আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে, বিরোধী রাজনীতিবিদ ও সমালোচকদের বিদেশ ভ্রমণের অধিকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে সীমিত করে। সরকার একাজে নানা পরিসরে প্রশাসনিক কৌশল ব্যবহার করে। অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই বিমানবন্দরে ব্যক্তিদের আটকানোর নির্দেশ দেয়া হয়, আর পাসপোর্ট অফিসগুলোকে নতুন পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান বা নবায়ন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। যদিও হাইকোর্ট বিভাগ ও বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রায়ই সরকারের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে রায় দেয়, তবে একপর্যায়ে বিচারিক ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন হতে শুরু করে।
২০২১ সাল নাগাদ আওয়ামী লীগের প্রভাবে উচ্চ বিচার বিভাগ ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এটি একটি যুগান্তকারী রায়ে পরিণত হয়, যখন আপিল বিভাগ, প্রথমবারের মতো, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের অধীনে নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই রায় কার্যকরভাবে সরকারকে নতুন আইনি কভার মঞ্জুর করে, যাতে টার্গেট করা ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে যেতে না পারেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম জি বি রহমানের মামলায়, আপিল বিভাগ বলে যে আইনের প্রক্রিয়া এড়াতে ‘দ্রুত’ দেশত্যাগের চেষ্টা করলে যেকোনো ব্যক্তির বহির্গমন বন্ধ করা যেতে পারে। তবে এই বিধিনিষেধের সমর্থনে আদালত থেকে তিন দিনের মধ্যে একটি আদেশ পেতে হবে। এটি সরকারকে নাগরিকদের দেশত্যাগ বন্ধ করার সুযোগ এনে দেয় এবং তার পর আদালতের আদেশের মাধ্যমে সরকার তার কাজের ন্যায্যতা দিতে পারে। আপিল বিভাগ তার রায় প্রদানে স্বাধীনতা-পূর্ব যুগ থেকে এ ক্ষেত্রে আইনের ধীর ও স্থিতিশীলভাবে চলমান বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়।
চলাফেরার স্বাধীনতার বিষয়টিকে বিচার বিভাগীয় তদন্তের অধীনে নিয়ে আসার প্রথম বড় মামলাটি ছিল পাকিস্তান আমলের। এটি ছিল আবুল আ’লা মওদূদী বনাম স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের মামলা। ১৯৬৭ সালে জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তানের নেতা আবুল আ’লা মওদূদী হজ করতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকার তাকে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে দিতে রাজি ছিল না। সেই সময়ে জরুরি ঘোষণার অধীনে মৌলিক অধিকার নং ৫ (চলাচলের স্বাধীনতা) স্থগিত করা হয়। এ কারণে লাহোরের হাইকোর্টকে মৌলিক অধিকার নং ৫ (চলাচলের স্বাধীনতা) থেকে মুক্তভাবে মামলার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতে বিষয়টি মওদূদীর জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের ওপর নির্ভর করে প্রতিকার পাওয়ার বিবেচ্যে পরিণত হয়। এ মামলায় বলা হয়, বিদেশে যাওয়ার স্বাধীনতা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও মওদূদীকে পাকিস্তান ত্যাগ করতে বাধা দেয়ার জন্য সরকার কোনো আইনের উল্লেখ করেনি। তাই মওদূদী পাকিস্তান ত্যাগ করার ক্ষেত্রে মুক্ত ও স্বাধীন ছিলেন।
১৯৬৭ সালের পাকিস্তান সরকারের মতোই, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হজ করার জন্য বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধা দেয়। সরকারের যুক্তি ছিল যে আল্লামা সাঈদী মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন এবং তাকে দেশত্যাগে বিরত রাখতে হবে। আল্লামা সাঈদীকে বিদেশে যেতে দেয়া হলে তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাবেন বলে যুক্তি দেয়া হয়।
সরকারের এ পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেন আল্লামা সাঈদী। হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে যে, সরকারের ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আল্লামা সাঈদীকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধা দেয়ার পদক্ষেপটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা তার চলাফেরার স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। হাইকোর্ট বিভাগ এভাবে তাকে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার এবং বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশের অনুমতি দেয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। হাইকোর্ট বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, সরকার যদি কাউকে দেশ ত্যাগে বাধা দিতে চায় তবে তার বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা শুরু করতে পারে এবং তাকে দেশত্যাগে বাধা দেয়ার জন্য আদালত থেকে আইনি আদেশ পেতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগের রায় আপিল বিভাগে বহাল রাখা হয় এবং সরকার তার নাগরিকদের দেশত্যাগে বাধা দিলে অনেক ক্ষেত্রে ওই রায়ের ওপর নির্ভর করা হয়েছে।
তবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম জি বি রহমানের মামলায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এখানে নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজনকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধা দেয়া হয়। এসব ব্যক্তির বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধা দেয়ার কোনো বিচারিক আদেশ ছিল না। তবে আপিল বিভাগ বলেছিল, যারা আইনের প্রক্রিয়া এড়াতে ‘দ্রুত’ দেশত্যাগ করেন তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তবে এই বিধিনিষেধটি তিন কার্যদিবসের মধ্যে একটি আদালত কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোনো আইনে এই নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান ছিল না। এটি আপিল বিভাগের সৃষ্ট নিষেধাজ্ঞা। এই রায় অনুসারে নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে যেকোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ত্যাগে বিরত রাখা যেতে পারে। সরকারকে যা দেখাতে হবে তা হলো, ওই ব্যক্তি ‘দ্রুত’ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একবার দেশত্যাগে বিরত রাখা গেলে, সরকার পরবর্তী তিন কার্যদিবসের মধ্যে আদালতের আদেশ প্রাপ্তির মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞার ন্যায্যতা খুঁজে পেতে পারে।
জি বি রহমানের মামলার রায়ে বাংলাদেশের আপিল বিভাগের আগের রায় বাংলাদেশ বনাম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কোনো উল্লেখ নেই। আপিল বিভাগ কোনো বিদেশী আদালতের এমন কোনো রায়েরও উল্লেখ করেনি যেখানে বিদেশ ভ্রমণের স্বাধীনতার ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
আপিল বিভাগ কর্তৃক আরোপিত বিধিনিষেধ জনস্বার্থে সমর্থিত হতে পারে। বিপুলসংখ্যক দুর্নীতিবাজ নাগরিক তাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছে। তবে রায় আইনগতভাবে সমর্থন করা যাবে না। প্রথমত, যারা ‘দ্রুত দেশত্যাগ করেন’ তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা বলতে আপিল বিভাগ কী বুঝিয়েছে? ‘দ্রুত’ শব্দটি ব্যবহার করার সময় আপিল বিভাগ কোনো সময়সীমার কথা মাথায় রেখেছিল কী?
আইনি প্রেক্ষাপটে ‘দ্রুত’ বলতে আসলে কী বোঝায়? এটি কি একজন ব্যক্তির বিমানবন্দরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার গতি বা তাদের প্রস্থানের জরুরত নিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে? কিভাবে সরকার নির্ধারণ করতে পারে যে একটি ‘দ্রুত’ প্রস্থান কখন কিভাবে হবে? একটি স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাব এ ক্ষেত্রে বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি করে, যা কর্মকর্তা ভেদে ভিন্ন হতে পারে। এ ছাড়াও ‘দ্রুত’ মানে কি ভ্রমণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকিট কেনা? নাকি এর অর্থ এই যে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হওয়া এড়াতে সে ব্যক্তিকে নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ছুটে যেতে হবে?
বিশেষ করে চলাচলের মতো মৌলিক স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করার মতো আইনি বিধিনিষেধের অপব্যবহারের কোনো জায়গা না রেখে বিষয়গুলো পরিষ্কার থাকা উচিত। আপিল বিভাগের এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা না থাকলে তা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে সহজেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি আইনকে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে নিপীড়নের হাতিয়ার করে তুলতে পারে। সরকার অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যায্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করতে পারে।
আর এটিও স্পষ্ট যে আদালত থেকে তিন দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করে একটি আদেশ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তা হলো নির্দেশনামূলক এবং এটি বাধ্যতামূলক নয় । আপিল বিভাগ বলেনি যদি এ ধরনের আদেশ তিন দিনের মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে কী হবে। সুতরাং আদালতের কাছ থেকে আদেশ পেতে বিলম্ব হলেও তার বাংলাদেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকতে পারে। তাই তিন দিন সহজেই তিন মাসেও পরিণত হতে পারে।
উপসংহারে বলতে হয়, আপিল বিভাগের রায়ে নাগরিকদের স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ ত্যাগের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই রায় একজন নাগরিককে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধা দেয়ার জন্য নির্বাহী পদক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে। বিধিনিষেধের সমর্থনে কর্তৃপক্ষকে তিন দিনের মধ্যে আদালতের আদেশ পাওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রদত্ত আপাত সুরক্ষা থেকে কোনো সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই; কারণ সময়সীমাটি নির্দেশনামূলক। এ রায় অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালতের বা আইনের কোনো আদেশ ছাড়াই নাগরিকদের দেশত্যাগে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে সুযোগ করে দেয়। আর দুর্ভাগ্যবশত এটিও প্রতীয়মান হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারও এই রায়ের সুযোগ নিচ্ছে।
আশা করা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনার পরে পুনর্গঠিত আপিল বিভাগ জি বি রহমান মামলার যথার্থতা আবার পরীক্ষা করার সুযোগ পাবেন।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌসুলি