বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার জটিল আকার ধারণ করেছে। বেকারত্ব, অশিক্ষা এবং বিদেশে ভালো জীবনের প্রলোভন— এসব পাচারকারীদের প্রধান হাতিয়ার। নারী ও শিশুদের একটি বড় অংশ তাদের প্রতারণার শিকার হয়ে দেশ-বিদেশে পাচার হচ্ছে। প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজটি দেশে বড় মাত্রায় হতে পারছে।

দেশে সম্মানজনক পেশা না পেয়ে কাজের খোঁজে বিদেশে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশী তরুণরা দালালের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। দালালরা তাদের বিদেশে নেয়ার কথা বলে অনেক ক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে। কেউ কাঙ্ক্ষিত দেশে পৌঁছাতে পারছেন, তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেককে কারাগারে অমানবিক অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। কখনো কখনো পথে অপহরণ করে নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। নারী সদস্যদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে।

মানবপাচার এখন বিস্তৃত হয়ে একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। ভূমধ্যসাগরে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী তরুণের সম্প্রতি সলিল সমাধি হয়েছে। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকা অন্তত ২২ অভিবাসীর মৃত্যু অথবা নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। যাদের মধ্যে ২০ জনই বাংলাদেশী বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২৬ মার্চ গ্রিসের উপকূলে অভিযানে ৪৮ আরোহীর মধ্যে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

লিবিয়া থেকে ছোট রাবারের নৌকা করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১২ জনের করুণ মৃত্যু হয়, তাদের সবাই তরুণ। গ্রিসে যেতে এদের একেকজন ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেকে গরু, জমিজমা বিক্রি করে দালালদের হাতে টাকা তুলে দেন। অবৈধ পথে ইউরোপে নিতে সুনামগঞ্জ জেলায় একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের সহযোগীরা আছে লিবিয়ায়। সারা দেশে মানবপাচারকারীদের এ ধরনের নেটওয়ার্ক রয়েছে।

মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরা প্রায়ই জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ কিংবা দাসত্বের মতো অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়েন। অনেকে আর ফিরে আসতে পারেন না। যারা ফিরে আসেন, তাদের পুনর্বাসনও সহজ হয় না। এ ক্ষতি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নেরও।

মানবপাচার রোধে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার। সচেতনতা কার্যক্রমও আছে। দেশে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন রয়েছে। তার পরও পাচার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও দুর্নীতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এ সমস্যার সমাধানে প্রথম দরকার মানবপাচারে যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। সেই সাথে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে এজন্য একসাথে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যেখানে মানুষ সহজে প্রতারণার শিকার হন।

মানবপাচার রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষকে বিকল্প কাজের সুযোগ দেশেই সৃষ্টি করে দেয়া। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা বিস্তার এবং নিরাপদ অভিবাসনের পথ নিশ্চিত করা গেলে পাচারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, মানবপাচার সাধারণ কোনো অন্যায় নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।