২০২৬ সালের ৫ আগস্ট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বাংলাদেশ যখন শহীদদের স্মরণ করছিল এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছিল, ঠিক তখন নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার মঞ্চে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি অডিও সংযোগে কথা বলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর এটি ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন। সেখানে তিনি নিজের বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে রাজনৈতিক বলে প্রত্যাখ্যান করেন। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। সেই সাথে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন।
দিল্লি বলেছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম সংগঠনের আয়োজন; ভারত সরকার এর সাথে যুক্ত নয়। সেখানে দেয়া বক্তব্যকেও সমর্থন করে না। আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়েও বলা যায়, এটি রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট নয়। প্রশ্নটি শুধু কে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ভারতের সুরক্ষায় বাংলাদেশের একজন দণ্ডিত সাবেক সরকারপ্রধান কীভাবে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। নয়াদিল্লি যদি তার অবস্থানকে মানবিক বিবেচনায় দেয়া আশ্রয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তবে সেই আশ্রয় রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে কি না, তার উত্তরও ভারতকে দিতে হবে।
মানবিক আশ্রয়, নাকি রাজনৈতিক মঞ্চ
ভারত শেখ হাসিনার জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। কিন্তু মানবিক আশ্রয় কাউকে দায়মুক্তি দেয় না; আশ্রয়দাতা দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার অবাধ অধিকারও দেয় না। মানবিক সুরক্ষা জীবন রক্ষার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সদর দফতর প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স নয়।
বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত, ভারত যেন তার ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সহিংস, নাশকতামূলক বা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে না দেয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে যদি বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেয়া, পলাতক নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা, অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা পাঠানো, নাশকতার পরিকল্পনা করা, দলীয় নির্দেশনা দেয়া কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়। তবে তা আর নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন বিষয়টি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্বের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে।
৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনটি নিছক ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দেশে ফেরার সময়সূচি এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ভারত যে রাজনৈতিক তৎপরতা অনুমোদন না করার ধারণা দিয়েছিল, এই আয়োজন তা দুর্বল করেছে। ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে’- এ কথা ভারত সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা অস্বীকার করতে পারে; কিন্তু ভারতের এখতিয়ার ও দায়িত্ব মুছে দেয় না। বিশেষ নিরাপত্তায় থাকা একজন বিদেশী রাজনৈতিক নেতার ওপর কী শর্ত প্রযোজ্য হবে, তা ভারতই নির্ধারণ করে।
সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি। নয়াদিল্লির কাছে তিনি হয়তো এখনো একজন সাবেক কৌশলগত মিত্র। কিন্তু বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় তিনি একজন দণ্ডিত সাবেক শাসক; যার সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচনী কারচুপি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সহিংসভাবে দমনের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশ তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ও প্রত্যর্পণ চাইতে পারে। অন্য দিকে ভারতও নিজস্ব আইন ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে সেই আবেদন যাচাই করার অধিকার রাখে। কিন্তু তিনি ঠিক কোন আইনি মর্যাদায় ভারতে অবস্থান করছেন, এ বিষয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয়।
শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনটি করায় প্রথম ক্ষতি হয়েছে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টায়। বাংলাদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, ভারত বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের চেয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সাথে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। দিল্লিতে এই আয়োজন সেই পুরনো সন্দেহকে আরো শক্তিশালী করেছে। ভারত যদি নতুন বাংলাদেশের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে চায়, তবে শুধু সরকারি বিবৃতি নয়, আচরণের মাধ্যমেও দেখাতে হবে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তার কোনো পছন্দের দল নেই। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় এসেছেন, এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করবে।
সাবেক সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে
শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানরত একমাত্র রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ব্যক্তি নন। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক সূত্রমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনকারী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাবেক রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বা সেখানে অবস্থান করছেন। কিন্তু তাদের পরিচয়, বর্তমান অবস্থান এবং আইনি মর্যাদা সম্পর্কে কোনো পূর্ণাঙ্গ ও যাচাইকৃত সরকারি তালিকা জনসমক্ষে নেই। এ তথ্যশূন্যতা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে না; বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর নিরাপত্তাগত দুর্বলতাও তৈরি করছে।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর আগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের হত্যা, গুম, নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে তারা মনে করলে দেশে ফিরে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন না কেন? বাংলাদেশের আদালতে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন, আইনজীবী নিয়োগ এবং অভিযোগ খণ্ডনের সুযোগ আছে। তাহলে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হতে তাদের এত ভয় কেন? বিদেশে অবস্থান করে বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলার এ প্রবণতা সন্দেহ বাড়ায়। সেই সাথে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বিশেষত যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে, ভারতে তাদের উপস্থিতি আরো গুরুতর প্রশ্ন তোলে। উচ্চপদস্থ সাবেক সামরিক, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গোয়েন্দা কার্যপদ্ধতি, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিচয় এবং মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। তারা যদি বিদেশে বসে কোনো রাজনৈতিক, সাংগঠনিক বা অপারেশনাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, তবে সেটি আর কেবল বিচার এড়িয়ে চলার বিষয় থাকবে না; বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তায় বাস্তব হুমকিতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ সরকারের জানা প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কবে, কোন পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশ করেছেন। তারা কোন শ্রেণীর ভিসা, বিশেষ অনুমতি বা দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের ভিত্তিতে সেখানে অবস্থান করছেন। সেই অনুমতির মেয়াদ কত। তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার ওপর কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না। বাংলাদেশের আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা ও প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারত কী ব্যবস্থা নিয়েছে। এগুলো নিছক কৌতূহল বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্ন নয়। এগুলো দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থা, আইনগত সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রমাণভিত্তিক কূটনীতি
বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া শুধু প্রকাশ্য নিন্দায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত একটি বিস্তারিত কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে ভারতকে ব্যক্তিভিত্তিক তথ্য, নাম, পদবি, পাসপোর্টের তথ্য, মামলার নম্বর, গ্রেফতারি পরোয়ানা, অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দেয়া। এরপর প্রত্যেক ব্যক্তির আইনি অবস্থান, ভিসার ধরন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শর্ত এবং প্রত্যর্পণ বা আইনগত সহায়তার অনুরোধের অগ্রগতি সম্পর্কে ভারত সরকারের কাছে লিখিত জবাব চাইতে হবে। অস্পষ্ট অভিযোগের চেয়ে প্রমাণসমৃদ্ধ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুরোধ অনেক বেশি কার্যকর।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার। তার কূটনৈতিক পাসপোর্টের সুবিধা বাতিল হওয়ার পর তিনি বর্তমানে কোন আইনি ভিত্তিতে ভারতে আছেন। বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারত কত দূর পরীক্ষা করেছে। সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকলে বিলম্বের আইনগত কারণ কী। তাকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়েছে কি না, ঢাকার উচিত এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া। ভারত প্রকাশ্যে সব ব্যক্তিগত তথ্য না জানালেও রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ সরকারকে উত্তর দিতে পারে এবং দেয়া উচিত।
দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ নিরাপত্তা ও আইনি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে প্রত্যর্পণ, পারস্পরিক আইনগত সহায়তা, সীমান্ত অতিক্রম, ভিসার অবস্থা এবং উসকানিমূলক বা সহিংস কর্মকাণ্ডের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। তবে রাজনৈতিক নির্বাসিত ব্যক্তি, সাধারণ দলীয় কর্মী এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে।
দিল্লি ও ঢাকার সামনে সিদ্ধান্ত
ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পরকে এড়িয়ে যেতে পারে না। সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও মানুষের চলাচল, সব কিছু দুই দেশকে একে অপরকে সহযোগিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই শেখ হাসিনার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার মানে এই নয় যে, ভারতের সাথে স্থিতিশীল সম্পর্ক থাকবে না। অন্য দিকে ভারতকে ঠিক করতে হবে, তার সম্পর্ক বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের সাথে, নাকি একটি নির্দিষ্ট দল ও নেতার সাথে।
ভারত শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই বলে ভারতের ভূখণ্ড বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করার ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে না।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক