বেশ কয়েক বছর পর এবারের রমজানে মানুষ ছিলেন অনেকটাই স্বস্তিতে। একমাত্র সয়াবিন তেলের কারসাজি ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে। যদিও রোজার আগের সপ্তাহে বাজারে দ্রব্যমূল্যের একটি সিন্ডিকেট সিন্ডিকেট রব উঠলেও পরে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেকোনো কারণেই হোক পিছু হটেছে কর্তৃপক্ষের ফলপ্রসূ পদক্ষেপে। ব্যতিক্রম বড় চেনশপগুলো। ভোক্তা অধিদফতর রহস্যজনক কারণে চেনশপগুলো এড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন চেনশপে বিভিন্ন পণ্য, বিশেষ করে ছোলা, মসুর ডাল বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি মূল্যে বিক্রি হয়েছে ও হচ্ছে। এসব দোকানে বিত্তশালীরাই বাজার করতে যান। তবু তারাও তো ভোক্তা। তাদের স্বার্থও দেখা দরকার। একই ছোলা বা মসুর ডালের দাম কেজি-প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি তারতম্য হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিদফতর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

এবার ঈদের ছুটি পাঁচ দিন হলেও সামনে-পেছনে মিলে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ দিনে ঠেকবে। এ রকম দীর্ঘ ছুটিতে শিল্পকারখানার উৎপাদনসহ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা অত্যাবশ্যকীয় সেবার। ছুটি পরিকল্পনার ব্যাপারে আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে দৃষ্টি রাখবে। ঈদের ছুটি লম্বা হওয়ার কারণে ঘরমুখী জনতার ভিড়ও সমন্বিত এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ হওয়ারই প্রত্যাশা। যানবাহনে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ না পড়ার সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে টিকিটের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবে আশা করি। আরেকটি ব্যাপার না বললেই নয়। দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানীর আবাসিক এলাকা, বাড়িঘরের নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কা। এ ব্যাপারে পুলিশ, বিজিবি, আনসার বাহিনীর সাথে বেসামরিক যৌথ টহলের ব্যবস্থা করা যায় কি না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। একই সাথে রাস্তায় রাহাজানি, যানজট, ডাকাতি এসব ব্যাপারেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

রোজার সময় স্বাভাবিকভাবেই গ্রামগঞ্জ, শহর, সর্বত্রই ধুম পড়ে ইফতার আয়োজনের। এর মাধ্যমে ঈদ আনন্দের মতোই পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ, মুটে-মজুর, রিকশাওয়ালা, বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী সব একাকার হয়ে যায় ইফতারিতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে। মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই মানুষ মানুষই। সবাই আল্লাহর সৃষ্টি। ইসলামের এই মহান শিক্ষার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ প্রতিভাত হয় ইফতারে। এ ক্ষেত্রে ভেবে দেখা দরকার বিশেষায়িত ইফতার আয়োজনের। যেখানে শুধুই বিশেষ ব্যক্তিদের প্রবেশাধিকার। একই সাথে মূল্যমানের দিক থেকে। সাধারণের নাগালের বাইরেই শুধু নয়, অনেকসময় কল্পনারও বাইরে। রমজানের শিক্ষা সংযম। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সংযমের শিক্ষা নিয়ে রমজান আসে। একই সাথে রমজান শিক্ষা দেয় সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার। বিশেষায়িত ইফতারে একজন রোজাদারের ইফতারি মূল্য দিয়ে সাধারণভাবে ৫০ থেকে ৬০ জন রোজাদারকে ইফতার করানো যায়। ইসলাম ও রমজান সামাজিক বৈষম্য শেখায় না। শেখায় সামাজিক সৌভ্রাতৃত্ব ও সমানাধিকার। এ ধরনের ইফতার আয়োজন সীমিত করে ওই অর্থে মাসভর গণ-ইফতারের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের সাথে বাড়বে যোগাযোগ, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ, যা রমজানের একটি মৌলিক শিক্ষা। ঢাকা শহরের কয়েক জায়গায় দেখলাম দুই টাকার বিনিময়ে ইফতারির সুযোগ। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এ ধরনের আয়োজন অবশ্যই প্রশংসনীয়। কোনো কোনো জায়গায় বিনামূল্যে, অনেক প্রতিষ্ঠান সারা মাস ধরেই ইফতারের আয়োজন করছে। যারা বিভিন্ন কারণে বিশেষায়িত ইফতারির আয়োজন করেন ভবিষ্যতে তাদের ব্যাপারটি ভেবে দেখার সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল।

ঢাকা শহরে এবার রমজানের সামাজিক উৎপাত ইঞ্জিনচালিত রিকশা। রাস্তায় এদের সমারোহ দেখলে মনে হবে ঢাকা শহরে মানুষের চেয়ে এই বিশেষ যানটির সংখ্যাই বেশি। এই যানটির উৎপাতে রাস্তায় চলা দুরূহ। এসব যানের চালকরা রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুন কিছুই জানেন না এবং মানতে চান না। ফলে অহরহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা লেগেই আছে। এসব রিকশা সচল রাখতে সারা দেশে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয় দেখা দরকার। বিদ্যুতের সরবরাহ স্বল্পতার মধ্যে এ ধরনের যান কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ভাবা জরুরি। এসব রিকশা মূলত যন্ত্রযান। স্বাভাবিকভাবেই অন্য যন্ত্রযানের মতো এসবের ওপর কর আরোপ করা যৌক্তিক। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হবে। একই সাথে এসব যান চালকদের যান চালনার লাইসেন্স নেয়া প্রয়োজন। রাস্তায় নিরাপদ চলাচলের প্রয়োজনে এসব বাহনের ন্যূনতম ফিটনেস নির্ধারণ নিশ্চিত করা দরকার।

নিকট অতীতে এদের দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে প্রশাসনকে কোণঠাসা করার চেষ্টা ভুলে গেলে চলবে না। এই যানটিকে অচিরেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দুর্ঘটনা ও যানজট বাড়তেই থাকবে। এমনিতেই ঢাকা পরিচিত যানজটের শহর হিসেবে। নতুন এই উৎপাত এতে নতুন মাত্রা যোগ করবে নিঃসন্দেহে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

shah.b.islam@gmail.com