সাবিকুন্নাহার মুন্নী
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্যরা কি এ দেশের বেশির ভাগ নারী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন? প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাব দেখে মনে হয় তারা বাংলাদেশে নয়; পৃথিবী ছাড়িয়ে মঙ্গল গ্রহে বসে এ-সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ কমিশনে সদস্য হিসেবে যারা আছেন তারা প্রায় সবাই সেক্যুলারপন্থী নারী! যারা এ দেশের বেশির ভাগ নারী সমাজের চিন্তাচেতনা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেন না, ধর্মীয় বিধিবিধান পালন ও লালন করেন না!
এককভাবে শুধু তাদের দিয়ে কী করে একটি সর্বজনীন, গ্রহণযোগ্য নারীবান্ধব ও নারী ক্ষমতায়নের ভারসাম্যমূলক সংস্কার প্রস্তাব পেশ করা সম্ভব? আমাদের দেশের নারীদের ৫ শতাংশের কম সংখ্যকের প্রতিনিধিত্ব করেন এসব নারী।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত ১০ সদস্যবিশিষ্ট নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাদের দ্বারা প্রস্তাবিত প্রায় সাড়ে ৪০০ সুপারিশ যেন পতিত স্বৈরাচারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করছে। এসব প্রস্তাবনার অধিকাংশ ফ্যাসিবাদের আমলে গৃহীত নারীনীতির ইসলামবিদ্বেষী সুরের পুনঃপ্রতিধ্বনি মাত্র।
এ প্রস্তাবনায় মুসলিম উত্তরাধিকার আইন বাতিলসহ সব ধর্মমতের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইনপ্রণয়, ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচারবিরোধী জাতিসঙ্ঘ প্রণীত সিডো (কনভেনশন অন দ্য অ্যালিমিনেশন অব অল ফরমস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইন্সট উইমেন) সংক্ষেপে সিইডিএডব্লিউ সনদের বিতর্কিত ধারার আলোকে বিভিন্ন আইন বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। যেখানে পতিত স্বৈরাচার সরকার পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের নারীর প্রতি সবধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডোর গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ধারা (২ ও ১৬.১.গ) থেকে আপত্তি তোলেনি, সেখানে নতুন বাংলাদেশে এসে আবারো সেই ধারার আলোকে আইনের প্রস্তাব দেয়া যেন স্মরণ করিয়ে দেয়- নতুন বোতলে পুরনো মদের আমদানির কথা!
আগে ফ্যাসিবাদী সরকার সিডো কমিটিকে জানিয়েছিল, ‘যেখানে দেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান, সে দেশের প্রায় সব মানুষের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে তালাক ও সম্পত্তি বণ্টিত হয়; সেখানে শুধু বর্তমানে নয় ভবিষ্যতেও সরকারের পক্ষে এ দুটো ধারার ব্যাপারে আপত্তি তুলে নেয়া সম্ভব হবে না।’ স্মরণযোগ্য যে, জাতিসঙ্ঘ ১৯৭৯ সালে সিডো সনদ বা দলিলটি গ্রহণ করে। ১৯৮১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সনদটি অনুসমর্থন করে। তবে কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী বলে বাংলাদেশ সরকার দু’টি ধারায় আপত্তি দিয়েছিল, যা এখনো বহাল আছে।
অথচ দেশের বিগত সব সরকারের আমলে গণমানুষের ধর্মীয় আবেগের কথা চিন্তা করে একবাক্যে যে ধারাগুলো প্রত্যাহার করেছিল তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এসব অবাস্তব প্রস্তাবনা সুপারিশ করা হয়েছে, যা গৃহীত হলে শুধু ইসলাম নয়, সব ধর্মের ধর্মীয় আইনেরও বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াবে। প্রস্তাবনায় ধর্মকে সরাসরি বৈষম্যের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনে ‘মুসলিম উত্তরাধিকার ও পারিবারিক’ আইনসহ সংবেদনশীল ইস্যুতে বিতর্কিত বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে যা পবিত্র কুরআনের বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের অস্তিত্বের ওপর একটি ঠাণ্ডামাথার গভীর ষড়যন্ত্র ।
আমাদের মনে হয়, নারীবিষয়ক সংস্কারের নামে এ ধরনের প্রস্তাবনা সরকারকে নতুন করে বিপদে ফেলার একটি সূক্ষ্ম পাঁয়তারা করা হয়েছে, যাতে করে জন-সেন্টিমেন্টের বাইরে গিয়ে সরকার জনসমর্থনহীন হয়ে পড়ে। একই সাথে এ প্রস্তাবের বিরোধিতায় নতুন ইস্যু খুঁজে পায় এবং তা ঘিরে ধর্মীয় সংগঠনগুলো মাঠে নেমে পড়ে। দেশে একটি অসহিষ্ণু পরিবেশ সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এ গণবিরোধী নারীবিষয়ক সংস্কার প্রস্তাব। ফ্যাসিবাদের আমলেও উদ্যোগ নেয়া এ ধরনের গণবিরোধী পদক্ষেপ গণধিকৃত হয়েছে। ধর্মীয় আইনের বিরুদ্ধে ও সেক্যুলার আইন প্রাধান্য দিয়ে যেকোনো ধরনের পলিসির অপচেষ্টা দেশের মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।
আমরা আশা করব, অন্তর্বর্তী সরকার গণমানুষের সেন্টিমেন্টবিরোধী এ-সংস্কার প্রস্তাব বাতিল করে গণ-আকাক্সক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সদস্যদের নিয়ে কমিশন পুনর্গঠন করে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নারীবান্ধব তথা ভারসাম্যমূলক সমাজবান্ধব সংস্কার প্রস্তাবনা গ্রহণ করবে।
লেখিকা : আইনজীবী