মো: ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশ এখনো গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে। বিশ্ববাজারে উদ্ভাবনী পণ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলের আধিপত্য থাকলেও আমাদের দেশে মৌলিক গবেষণার পরিমাণ খুব সীমিত। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে উঠতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে হবে। এটি জাতীয় সমৃদ্ধির চাবিকাঠি এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত।
বর্তমানে বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতের অবস্থা উদ্বেগজনক। একদিকে যেমন মৌলিক গবেষণার পরিমাণ কম, অন্যদিকে গবেষণায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভুগছে। জিডিপির তুলনায় গবেষণা ও উন্নয়নে বাংলাদেশের বরাদ্দ প্রতিবেশী দেশ ও বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের গড় বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে আরঅ্যান্ডডিতে দেশের মোট ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ০.৩০ শতাংশ, যা ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সংখ্যাও অপ্রতুল, যেখানে নারী গবেষকদের সংখ্যা মাত্র ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণাগার, উপকরণ ও অর্থায়নের অভাব থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছেন না। আবার অনেক সময় সরকারি উদ্যোগ থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে তা প্রায়ই ব্যর্থ হয়।
বিশ্ববাজারে আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী পণ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলের আধিপত্য বিরাজ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে বেশির ভাগ উন্নতশীল দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশকেও এ পথে হাঁটতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবন শুধু নতুন পণ্য বা প্রযুক্তি তৈরি করে না; বরং জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি খাতে উদ্ভাবনী গবেষণা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবায় গবেষণা জনস্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তিতে উদ্ভাবন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সহায়তা করতে পারে। উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় সাধন। বাংলাদেশে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা, কারণ জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ খুব কম। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব রয়েছে। এছাড়া, শিক্ষাব্যবস্থায় গবেষণা-ভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির প্রাধান্য বিদ্যমান, যা সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার অভাবও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, যা কার্যকর গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে গবেষণাকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দেয়া হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের উচিত গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিশেষ করে জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। বৌদ্ধিক সম্পদ বা কপিরাইট সংরক্ষণে শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো দরকার, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অর্থায়ন করবে যা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়ানো উচিত, যেমনÑ বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ প্রকল্প, শিক্ষক-শিক্ষার্থী মতবিনিময় কর্মসূচি ও সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন। এছাড়া উদ্ভাবনী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা, মেন্টরশিপ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ, যেখানে জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ যারা সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ। সঠিক পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া ও গবেষণার প্রসার ঘটিয়ে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও উন্নতি করতে পারে। সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবনী প্রকল্প ও গবেষণার বিকল্প নেই। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে সৃজনশীল পণ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য দরকার সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও সরকারি নীতিমালার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে যেতে পারবে। সেই সাথে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবে। আজ থেকে উদ্ভাবন ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ালে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা ও প্রতিভা পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হবে।