মাসুমা আক্তার
নদীবিধৌত আমাদের এ দেশে নদ-নদীর নাম, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, উৎস, শাখা নদীগুলোর গতিপথ, নদীবক্ষের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, নদীর মাছ ও অন্য জলজপ্রাণী আর উদ্ভিদের জীবনাচরণের সাথে নদীর সম্পর্ক, নদীপাড়ের ভাঙন, নতুন চরজাগা, নদীর গতিপথ পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রম নদীর সংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
পাহাড় বা উঁচু ভূমি থেকে আসা নদীর পানিতে বিদ্যমান বালুকণা কোনো স্থানে ঢিবির মতো জমা হতে থাকলে ধীরে ধীরে একসময় তা বিশালায়তন হয়ে ওঠে। জলযান চলাচল ও নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখার জন্য এ ধরনের বালুর স্তূপ অপসারণের প্রয়োজন হয়। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুসরণ করে নদীতে জমে ওঠা এসব বালুর স্তর অপসারণের জন্য বার্ষিক ইজারা দেয়া হয়।
ইজারা দেয়ার আগে প্রস্তুতিমূলক জরিপকাজের অভাবে ইজারাদাররা নদীবক্ষের অনুত্তোলনযোগ্য বালুও তুলে থাকেন। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে নদীবক্ষের গভীরতার তারতম্য ঘটে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে নদীর মাছ, অন্য প্রাণীকুল ও জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জলভাগের প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অনেকগুলোরই স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মাছ ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অনেকগুলো এখন বিপন্ন।
নদীর তলদেশে অসমানভাবে মাটি খননের কারণে ওই স্থানে এবড়োখেবড়ো হয়ে থাকা মাটির উঁচু অংশ ভেঙে পড়ে এবং নদীর পাড় ভাঙারও কারণ ঘটায়। এখানে লক্ষণীয় যে, বালু উত্তোলনে ইজারাদারদের সুইং ড্রেজার ব্যবহার করার কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো বালুমহালেই সুইং ড্রেজারে বালু তোলা হচ্ছে না। সুইং ড্রেজার অনেকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝাড়ু দেয়ার মতো করে নদীর তলদেশের বালু স্তরবিন্যাস নষ্ট না করে অত্যন্ত সহনীয়ভাবে স্থানান্তর করে। ফলে নদীর তলদেশে ভূমিধসের সম্ভাবনা কমে যায়। এতে নদীর পাড় এলাকার ভাঙনের সম্ভাবনা কমে। অনুতাপের বিষয় হলো, এ দেশে বৈধ ইজারাদারদের কারো কাছে এ ধরনের সুইং ড্রেজার নেই।
বছরজুড়ে ইজারাদার কোথায় কোথায় ঘুরে কতটা সময়জুড়ে কী পরিমাণ খননযন্ত্র ব্যবহার করবে চুক্তিতে তা বলা হয় না। আবার বালু উত্তোলনকালীন কোনো তত্ত্বাবধান বা নজরদারিও করা হয় না। গভীর রাতে শত শত লোড/দেশীয় ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর তলদেশের বালু ও মাটিযুক্ত বালু তোলা হয়, যদিও সূর্যাস্তের পরে বালু তোলা নিষিদ্ধ। কিছু বালুমহালে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলতে থাকায় আইনি জটিলতার নামে ইজারাদাররা নিয়মিত বালু তুলেই যাচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের মধ্য থেকে পেশিশক্তির জোরে তারা প্রতিনিয়ত দেশের অমূল্য সম্পদ বিনা বাধায় লুটে নিচ্ছে।
ইজারা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গবেষণা/জরিপ শুধু মাটিভাঙনই রোধ করত না; বরং নদীতে বসবাসরত প্রাণিকুলের জীবন, চলাচল, খাদ্য গ্রহণ ও বংশ রক্ষার প্রক্রিয়াও সুরক্ষিত হতো। পর্যাপ্ত গবেষণা ও যত্নের অভাবে মিঠা পানির অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। কিছু মাছের প্রজননের জন্য বিশেষ পরিবেশ দরকার হয়। জলভাগের স্থিরতা/কম্পন, তাপমাত্রা, মাটির ধরন, নদীতে বিদ্যমান জলজ উদ্ভিদের অবস্থান, অন্যান্য জলজপ্রাণীর বসবাস ও চলাচল এসবই এদের প্রজননপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। বালু ইজারার ক্ষেত্রে জলজ পরিবেশে মাছের বেড়ে ওঠাসংক্রান্ত এসব বিষয় মোটেও গুরুত্ব দেয়া হয় না।
শত শত নদীবিধৌত বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার কৃপায় যুগ-যুগান্তর ধরে কৃষিপণ্য, অন্যান্য শিল্পপণ্য ও যাত্রী পরিবহনের একটি বড় অংশ নামমাত্র খরচায় সম্পন্ন হচ্ছে। নদীর পাড়ে দিনের পর দিন অসংখ্য বিশাল আকৃতির ড্রেজার, বাল্কহেড রেখে বালু তোলার কাজ চলতে থাকে। ফলে নদীতে চলাচলরত যানবাহনের যাত্রাপথ বাধাগ্রস্ত হয়। দিনে-রাতে বিকট শব্দে চলে এসব দানব মেশিন, মাছ তো বটেই, নদীপাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীও বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। নদীভাঙন রোধে মানববন্ধন হয়।
নদীপাড়বাসীর ক্ষোভ শুধু ঘর ভাঙার কারণেই না, তাদের ক্ষোভের আরো কারণ আছে।
বালুমহালে জমিয়ে রাখা বালুর ঢিবিগুলো নৌপথে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এগুলো অপসারণ যেমন জরুরি তেমনি এই অপসারণ প্রক্রিয়া যেন নদীর পরিবেশ বিঘ্নিত না করে সমুন্নত করে সেটি নিশ্চিত করা আরো বেশি জরুরি। বালু উত্তোলন প্রক্রিয়ায় শুধু ইজারাসংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতিই প্রধান বিষয় নয়, এটি নদীর জলজ পরিবেশ বিঘ্নিত না করে সম্পন্ন করতে হবে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০-এ বালুমহাল ইজারাসংক্রান্ত বিধিবিধানের কার্যকর বাস্তবায়ন নেই।
বালুমহাল ইজারার পূর্বপ্রস্তুতির বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা। উত্তোলনযোগ্য বালুর পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে হবে। ইজারাদার যেন ইজারাপত্রে নির্ধারিত পরিমাণ বালুই উত্তোলন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা অত্যন্ত জরুরি। সূর্যাস্তের পর ইজারাদাররা শত শত অবৈধ (বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন দ্বারা সমর্থিত নয়) ড্রেজার ব্যবহার করে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশি বালু উত্তোলন করে। সুইংড্রেজার ব্যবহার ও সূর্যাস্তের পর বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। উত্তোলনকৃত বালুর প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আইনে সিসি ক্যামেরার পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের সুযোগ রাখা হয়েছে যা অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উত্তোলনের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ খনন ও পরিবহন যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইজারা এলাকায় ক্ষেত্রবিশেষে ৬০-৭০ অথবা তারও বেশি খননযন্ত্র রেখে রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলন করা হয় যা সম্পূর্ণ অনিয়ম। সময় এসেছে সব আত্মশ্লাঘা ভুলে নদীপাড়বাসী গরিব কৃষক জেলেদের পাশে দাঁড়ানোর। বদ্বীপবাসী আর পাড়ধসের হাহাকার শুনতে চায় না, শুধু আইন নয়, চিন্তার সংস্কার প্রয়োজন।