গোলাম রসুল সানি

শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত করতে তিন দশক ধরে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত। বিশ্বজুড়ে ১০০টির মতো দেশ দিবসটি উদযাপন করে। এবারের ‘শিক্ষক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- ‘শিক্ষকতা পেশা : মিলিত প্রচেষ্টার দীপ্তি’। দিনটি শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রচলন করা হয়েছে। এতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।

শিক্ষক শুধু জ্ঞান দান করেন না; বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের শিক্ষা দিয়ে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন, যা জাতিকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করে। শিক্ষক ছাড়া সবার জীবন এলোমেলো। শিক্ষকরা আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকেন। এমন কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না, যার কোনো শিক্ষক নেই। আমরা প্রত্যেকে প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখছি ঘরে-বাইরে ও প্রকৃৃতি থেকে। তাই একজনের ব্যক্তিত্ব বা ভবিষ্যৎকে সঠিক ও সুন্দর রূপ দেয়ায় শিক্ষকের বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু একজন শিক্ষকই কোনো ব্যক্তিকে জীবনের সঠিক পথ বেছে নেয়ার বুদ্ধি, আদেশ বা উপদেশ দিতে পারেন। শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের শুধু জ্ঞানার্জনে সাহায্য করেন না, তাদের এগিয়ে নিয়ে যান সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষক রয়েছেন (ব্যানবেইস, ২০২৩)। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষক এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োজিত, যাদের অনেকে মাস শেষে পূর্ণ বেতন পান না নানা প্রশাসনিক জটিলতায়।

ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষকের সম্মান যত বেশি, শিক্ষার মান তত উন্নত; কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশা এখন তরুণদের কাছে প্রথম পছন্দের নয়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকতাকে ‘আদর্শ পেশা’ হিসেবে বিবেচনা করে। বাকি ৮৭ শতাংশ চায় করপোরেট, প্রযুক্তি বা প্রশাসনিক খাতে যেতে।

আমাদের দেশে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার অভাব স্পষ্ট। ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বেসরকারি স্কুলের ৪৩ শতাংশ শিক্ষক ১০ হাজার টাকার নিচে বেতন পান। অথচ এই শিক্ষক সকাল ৮টা থেকে বিকেল পর্যন্ত স্কুলে পাঠদানের পর বাড়ি ফিরে কোচিং করেন, কারণ সংসার চালাতে হয়।

নারী শিক্ষকরা লিঙ্গবৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা ও পদোন্নতির অভাবে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেন। প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক শিক্ষক স্কুলে যান নৌকা, বাইসাইকেল বা হেঁটে- নিজ খরচে। চক ও খাতা কিনতেও নিজ পকেট থেকে খরচ করতে হয় অনেকসময়।

সমাজে শিক্ষকের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন আছে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ আজ শিক্ষককে শ্রদ্ধার বদলে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ মনে করেন। স্কুলে শিক্ষকের ওপর হামলা, সামাজিক লাঞ্ছনা, থানায় শিক্ষককে অপমান- এসব ঘটনা শিক্ষকসমাজের মানসিক অবস্থা বুঝিয়ে দেয়।

বিশ্বের উন্নত দেশে যেখানে শিক্ষকরা ন্যূনতম আয়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি বেতন পান (ইউনেস্ক, ২০২২) সেখানে আমাদের দেশে অনেক শিক্ষক ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে পারছেন না। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা জরুরি : প্রতি বছর শিক্ষক দিবস পালনের মানে কি শুধু ব্যানার, ফুল আর বক্তৃতা? নাকি একজন শিক্ষককে তার প্রাপ্য মর্যাদা, ন্যায্য বেতন ও সামাজিক সম্মান দেয়ার প্রতিশ্রুতি? একজন শিক্ষকের সম্মান কেবল এক দিনের আয়োজন নয়, তা হওয়া উচিত প্রতিদিনের সংস্কৃতি।

লেখক : নির্বাহী মহাসচিব, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি