ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) একটি রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচারে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি বিভাগ ও জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এজন্য সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনে অন্যান্য সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ইফাকে কলুষিত করা হয়। এর শীর্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে বিপুল দুর্নীতি-অনিয়ম ছড়িয়ে দেয়া হয়। ধর্মীয় আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচারের বদলে এটি শেখ পরিবারের গুণগান প্রচারে যন্ত্রে পরিণত হয়।
সহযোগী একটি দৈনিকে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইফার ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালে ব্যয় নিয়ে অডিট করা হয়েছে। এই ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকসহ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বিধিবহির্ভূত খরচ করেছে প্রায় ৫১৯ কোটি টাকা। তাদের কারণে সরাসরি ৩৭২ কোটি টাকার বেশি সরকারি তহবিল থেকে গচ্চা গেছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে সিন্ডিকেট ৯০০ কোটি টাকা নয়ছয় করেছে।
তারা সরকারি কোষাগারের অর্থ অপচয় করে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক শেখ মুজিবের জন্মদিন পালন করে আড়ম্বরে। সেখানে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কাঙ্গালিনী সুফিয়া সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সিনেমার গায়িকাদের আনা হয় হামদ-নাতের বিচারক হিসেবে। ইমামদের সামনে অশ্লীল ব্যালে ড্যান্সের আয়োজন করা হয়। সবশেষে ২০২৩ সালে ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের সভায় ইফার পক্ষ থেকে মুজিবের ম্যুরাল বানানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় মুজিবের ম্যুরাল বানানোর উদ্যোগ ভণ্ডুল হয়ে যায়।
দীর্ঘ ১৫ বছরে ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারে একটি মৌলিক বইও ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশ হয়নি। ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও ইসলামী বিশ্বকোষের কোনো নতুন খণ্ড বাজারে আনা হয়নি। অথচ বই-পত্রিকা-সাময়িকীসহ চার হাজার ৫৯৬টি অপ্রাসঙ্গিক প্রকাশনা এ সময়ে তারা বাজারে এনেছে। এর মধ্যে ৬৩টি বই আছে মুজিবকে নিয়ে। এর একটি অংশ সামীম মোহাম্মদ আফজলসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজনের নামে লেখা বই। এগুলোর বেশির ভাগ অন্য লেখকের। জালিয়াতি করে নিজেদের নামে তারা চালিয়ে দিয়েছেন।
বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমাম নিয়োগে অনিয়ম-জালিয়াতি করা হয়েছে। কর্মকর্তা নিয়োগেও অনিয়ম হয়েছে। জাল সনদে চাকরি দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ব্যাপারে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আছে। বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে লুটেপুটে নেয়া হয়েছে অর্থ। অন্য দিকে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজে লাগানোর মিশন কার্যকর ছিল সবসময়। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক রয়েছে। এদের ঢাকায় এনে সরকারের পক্ষে সমাবশে করা হতো। কিছুসংখ্যক অতি উৎসাহী উগ্র আওয়ামীপন্থী শিক্ষক এ কাজে আঞ্জাম দিতেন। অন্য দিকে শিক্ষকদের বড় অংশ এমন অশোভন কর্মকাণ্ডে বিব্রত বোধ করতেন। বিগত ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে পরিচালনা করে এর ভাবমর্যাদা সম্পূর্ণ ধুলার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী আমলের অনিয়ম-দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি দলীয়করণ ও আওয়ামী বন্দনা তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিচারপতি এখনো পাওয়া না যাওয়ায় তদন্ত শুরু করা যায়নি। ইফাকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে প্রথমে দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করতে হবে। জঘন্য সব অপকর্মে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিপূর্ণ সংস্কার করে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সাজাতে হবে।