ছেলেপুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা-বাবার চিন্তার অন্ত নেই। সারাক্ষণ পেরেশানিতে থাকেন। নিজে সফল বা ব্যর্থ হোন, একান্ত চাওয়া, সন্তানের উন্নতি ও প্রতিষ্ঠা। সন্তানের যশ-খ্যাতি, প্রতিপত্তি নয়নভরে উপভোগ করতে চান তারা। কবির ভাষায়, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’।
মায়া-মমতা মানব চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতায় জন্ম নেয় মমত্ববোধ। এই প্রবণতা সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রকাশ পায় মা-বাবা ও সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্কে। এ নিয়ে আছে কিংবদন্তির ছড়াছড়ি। যেমন– মোগল সম্রাট বাবর নাকি খোদার কাছে ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন, নিজের জীবনের বিনিময়ে তার ছেলে হুমায়ুনের রোগমুক্তির। এ তো গেল জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তির কিংবদন্তি। খুঁজলে সাম্প্রতিক সময়েও আমাদের সমাজের কিছু ঘটনাও শিহরণ জাগানিয়া। এতে অনেকে হয়তো অনুপ্রাণিত হতে পারেন। সন্তানের প্রতি বাবার অপত্য স্নেহের এ ঘটনা এর মধ্যে তুমুল আলোচিত।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিজের এলাকা বগুড়ায় দু’টি উপজেলার চারটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন নিজের দুই ছেলে, ভাতিজি এবং বংশের নামে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। এমন বিতর্কের মধ্যে নিজ এলাকার ৫০ বছরের পুরনো একটি স্কুলের নাম তার নিজের নামে নামকরণ করতে বিদ্যালয় কমিটির প্রস্তাব এবং একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও আটকের ঘটনায়ও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না তার।
তিনি স্নেহবশে দুই ছেলের নামই শুধু নয়, ভাতিজির মন রক্ষায় তার নামও স্বর্ণাক্ষরে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তার এ মহতী উদ্যোগ ভালোভাবে নিতে পারেননি অনেকে। বাদ সেধেছেন বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্যও। তিনি সংসদে এমন কাজের ব্যাখ্যা চেয়ে বসেন। অন্য দিকে বেরসিক মিডিয়া ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
১১ জুন জেলা প্রশাসকের সই করা প্রজ্ঞাপনে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়। এতে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম দেয়া হয় ‘মীরবাড়ি’। অন্য দিকে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত তিনটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। চারটি নতুন ইউনিয়নের মধ্যে মীরবাড়ি, সীমান্ত ও দিগন্ত– এই তিনটির নাম নিয়ে মূলত বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নামে একটি ইউনিয়ন এবং তার দুই ছেলের নামে দু’টি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ি’। তার বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের দাবি, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজি যার নাম স্বর্ণালী; যাকে পরিবারে সংক্ষেপে ‘স্বর্ণ’ নামে ডাকা হয়। মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়নের নামের একাংশ তার ডাকনামের সাথে মিলে য়ায়।
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ জাতীয় সংসদে দু’টি ইউনিয়ন দুই ছেলের নামানুসারে রাখা হয়েছে এমন অভিযোগ করলে প্রতিমন্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘নতুন ইউনিয়নের নামের সাথে তার সন্তানদের নাম ‘মিরাক্যালি’ মিলে গেছে’। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯-এর ১১-এর (২) উপধারা
(১) অনুযায়ী, ইউনিয়নের নামকরণ কোনো ব্যক্তির নামে করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজে ওই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ নিয়ে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করার চেষ্টার কারণে সরকারের কাছ থেকে শাস্তি পাওয়ার উদাহরণ তো খুব একটা দেখা যায় না এ দেশে। সে কারণে এগুলো ঘটতেই থাকে (বিবিসি বাংলা, ২০ জুন-২০২৬)’
নাম নিয়ে এই বিতণ্ডার মধ্যে স্থান, স্থাপনার নামকরণের বিষয়ে আমরা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান একটু পরখ করে দেখতে চাই।
বস্তুত নিজের নাম স্মরণীয় করে রাখার ইচ্ছা প্রায় সব মানুষের সহজাত প্রবণতা; কিন্তু তা যখন সামাজিক সম্পর্ককে মর্যাদা-ক্রম, ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভুত্বের ধারণার সাথে যুক্ত করে, তখন তা সামন্ত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ‘সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা’ হলো ব্যক্তিগত মর্যাদা, বংশগৌরব, সামাজিক পদমর্যাদা ও নিজের প্রভাবের দৃশ্যমান প্রদর্শনের প্রবণতা। সামাজিক ও রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে এর কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে :
প্রথমত, প্রতীকী উত্তরাধিকার। সাধারণত মানুষ প্রায়ই চায় তার প্রভাব বা স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী করতে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা : ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জনের পর অনেকে চায় ওই মর্যাদার দৃশ্যমান প্রতিফলন থাকুক। নামকরণ এর একটি উপায়। তৃতীয়ত, পারিবারিক বা বংশগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা : উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বংশ বা রাজনৈতিক পরিবারের পরিচয়কে ক্ষমতাবলয়ের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হয়। চতুর্থত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি : যেখানে প্রতিষ্ঠান বা নীতির চেয়ে ব্যক্তি বেশি গুরুত্ব পায়, সেখানে নেতা ও তার পরিবারের নাম নানা স্থানে ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকে। পঞ্চমত, স্থানীয় জনপ্রিয়তা বা সমর্থকদের উদ্যোগ : অনেকসময় সমর্থক, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন নামকরণের প্রস্তাব ও অনুমোদিত হয়।
‘নার্সিসিজম অ্যান্ড পলিটিকস : ড্রিমস অব গ্লোরি’ গ্রন্থের লেখক মনোচিকিৎসক ও রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী জেরোল্ড এম পোস্ট বলেন, ‘গৌরবের স্বপ্ন’ (ড্রিমস অব গ্লোরি) দিয়ে চালিত কিছু রাজনৈতিক নেতা শুধু ক্ষমতা চান না; ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান। এ জন্য প্রতীক, স্মৃতিস্তম্ভ, নামকরণ, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি স্থায়ী করতে চান।
ম্যানফ্রেড কেটস ডি ভ্রিস একজন বিশ্বখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ। ‘নার্সিসিস্টিক লিডারশিপ : নার্জিসাস অন দ্য কাউচ’ বইয়ে তিনি বলেছেন, কিছু নেতা নিজেদের একটি ‘মহৎ কাহিনীর নায়ক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তখন প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র বা সংগঠন ধীরে ধীরে ব্যক্তির সম্প্রসারণে পরিণত হয়। নামকরণ, স্মারক নির্মাণ, প্রতিকৃতি প্রদর্শন- ইত্যাদি তখন আত্ম-প্রতিষ্ঠার প্রতীক হতে পারে।
‘দ্য ট্রুু বিলিভার’ গ্রন্থে লেখক এরিক হফারের মতে, ব্যক্তিপূজা শুধু নেতার কারণে হয় না; অনুসারীরাও এমন প্রতীক খোঁজেন, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের পরিচয় ও গর্ব প্রকাশ করতে পারেন। ফলে কখনো নেতার নামকরণের উদ্যোগ সমর্থকদের পক্ষ থেকেও আসতে পারে।
ব্যক্তিপূজাবিষয়ক (কাল্ট অব পার্সোনালিটি) বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো নেতাকে প্রতিষ্ঠান বা নীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, তখন তার নাম ও প্রতীক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের প্রায় সব স্থাপনার নামে শেখ মুজিব ও তার পরিবারের নাম জুড়ে দেয়া।
যদি কোনো নেতা নিজের, সন্তানের বা বংশের নামে সরকারি কাঠামোর নামকরণের সাথে যুক্ত হন, তাহলে রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞান সাহিত্য সাধারণত চারটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয় : ১. উত্তরাধিকার নির্মাণ; ২. প্রতীকী ক্ষমতা প্রদর্শন; ৩. আত্মমর্যাদা ও স্বীকৃতির আকাক্সক্ষা; ৪. ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি ‘আত্মমুগ্ধতা’। রোগনির্ণয়মূলক সিদ্ধান্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়া দেয়া মুশকিল।
মানুষের নাম-যশ-খ্যাতি-প্রতিপত্তির প্রতি মোহ বা আকর্ষণ একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়। এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ কাজ করে :
প্রথমত, মানুষ চায় অন্যরা তাকে মূল্য দিক, সম্মান করুক, তার অস্তিত্ব ও অবদানকে গুরুত্ব দিক। দ্বিতীয়ত, খ্যাতি বা প্রতিপত্তি প্রায়ই ক্ষমতা, সুযোগ এবং সামাজিক সুবিধা এনে দেয়। ফলে মানুষ এগুলো নিজের অবস্থান শক্ত করার উপায় হিসেবে দেখে। তৃতীয়ত, অনেকে সাফল্য ও পরিচিতি নিজের উপস্থিতি দৃঢ় করার কাজে ব্যবহার করেন।
এটি এক অর্থে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা। সাধারণভাবে দেখা যায়, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রতিযোগিতামূলক স্বভাবের মানুষ প্রায়ই খ্যাতি ও প্রতিপত্তির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। সৃজনশীল বা কর্মমুখী মানুষও খ্যাতি চাইতে পারেন, তবে তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কাজের ঔৎকর্ষ; খ্যাতি হলো বাইপ্রোডাক্ট। অন্য দিকে কিছু মানুষ তুলনামূলকভাবে অন্তর্মুখী, আত্মতৃপ্ত বা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করায় নাম-যশকে প্রাধান্য দেন না। তারা নামের কাঙাল নন; বরং ব্যক্তিগত শান্তি, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক, জ্ঞানচর্চা বা নৈতিক জীবনকে বেশি মূল্য দেন।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com