এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশ থেকে এখনো দেদার অর্থপাচার চলছে। গত ১৬ বছর ধরে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী শাসকের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে যারা এই অপকর্মে জড়িত ছিল, এখনো তারাই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। অর্থাৎ- বাণিজ্যের আড়ালে চলছে অর্থপাচার।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গোলটেবিলে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়েছে- অর্থপাচার শুধু চলছে তাই নয়, এটি দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থই পাচার হয় বাণিজ্যের আড়ালে, আমদানি ও রফতানির মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে।

এ গবেষণা করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। ৩৭টি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশ্নোত্তরের তথ্যও নেয়া হয়েছে গবেষণায়। গবেষণায় ‘২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমদানি ও রফতানির সময় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৮২৭ কোটি ডলার করে পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়। আর ২০২৪ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গেøাবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে বছরে গড়ে এক হাজার ৬০০ কোটি ডলার পাচার হয়। এসব পুরনো তথ্য।

আওয়ামী লীগ ১৬ বছরে দেশে চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। সে সময় পুরো ব্যাংকব্যবস্থা এবং সার্বিক অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল, এ নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদ উৎখাতের পরও এই কর্মকাণ্ড কিভাবে চলতে পারে- সেটিই প্রশ্ন।

অর্থপাচারের বিষয়ে সাধারণভাবে নিশ্চিত যে, সমস্যা কোথায় তা সবাই জানেন। যেমন- বিআইবিএমএর গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার মোকাবেলায় পর্যাপ্ত সুরক্ষাকাঠামোতে দুর্বলতা আছে। এই সুরক্ষাকাঠামো কী তা অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা খুব ভালো জানেন। কেন এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা হচ্ছে না, সে প্রশ্ন কেউ করেন না।

গোলটেবিলে প্রধান অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর। তিনিও উল্লেখ করেননি। তিনি বলেননি, ব্যাংক কর্মকর্তারা যখন বাণিজ্যিক লেনদেন অনুমোদন দেন তখন তারা ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসের বিষয়গুলো কিভাবে কতটা খতিয়ে দেখেন। বাণিজ্যে জড়িত পক্ষগুলোর ব্যাপারে যাচাই-বাছাই কতটা যথাযথভাবে করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অথবা সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা যাচাইয়ের সক্ষমতা ও আন্তরিকতা কতটুকু।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জন-আকাক্সক্ষা ছিল- হাসিনার পতনে দেশ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আসবে, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা আরো গভীর হয়। সরকারে বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ যোগ দেয়ায় মানুষ ভেবেছিল- এবার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, ঋণের নামে ব্যাংক লুট, রিজার্ভ ডাকাতি, অর্থপাচারের মতো ঘটনা বন্ধ হবে; কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ততই যেন আশার বেলুন চুপসে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির জন্য সরকার একা দায়ী নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সবরকম চেষ্টা-তদবিরের পরও রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা যায়নি অথবা যাচ্ছে না। আর রাজনীতি ঠিক না হলে অন্য কোনো কিছুতেই সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরবে না, তা নিশ্চিত। মূলত রাজনীতিই সবচেয়ে বড় অপরাধী। এখন দরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি রীতিমতো যুদ্ধ। তার আগে রাজনীতিকরা ঠিক হোন।