মানুষ সামাজিক প্রাণী। সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমন্বিত চেষ্টায় গড়ে ওঠে সামাজিক জীবনাচার ও সভ্যতা। যে জীবনাচার পথ দেখায় কল্যাণের, শান্তির, সহাবস্থানের, সহযোগিতার। মানবিক কল্যাণের চেতনায় সমৃদ্ধ করে মানবজীবন। পরিশীলিত করে জীবন ও জীবনবোধ। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই এ ধরনের কল্যাণমুখী চেতনার আবহে বিকশিত হয়েছে সভ্যতা ও জীবন। মানুষ যত শিক্ষিত হয়েছে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যত বেগবান হয়েছে মানুষ ততই হয়েছে পরিশীলিত। ব্যতিক্রম যে হয়নি তাও নয়। মানুষকে সভ্যতার যূপকাষ্ঠে বিসর্জন দেয়া হয়েছে শান্তি, মানবাধিকার, প্রগতির নামে, উন্নয়ন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে। যার প্রমাণ বর্তমান সামাজিক অস্থিরতা। এখন সমাজের প্রায় সর্বত্রই ভাঙনের চিহ্ন। সংবাদ মানেই এখন দুর্ঘটনা, ডাকাতি-ধর্ষণ এবং খুনের ভয়াবহতা। যে যত বড় ঠগবাজ, পাচারকারী, মিথ্যাবাদী তার তত সম্মান; তারাই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের পদক গলায় ঝুলিয়ে ব্যঙ্গ করছে সরল সাদাসিধে জনগণকে, সজ্জনদের। ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস’ ইত্যাদি সুবচন এখন নির্বাসনে। অসৎ সঙ্গই এখন সফলতার সোপান।

সংস্কৃতির সংজ্ঞা বদলেছে সমাজে। এখন সেই সবচে প্রগতিশীল, সংস্কৃতিবান যে যত উদার বা নগ্ন হতে পারে। লিভ টুগেদার এখন প্রগতিশীলতার মাপকাঠি। ধর্মের বিরুদ্ধে যে যত বেশি সোচ্চার, প্রগতিবাদীর তকমা তার তত বেশি শিরোপায়। বহুগামিতার, পরকীয়ার চর্চা দেখে মনে হয় আইয়ামে জাহেলিয়াতের বাকি নেই। ব্যক্তি স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে রমজানের পবিত্রতাকে ব্যঙ্গ করা আজ সাংস্কৃতিক শিষ্টাচার।

শিক্ষাঙ্গনে অবাধ মেলামেশা, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর যৌন হয়রানি, লেকের পাড়ে প্রকাশ্যেই যুবক-যুবতীর অবাধ বেলেল্লাপনা কোনো দিকেই এ সমাজ পিছিয়ে নেই। মা-বাবাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। প্রায়ই খবর আসে, হোটেলে যুবক-যুবতীদের অবাধ ও একান্ত মেলামেশার। হোটেলে যুবতীর বেওয়ারিশ লাশ। কিছু দিন আগে আলোড়ন সৃষ্টিকারী লোমহর্ষক ঘটনা মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রীকে কিশোর গ্যাং কর্তৃক কোপানো। পরে জানা যায়, স্ত্রীরূপী মহিলা আসলে স্ত্রী ছিলেন না ছিলেন পরস্ত্রী। ইদানীং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিয়েবহির্ভূতভাবে বাবা-মা হওয়ার খবর বেশ ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। কিছু বৃদ্ধিজীবী আবার আগ বাড়িয়ে সমর্থনও জানায়।

পরকীয়া ও লিভ টুগেদার আমাদের সামাজিক পটভূমি ও পারিবারিক সংস্কৃৃতিতে মারাত্মক বিষফোঁড়া। এসব রোধে সমাজপতি, আইনপ্রণেতাদের এগিয়ে আসা দরকার। না হলে আমাদের পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিই হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে নিরাপদ আশ্রয়টি। শিশুরা আশ্রয়হীন হয়ে সাধারণ সামাজিক জীবনের বাইরে সন্ত্রাস ও মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। গড়ে উঠবে অসংখ্য কিশোর গ্যাং। ইদানীং কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে সবাই শঙ্কিত, সন্ত্রস্ত।

বাংলাদেশ শিশু আইনের দৃষ্টিতে একজন কিশোরকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বলা হয়। অথচ একই বয়সে সে ভোটাধিকার লাভ করে। ভোটার মানেই সে প্রাপ্তবয়স্ক! অথচ শিশু আইনের মারপ্যাঁচে তাকে কোনো অপরাধের জন্য বিচার করা যাবে না। বর্তমান ডিজিটাল যুগে একজন শিশু বা কিশোর ১৪ বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে, ভালো-মন্দের মাপকাঠিতে অনেক পরিপক্ব হয়ে ওঠে। এরা যখন বিপথগামী হয় আইন তাদেরকে অপরাধী বলতে পারে না! আইনটির সংস্কারে আইনজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এটি হওয়া উচিত। শিশুরা অপরাধে সম্পৃক্ত হচ্ছে প্রথমত, পারিবারিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে। দ্বিতীয়ত, আকাশ অবারিত নীল ছবির কল্যাণে। তৃতীয়ত, মাদকের মোহময় আকর্ষণে।

দুঃখজনকভাবে শিশু-কিশোরদের প্রাথমিক শিক্ষার আঁতুড়ঘর নামক পরিবার আজ মা-বাবার অবাধ জীবনাচারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে সমাজের বিত্তবানদের ক্ষেত্রে পরকীয়া, মদ-জুয়ার প্রচলন বেশি। পরিবারে সময় দেয়ার চেয়ে বাইরের চাকচিক্যময় জীবনে মা-বাবার সময় কাটে বেশি। সন্তানকে, পরিবারকে সময় দেয়ার ফুরসত তাদের থাকে না! এরই ফাঁকে বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, মাধ্যমিক পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এরও পেছনে পারিবারিক অবহেলা, স্কুলে শিক্ষকদের গঞ্জনা এসবের প্রভাব কাজ করছে বলে গুণীজন মনে করেন। বাজারের দিকে তাকালে নিজেকে এক বিরাট শূন্যতার মধ্যে আবিষ্কারের বিকল্প নেই। ভেজাল, ওজনে কম, মেয়াদোত্তীর্ণ দ্রব্যাদি অবলীলায় ব্যবসায়ীরা তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার হাতে। অথচ ওজনে কম দেয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার কঠিন-কঠোর সতর্কবাণী। দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীর কাছে ব্যবসার কৌশল। দেশের আইনে এবং ইসলামে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবিক দৃষ্টিতেও অন্যায়।

চতুর্দিকে নিত্যনতুন নয়নাভিরাম মসজিদের সংখ্যা বাড়লেও নামাজির সংখ্যা ক্ষীয়মান। রাজনীতির চেহারা আরো ভয়াবহ। মিথ্যার ফুলঝুড়ি আর গিবতের মাধ্যমে নিয়তই বিভ্রান্ত করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মিথ্যা যে মোনাফিকের চরিত্র আমাদের নেতা-নেত্রীরা ভুলে বসে আছেন। পরিবার, সমাজ বা জাতীয় ক্ষেত্রে সৎ এবং আদর্শ নেতৃত্বের অভাব সমাজকে বেপথু করছে।

পরিবার নামক শিশুর প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা ভেঙে পড়ায়, অবৈধ-অশালীন-অনিয়ন্ত্রিত পারিবারিক জীবন পরিবারের সদস্যদের জীবন বিপর্যস্ত করে বেপথু। সমাজে আদর্শিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সামাজিক বিশৃঙ্খলাকে উসকে দিচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে অনৈতিকতা উচ্ছৃঙ্খলতা, আইনের শাসনের অভাব জাতিকে ঠেলে দিয়েছে অধঃপতনের অতল গহ্বরে। স্কুলের অনৈতিক পরিবেশ একজন শিশুকে আলোর জগতের বাসিন্দা হওয়ার পরিবর্তে করেছে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। ব্যাধিতে আক্রান্ত আমাদের পরিবার, সমাজ ও জাতি। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সামনে অনিশ্চিত জাতির ভবিষ্যৎ। এ ক্ষেত্রে এখনই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ