ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুম-খুন, নানা অবিচারের প্রতিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। সাড়ে ১৫ বছরের অমানবিক শাসন জুলাইয়ে চরম নিষ্ঠুরতা দিয়ে শেষ হয়েছে। সারা দেশে সেই রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। দেশকে শান্তিময় ও স্থিতিশীল করতে হলে বীভৎস সব অপরাধের বিচার হতে হবে। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১০ মাস পার করেছে; কিন্তু জাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত অবিচারের প্রতিকার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। জুলাইয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও অভিযোগ গঠনে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে গুম-খুনের তদন্ত ও বিচার নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। জাতির আশা, নিষ্ঠুরতার শিকার পরিবারগুলো উপযুক্ত প্রতিকার পাক।

আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে মানবাধির সংগঠন অধিকার আয়োজিত আলোচনায় গুমের শিকার ব্যক্তিরা তদন্তের গতি ও বিচার পাওয়া নিয়ে কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে গুমের শিকার পরিবারগুলোর চরম দুর্দশার কথা। এ দিকে গুম কমিশনকে নিয়ম-কানুনে বেঁধে দেয়া হয়েছে। ফলে স্বাধীনভাবে বিস্তৃত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে পারছে না কমিশন। অন্য দিকে নাগরিকদের যারা গুম করে নির্যাতন করেছেন; তারা এখনো বাহিনীগুলোর বিভিন্ন পদে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। সঙ্গত কারণে কমিশনকে স্বাধীনভাবে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে দেয়া না হলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা খুব কঠিন হবে।

বছরের পর বছর গুমের শিকার ব্যক্তিদের ছোট ছোট শিশুসন্তান পরিচয় সঙ্কটে ভুগেছে। বাবার বেঁচে থাকা নিয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় দিন কাটিয়েছে। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর পরিচয়-ঠিকানা কিংবা কী করেন তা বলতে পারেননি। তাদের মধ্যে কিছু পরিবারে এখনো চাপা কষ্ট বিরাজ করছে। গুমের পর ফিরে না আসা পরিবারগুলোতে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কিছু পরিবার সম্পত্তি বেচাকেনা ও ব্যাংক হিসাব চালাতে পারছে না। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। অল্প কিছু পরিবার এ কারণে জটিলতায় পড়েছে। এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। রাষ্ট্র চাইলে সহজে তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারে।

গুমের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল- রাষ্ট্রীয় বাহিনী আন্তঃসীমান্ত চক্র গড়ে তুলেছিল। বিএনপির শীর্ষ নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদির মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিসহ অনেককে পাশের দেশ ভারতে পাচার করা হয়। সে দেশের কারাগারে বাংলাদেশে গুম হওয়া অনেককে পাওয়া গেছে। তাই এখন পর্যন্ত গুম নিয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব মেলেনি। বাংলাদেশের গুমসংক্রান্ত জটিলতার অবসান করতে সব প্রশ্নের জবাব মিলতে হবে। এ নিয়ে গুম কমিশনের অগ্রগতি সামান্য। বিষয়টি মানুষের মনে শঙ্কা জাগায়।

নাগরিকরা যদি গুম হয়ে যান তাহলে দেশের স্বাধীনতার মূল্য কোথায়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুমের মতো অমানবিক ঘটনা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সরকার এখনো এই নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারেনি যে, ভবিষ্যতে আর কোনো গুমের ঘটনা ঘটবে না। এ জন্য দরকার গুমের ঘটনার হোতাদের খুঁজে বের করা, তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া। জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে- বিষয়টির সঠিক সমাধান করা হবে।