উপকূলীয় অঞ্চলের চারদিকে বিপুল জলরাশি। কিন্তু এ পানি নোনা হওয়ায় পান অযোগ্য ও ব্যবহারের অনুপযোগী। উপকূলের মানুষের নিত্যদিনের কাজের জন্য নির্ভর করতে হয় পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর। খাওয়ার পানি জোগাড় করতে নিত্যদিন পাড়ি দিতে হয় তিন-চার মাইল পথ।
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার তিন লাখের বেশি মানুষ সুপেয় পানিসঙ্কটে ভুগছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা বিরাজমান থাকলেও এর তীব্রতা বাড়ে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার আঘাতের পর। বিশেষ করে আইলা আঘাতে এ অঞ্চলের সুপেয় পানির উৎসগুলো বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিশুমৃত্যুর পাঁচটি প্রধান কারণের চারটি দূষিত পানি পানের সাথে সম্পর্কিত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের (ডিপিএইচই) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের ৬১ শতাংশ জনগোষ্ঠী গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি। নিরাপদ পানির অভাবে নারীরা; বিশেষ করে কিশোরীরা সবচেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কম পানি পানে নারীরা উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
সুপেয় পানির সঙ্কট শুধু বাংলাদেশে নয়; বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের ২৬ শতাংশ মানুষ খাবার পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, সুপেয় পানির সুবিধাবঞ্চিত জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম অবস্থানে। দেশের ৪১ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
প্রশ্ন হলো- উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের আর কত দিন সুপেয় পানির জন্য কষ্ট করতে হবে? আর কত নারী পানি সমস্যায় ভুগবেন? জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য, গত পাঁচ বছরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় পানিসঙ্কট নিরসনে ৬২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। পাশাপাশি ১৬-২০টি বেসরকারি সংস্থা আরো ৫০টির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি ও দক্ষতার অভাবে সরকারি প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয়নি বলে স্বীকার করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: জামানুর রহমান। তার এ সরল স্বীকারোক্তির পরও বলতে হয়, উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানি সমস্যা সমাধানে চলমান প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নীরব থাকতে পারে না।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মনোযোগ দেয়া। এ জন্য প্রাকৃতিক সমাধানে বেশি নজর দিতে হবে- যেমন, উপকূলে নদ-নদীগুলো পুনঃখনন করা। এতে পানিপ্রবাহ বাড়বে এবং বিনষ্ট হওয়া বিশুদ্ধ পানির আধারগুলো উদ্ধার হবে। সেই সাথে এই অঞ্চলে যেখানে-সেখানে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ নিরুৎসাহিত করতে হবে।
অনেক দেশে লবণাক্ত পানিসমস্যার সমাধানে বড় বড় প্রকল্প স্থাপনের নজির রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি সমস্যা সমাধানে এমন প্রকল্প স্থাপন করতে হবে। শুধু প্রকল্প স্থাপন করে ক্ষান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণেও যত্নশীল হতে হবে। উপকূলবাসীর সুপেয় পানি সমস্যার বিষয়টি শুধু দেখা আর বলে যাওয়া নয়; জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর এই সমস্যা সমাধানে বাস্তবভিত্তিক টেকসই উদ্যোগ গ্রহণে আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।