স্বৈরাচার শেখ হাসিনা অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকায় বিগত দেড় দশক ধরে নির্বাচন ছিল কার্যত নির্বাসনে। আসলে দীর্ঘ এ সময়ে নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তা ছিল প্রহসন। ক্ষমতাসীনদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এভাবে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা ক্ষমতায় থাকার বৈধতা অর্জনের অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু দেশের মানুষ অপশাসনের অবসান, মানবাধিকার এবং ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজছিলেন। অবশেষে চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশবাসীকে সেই সুযোগ এনে দেয়। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে সফল গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার তখতে তাউস উল্টে যায়। তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। গত বছরের ৫ আগস্ট কোনো উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো সেখানে বসে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। অবশ্য, ভারতের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে পেরেছেন। ভারতের সমর্থনের বিনিময়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে দিল্লির স্বার্থ সংরক্ষণ করেছেন শেখ হাসিনা। এ কারণে হয়ে ওঠেন নিকৃষ্ট এক স্বৈরশাসক।
ফ্যাসিবাদী জমানার অবসানের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। স্বৈরাচারের অপশাসনে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে পথে তুলতে কাজ শুরু করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার যে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, দেশের অর্থনীতির গতিপথ দেখলেই তা বোঝা যায়।
একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে স্থান করে নিক, সেজন্য বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন এসব সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবমালা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে; যাতে দেশের রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হয়। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজনের বিষয় অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া পূরণে নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত ৬ জুন শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এ কথা জানান প্রধান উপদেষ্টা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনসংক্রান্ত চলমান সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে আমি আজ দেশবাসীর কাছে ঘোষণা করছি যে আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত সময়ে আপনাদের কাছে নির্বাচনের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রদান করবে।’
আমাদের মনে রাখতে হবে, সব চাওয়া এক সাথে পূরণ হয় না। বড় কিছু অর্জন করতে হলে নিজস্ব ও দলীয় স্বার্থ এক পাশে সরিয়ে জনপ্রত্যাশার প্রতি সমর্থন জানানোই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কর্তব্য।
আমরা আশা করি, দেশে একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার সাথে সব রাজনৈতিক দল সহমত পোষণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। একই সাথে পতিত স্বৈরাচার দেশকে যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল; তা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র মেরামতে সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা করবে, এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।