ‘চাণক্য কৌশল’ একবিংশ শতাব্দীর ডক্টর ইউনূসের কৌশলের কাছে পাত্তা পাওয়ার কথা না।
বর্তমানে ডক্টর ইউনূসের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ভারত বোকার মতো বাংলাদেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছে। কিন্তু এতে দেশের সেনাবাহিনীর ঐক্য ও মনোবল আরো বেড়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস যদি বিচক্ষণতার সাথে ‘তিস্তার সম্ভাব্য প্রকল্পের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে’ সংযুক্ত করে কোনো প্রস্তাব দেন (এবং চীন যদি সে প্রস্তাবে সম্মত হয়), তাহলে এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। তবে তাকে এ ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে আমেরিকার উদ্বেগের বিষয়টিও। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশীদের সতর্ক থেকে পরিস্থিতি অবলোকন করা এবং সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাবেক সরকারি কর্মচারী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক
বর্তমানে ডক্টর ইউনূসের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ভারত বোকার মতো বাংলাদেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছে। কিন্তু এতে দেশের সেনাবাহিনীর ঐক্য ও মনোবল আরো বেড়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস যদি বিচক্ষণতার সাথে ‘তিস্তার সম্ভাব্য প্রকল্পের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে’ সংযুক্ত করে কোনো প্রস্তাব দেন (এবং চীন যদি সে প্রস্তাবে সম্মত হয়), তাহলে এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। তবে তাকে এ ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে আমেরিকার উদ্বেগের বিষয়টিও। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশীদের সতর্ক থেকে পরিস্থিতি অবলোকন করা এবং সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়ার কোনো বিকল্প নেই