শ্রমের মর্যাদা রক্ষার জন্য বিশ্ব যখন ‘মে দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে, তখন মানুষের মনে প্রতিধ্বনিত হয় ইসলামের বাণী, যা চৌদ্দশ বছর আগেই শ্রমিকের সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল। ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের মজুরি প্রদান করো’ রাসূল সা:-এর নির্দেশ।
মে দিবসের সূচনা ও শিক্ষা
১৮৮৬ সালের ১ মে, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের রাস্তায় হাজার হাজার শ্রমিক ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা ব্যক্তিগত উন্নয়ন’ এই দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। হে মার্কেট চত্বরে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত হন; শুরু হয় শ্রমিক অধিকারের জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এই আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে এই দিনটি জাতীয় ছুটির দিন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মে দিবসকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়া হয়।
মে দিবসের শিক্ষা হলো শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানবিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ।
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা
ইসলাম শ্রমকে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম মনে করে না, বরং ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মনে করে। রাসূল সা: বলেন, ‘নিজের হাতের উপার্জিত খাদ্যই সর্বোত্তম খাদ্য।’ (সহিহ বুখারি ২০৭২) অন্য এক ঘটনায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ভালোবাসেন সেই মুমিনকে, যে তার হাতের উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে’ (মুস্তাদরাক হাকিম)।
ইসলামে শ্রমিকের প্রতি সদয় হওয়া ঈমানের পরিপূর্ণতার অংশ। রাসূল সা: একবার এক যুবকের হাত দেখে, যা ছিল কঠোর পরিশ্রমে মোটা হয়ে গিয়েছিল, তিনি তা হাতে নিয়ে বললেন, ‘এ হাত সেই হাত যা আল্লাহর কাছে সম্মানিত’ (মুসনাদে আহমদ)। এক সাহাবি রাসূল সা:-এর কাছে সাহায্য চাইলেন। তিনি তাকে কিছু বিক্রি করে একটি কুড়াল কিনে এনে দিলেন এবং বললেন, ‘জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কেটো এবং বিক্রি করো। এটা ভিক্ষার চেয়ে উত্তম’ (আবু দাউদ)।
ইসলামী শিক্ষায় শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। মুহাম্মদ সা:-এর বাণী, ‘তোমরা তোমাদের কর্মচারীদের (শ্রমিকদের) খাদ্য থেকে খাদ্য দাও এবং পরিধান থেকে পরিধান দাও এবং তাদের সাধ্যাতীত কোনো কাজ চাপিয়ে দিয়ো না’ (সহিহ বুখারি)। ইসলাম শ্রমিকের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে, তা মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামী নীতিমালার অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের হার মাত্র ৩ শতাংশ, যেখানে প্রচলিত করপোরেট পরিবেশে এটি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত। একই সাথে অর্থনীতিবিদ ড. উমর চ্যাপরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যদি ইসলামী শ্রমনীতি বিশ্বব্যাপী বাস্তবায়িত হয়, তাহলে শ্রমিকবৈষম্য প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।
মে দিবসের ইতিহাস রক্ত ও ত্যাগের ইতিহাস; ইসলামী শ্রমনীতি মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের আলোকে গড়ে উঠেছে। মে দিবস দাবি তোলে, ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার। ইসলাম বলে, কর্মে ভারসাম্য থাকা চাই। মে দিবস চায় ন্যায্য মজুরি। ইসলাম বলে ‘ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি প্রদান করো।’ মে দিবস চায়, শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশ। ইসলাম আদেশ দেয়, ‘নিজের ভাইয়ের জন্য চাইবে যা নিজের জন্য চাও।’ ইসলামের শ্রমনীতি জোর দেয় মালিক-শ্রমিক উভয়ের পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ এবং আল্লাহর ভয়ে ন্যায্যতার চর্চার ওপর। তাই মে দিবসের সংগ্রামী চেতনা এবং ইসলামের মানবিক শ্রমনীতি পরস্পরের পরিপূরক, সঙ্ঘাতমুক্ত।
পশ্চিমা বিশ্বে মে দিবস ও ইসলামের নীতি
কালের পরিক্রমায় মে দিবস আধুনিক ও বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। তবে আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, পশ্চিমা বিশ্বে মে দিবসের কার্যকারিতা অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে; মে দিবস মূলত একটি ছুটির দিন। পশ্চিমা বিশ্বে শ্রম আন্দোলনের ফলে ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ইত্যাদি কিছু মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেকওক্ষেত্রে এখনো শ্রমিকবৈষম্য প্রকটভাবে বিদ্যমান।
সামাজিক কল্যাণের জন্য পক্ষভুক্ত হওয়া ৩৮টি দেশের সংস্থা ঙঊঈউ ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশে একজন সাধারণ শ্রমিকের গড় আয় একজন উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীর তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ কম। একই সাথে ইউরোপীয় লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩) অনুসারে ইউরোপের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১৬ শতাংশ এখনো অস্থায়ী শ্রমিক, যারা ন্যায্য সুবিধা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পর্যন্ত পান না, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এক কথায়, পশ্চিমা বিশ্বে মে দিবসের চেতনা একদিকে স্মৃতিমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সংগ্রাম এখনো চলমান। করপোরেট প্রভাব এবং উৎপাদনক্ষমতার প্রতি অতিমাত্রিক গুরুত্বের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকের মানবিক অধিকার গৌণ হয়ে পড়ছে।
ইসলামে শ্রমিকের অধিকার কোনো প্রতীকী রীতি নয়; এটি ন্যায়বিচার ও মানবিকতার মূল স্তম্ভ। ইসলামী আদর্শে শ্রমিকের কাজের পরিবেশ, সম্মানজনক মজুরি ও মানবিক আচরণ বাধ্যতামূলক। শ্রমিকের প্রতি অবিচারকে কেবল আইনগত অপরাধ নয়, বরং ধর্মীয় গুনাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব ইসলামী সমাজে শুধু রাষ্ট্রের নয়, বরং প্রত্যেক ব্যক্তির ঈমানের অংশ। তাই শ্রমিক সমাজের প্রকৃত মুক্তি এবং ন্যায্যতার জন্য ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবস
বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিকের অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে। সংবিধানের ২০(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘শ্রমই জাতির জীবনের মূল ভিত্তি’ এবং ৩৪ অনুচ্ছেদে জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সংগঠনের অধিকার ও শ্রমিক কল্যাণের নানামুখী দিক আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অধিকার প্রায়ই ক্ষুণ্ণ হয়। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তির পরিমাণ সাত কোটি ৩০ লাখেরও বেশি। তৈরী পোশাক শিল্প, কৃষি খাত, নির্মাণ খাত- সর্বত্র শ্রমিকরা অপরিসীম অবদান রাখছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমিকদের গড় মাসিক মজুরি ১৪ হাজার টাকার আশপাশে। গার্মেন্টস, ইটভাটা, নির্মাণ কাজসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরির জন্য সংগ্রাম করছে। গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করা প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিকের অধিকাংশই নারী, যাদের কর্মপরিবেশ ও মজুরি কাঙ্ক্ষিত নয়। আইএলও এর তথ্য মতে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রায় ৭২ শতাংশ এখনো নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। প্রতি বছর অসংখ্য শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার মতো ঘটনা শ্রমিক নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশের চরম দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এ পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে শ্রম আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। ন্যূনতম ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার সাথে খাপ খাইয়ে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির সাথে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক কল্যাণে জাকাত, ওয়াক্ফ ও ইসলামী সামাজিক অর্থনীতির প্রসার করতে হবে।
শ্রমিকের প্রতি কোনো ধরনের অবিচার ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম শ্রমিকের জন্য ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শ্রমিক-মালিকের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম ও সংহতির শিক্ষা দেয়, যেখানে সংগঠন ও আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। ইসলামী শ্রমনীতি শ্রমিকের সম্মান এবং অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় নীতিগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই, যেখানে মালিকের প্রতি শ্রমিকের এবং শ্রমিকের প্রতি মালিকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা হয়েছে মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গিতে। অতএব, বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের উন্নয়নে কেবল আইন প্রণয়ন নয়, তার যথাযথ প্রয়োগ, মে দিবসের শিক্ষার যথার্থ বাস্তবায়ন এবং ইসলামী শ্রমনীতির মানবিক দর্শন গ্রহণ করা জরুরি। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু শ্রমিক শ্রেণীই নয়, বরং সমগ্র জাতি তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যাবে।
এখন সময় এসেছে ইসলামী শ্রমনীতিভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার। শ্রমিকের সম্মান, ন্যায্য অধিকার এবং নৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সুন্দর, মানবিক সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে। ইসলাম ঘোষিত শ্রমনীতি মানবজাতির মুক্তির দিশা দিতে পারে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কেবল মে দিবসের চেতনার বিষয় নয় বরং এটি ইসলামেরও মৌলিক শিক্ষা। সুতরাং প্রয়োজন হলো, ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করে শ্রমিকের সম্মান ফিরিয়ে আনা।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট