ড. এ কে এম মাকসুদুল হক
৫ আগস্ট জাতির জীবনে নিয়ে এসেছিল স্বাধীনতার অনাবিল আনন্দ আর নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নসুখ। দীর্ঘ শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট নাগরিকদের বুক থেকে নেমেছিল জগদ্দল পাথর। সারা দেশের আপামর জনতা মেতে উঠেছিলেন নতুন দিনের আনন্দে। আমরা দেখেছিলাম নতুন দেশ গড়ার, নতুন রাজনীতি গড়ার স্বপ্ন; কিন্তু ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন ভাঙতে শুরু করেছে। আজ ছয় মাস পর সচেতন নাগরিকরা স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা করছেন। যে রাজনৈকি সংস্কৃতি হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারকে ফ্যাসিস্ট বানিয়েছিল সেই সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না; বরং একই সংস্কৃতি দ্রুত গ্রাস করে নিচ্ছে অভ্যুত্থানোত্তর রাজনীতিকে। যে রাজনীতি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ক্ষমতার অনলে পুড়িয়েছে; তাদের বানিয়েছে দাম্ভিক, চাঁদাবাজ, দখলদার, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, ফ্যাসিস্ট ও সবশেষে পলাতকÑ সেই রাজনীতি এখনো বদলায়নি হাসিনা-উত্তর বাংলাদেশে! স্বৈরাচার আমলে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী একটি রাজনৈতিক দলের বাহিনী হয়ে উঠেছিল। আজো কিন্তু তারা রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। থানায় থানায় ওসিদের রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের প্রভাববলয়ে থেকে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। তবে পার্থক্য হলো আগে মাত্র একটি দলের প্রভাবে থেকে দায়িত্ব পালন করত। বর্তমানে তারা কখনো কখনো একাধিক দলের নেতাকর্মীর আস্থায় থেকে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে! এসব অভিযোগের খবরাদি পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে। কখনো টিভি চ্যানেলের টকশোতেও এসব অভিযোগ শোনা যায়। দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড, বালুমহাল থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এসব এতদিন আওয়ামী দখলে ছিল। প্রকৃতিতে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হলে যেমন সে শূন্যতা পূরণ করতে নতুন বায়ু এসে ঝড়ের সৃষ্টি করে, ৫ আগস্টের পর সে রকম একটি ঝড় বয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক আকাশে। সেই যে দখলদারিত্বের পরিবর্তন হলো গত ছয় মাসে তা এখন পুরোপুরি কায়েম হয়ে পাকাপোক্ত হয়েছে। যারা এ রকম দখলদারিত্ব কায়েম করলÑ এরা কারা? এরা আমাদের দেশের নাগরিক। কেউ দলীয় নেতাকর্মী আর কেউ বা দলীয় নাম ব্যবহার করে এসব অপকর্ম করছেন। অনেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তথাপি চতুর দুর্বৃত্তরা অপকৌশলে অপকর্ম করে যাচ্ছে। আবার তৃণমূলে অনেকে দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে এসব অপকর্ম করছে। যেভাবে হোক দখলদারিত্ব চলমান রয়েছে। এদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চেষ্টা করেও দমাতে পারছে না! তৃণমূলে যে চাঁদাবাজি চলছে তার বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। মানুষের সাথে কথা বলুন। বিশেষ করে ফুটপাথের ফেরিওয়ালা বা ভ্যান দোকানদারদের সাথে এবং হাট-বাজারে কথা বললে জানা যাবে চাঁদাবাজির বাস্তবতা। এখানে অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী আমলের চাঁদাবাজরা রয়ে গেছে। তবে তারা রয়েছে নেপথ্যে আর নতুনরা আসছে প্রকাশ্যে। অর্থাৎ পুরনোরা একটি দফারফা বা ইজারা দেয়ার মাধ্যমে নতুনদের আশ্রয়ে আছে। ফলে দেশে বিপ্লব ঘটলেও দখলদারি এবং চাঁদাবাজির প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি! ফ্যাসিস্ট আমলে সিন্ডিকেট মোটামুটি প্রকাশ্যে ছিল। তখনকার হেভিওয়েট মন্ত্রীরাও তার কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেন। এ সময়েও উপদেষ্টারা একইভাবে সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন। হয় তারা ব্যর্থ হয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দায় সিন্ডিকেটের ওপর চাপাচ্ছেন; নয় তো সত্যি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। প্রশ্ন হলোÑ এ সিন্ডিকেট কারা সৃষ্টি করেছে? নাকি সিন্ডিকেট আগের মতো আছে, শুধু পরিচালকদের পরিবর্তন ঘটেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই দিতে হবে। এগুলোর অবসান ঘটাতে না পারলে তা হবে পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং অরাজনৈতিক সরকারের ব্যর্থতা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অনুদান প্রক্রিয়া, ভাতা প্রদান ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে হাতবদল হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরে-বন্দরে কম জানা গেলেও গ্রামগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে এখন নতুন নেতৃত্ব এসেছে, যারা সবাই মোটামুটি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। ‘ভিজিএফ’ কার্ড, ‘বিধবাভাতা’, ‘বয়স্কভাতা’ ইত্যাদিতেও নতুন স্থানীয় নেতাদের আধিপত্য কায়েম হয়েছে। এমনকি আগে যারা এসব ভাতা পেতেন তাদের অনেকে এখন পাচ্ছেন না। সে ক্ষেত্রে নতুন নেতাদের পছন্দ বা বাছাই করা লোকজন পাচ্ছেন। অর্থাৎ এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে থানা ঘেরাও, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাত থেকে আসামি ছিনতাই হরহামেশা হতো। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সতীর্থ সন্ত্রাসীদের এই কায়দায় রক্ষা করত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো এখনো সেই অশুভ চর্চা জারি রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জোর করা বা লুট করাও চলত সেই সময়। চলতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সেই চর্চায় এখনো অবসান হয়নি। অন্য দিকে মামলা বা গ্রেফতারবাণিজ্যের অসংখ্য সংবাদ নাগরিকদের মুখে মুখে। পতিত আওয়ামী সরকারের এবং দলের পালাতকদের ধরিয়ে দেয়া বা মামলা দেয়া এবং না দেয়ার মাধ্যমে বিশাল আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে বিস্তর জনশ্রুতি ঘুরে বেড়াচ্ছে নাগরিকদের মধ্যে। এগুলো কারা করছে? দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এসব খবর জানতে হবে। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিস্টদের বড় ভুল ছিল ‘ডিনায়াল থিউরি’ বা অস্বীকারের সংস্কৃতি! এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শুধু দল থেকে বহিষ্কার নয়; বরং আইনের কাছে সোপর্দ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতৃত্বের। এ দায়িত্ব অবহেলা করলে দল, দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চার একটি নিকৃষ্ট উপসর্গ। এ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে নির্মূল করে দিতে চেয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে শক্তি দিয়ে, ক্ষমতার দম্ভে রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে বিরোধী গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছিল; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। উল্টো গণ-অভ্যুত্থানে পালাতে হয়েছে। তবে পতিত স্বৈরাচারের চর্চা করা সে পচা রাজনৈতিক শক্তিমত্তার কৌশল এখনো অনেকে অনুসরণ করছেন। কুয়েটের সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত, সিলেট এমসি কলেজে ছাত্র নির্যাতনের খবর এসব হচ্ছে অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। ছাত্রলীগ পালিয়েছে, নিষিদ্ধ হয়েছে; কিন্তু এদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতি চলমান রয়েছে! হেলমেট লীগের হাতে যেমন অস্ত্র দেখা যেত আজও ছাত্ররাজনীতির নেতাকর্মীদের হাতে বা যুবকদের হাতে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার ছবি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দিয়ে পরস্পরকে ঘায়েলের চেষ্টা করছেন; কিন্তু আজও চলেছে সেই বস্তাপচা বুলি এবং একাত্তরের যুদ্ধের মালিকানা দখলের প্রচেষ্টা! যে কাজটি আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫টি বছর চর্চা করে সব অপকর্ম জায়েজ করেছে। এ জাতির দুর্ভাগ্য, বারবার সুযোগ পেয়েও আমরা জাতি গঠনে ব্যর্থ হচ্ছি। ১৯৫২ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা মায়ের ভাষা রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থাকার মন্ত্র শিখিয়ে ছিলেন। ওই ঐক্যের দীক্ষা নিয়ে আমরা একাত্তরে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। লাখো শ্রেষ্ঠ সন্তান জীবন দিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করতে; কিন্তু পূর্বসূরিদের দেয়া সেই রক্তের ঋণ আমরা শোধ করতে পরিনি। আমরা একটি সম্মানজনক জাতি গঠনে ব্যর্থ হয়েছিলাম। সে সময়কার নেতৃত্ব অর্জিত স্বাধীনতাকে নিজেদের মালিকানায় নিয়ে গিয়েছিল। যে আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছিলেন তার সাথে নেতারা বেঈমানি করে গণতন্ত্র বধের মাধ্যমে জাতিকে বরং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন! সেখান থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিকে আশার আলো দেখিয়েছিলেন। তাকে হত্যার মাধ্যমে জাতি গঠনপ্রক্রিয়ায় ছন্দপতন ঘটানো হয়েছিল। এরপর আবার সুযোগ হাতছানি দিয়েছিল ১৯৯০ সালে। স্বৈরাচারকে হটাতে অনেকে জীবন দিয়েছিলেন। গণতন্ত্র এসেছিল। দেশ ও জাতি গঠনের পুনরায় সুযোগ এসেছিল; কিন্তু এ যাত্রাও আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম। নব্বইয়ের গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের রক্তের সাথে আবারো আমাদের নেতৃত্ব বেঈমানি করেছিলেন। ফলে ‘এক-এগারো’তে জেনারেল মইন উদ্দিনের হাত ধরে পুনরায় জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছিল স্বাধীনতার একক মালিকানার দাবিদাররা। তারা শুধু দাবি করেনি। দেশটি ওয়ারিশ সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। নাগরিকদের পরিণত করেছিল নরকবাসীতে। এ নরক থেকে মুক্তির জন্য আবারো ১৫ শতাধিক শিশু-নারীসহ ছাত্র-জনতা জীবন দিলেন। ২০ সহস্রাধিক মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করলেন। জাতির কাছে আবারো সুযোগ এলো দেশ-জাতি গঠনের। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে সেই সুবর্ণ সুযোগ এসে হাতে ধরা দিলো; কিন্তু আমরা কি আবারো ব্যর্থ হবো? এবার ব্যর্থ হলে তার মাশুল গুনতে হবে আরো চড়া দামে! এবার পতিত স্বৈরাচার এবং তাদের দোসর হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভুল করবে না। সুতরাং এ যাত্রা জাতি গঠনে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আর নেই আমাদের। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করা।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক Email : maksud2648@yahoo.com
সরকার বদলেছে রাজনীতি বদলায়নি
এ নরক থেকে মুক্তির জন্য আবারো ১৫ শতাধিক শিশু-নারীসহ ছাত্র-জনতা জীবন দিলেন। ২০ সহস্রাধিক মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করলেন। জাতির কাছে আবারো সুযোগ এলো দেশ-জাতি গঠনের। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে সেই সুবর্ণ সুযোগ এসে হাতে ধরা দিলো; কিন্তু আমরা কি আবারো ব্যর্থ হবো? এবার ব্যর্থ হলে তার মাশুল গুনতে হবে আরো চড়া দামে! এবার পতিত স্বৈরাচার এবং তাদের দোসর হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভুল করবে না। সুতরাং এ যাত্রা জাতি গঠনে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আর নেই আমাদের। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করা