ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইয়িং (আরএডব্লিউ) বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি চার সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। বাংলাদেশ সফরের আগে চীনও ঘুরে এসেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। ফলে এই সফরকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে না দেখে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে শুরুতে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। কোনো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানের সফর ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ও গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় এই ধরনের সফরের বৈধ আলোচ্য হতে পারে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা কেবল সৌজন্য বিনিময় করতে বিদেশ সফর করেন না। তাদের প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পেছনে নিজ দেশের কৌশলগত স্বার্থ থাকে। সুতরাং প্রশ্ন হলো- পরাগ জৈনের সফরে ভারতের সেই স্বার্থগুলো কী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় কী?

বাংলাদেশে আসার আগে তার চীন সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত ও চীন দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ ও সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আকসাই চিন ও অরুনাচল প্রদেশসহ ৩,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিরোধপূর্ণ সীমান্ত দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান সমস্যা। তবে ভারত এসব ভূখণ্ডে বড় ধরনের ছাড় দিতে যাচ্ছে- এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। অতএব, ভারত চীনের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করছে- এটি তথ্যের চেয়ে অনুমান বেশি। তবে বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভারতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রয়োজন দিল্লিকে বেইজিংয়ের সাথে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার দিকে নিতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো- ভারত, চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতায় ঢাকা যেন কারও দাবার ঘুঁটিতে পরিণত না হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে চাইবে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন, বাংলাদেশে পরিবর্তিত জনমত এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন- সবকিছু নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরাগ জৈনের সফরের একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য বাংলাদেশের নতুন ক্ষমতার কাঠামো, নিরাপত্তা পরিবেশ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝা- এমন অনুমান অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এর বাইরে কোনো গোপন পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন। বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর একটি হলো, গত দেড় দশকে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের পরিবর্তে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে অতিরিক্তভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিল। ফলে বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভারতের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। নতুন বাস্তবতায় ভারতের নিজের স্বার্থে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

একইভাবে বাংলাদেশেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা কোনো দেশের রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রভাব তৈরির চেষ্টা করতে পারে- এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে ‘র-এর এজেন্ট’ বলা বিপজ্জনক। এতে প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি শনাক্তের কাজ দুর্বল হয়ে যায়। প্রয়োজন কাউন্টার ইনটেলিজেন্স ভেটিং, ফিন্যান্সিয়াল ট্রায়াল অ্যানালাইসিস, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স রিভিইউ এবং আইনানুগ তদন্ত। র, সিআইএ, আইএসআই কিংবা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার প্রথম দায়িত্ব নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা। অতএব, বাংলাদেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিদেশী রাষ্ট্রের সদিচ্ছা নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব গোয়েন্দা ও কাউন্টার ইনটেলিজেন্স সক্ষমতা।

বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক দুর্বলতা সম্ভবত রাজনীতির চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তায়। বাংলাদেশের ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিবদ্ধ সক্ষমতা ২,৬৫৬ মেগাওয়াট। এর বাইরে নেপালের ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসে। শুধু আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্থাপিত ক্ষমতা ১,৬০০ মেগাওয়াট, যার প্রায় পুরোটা বাংলাদেশের জন্য নির্মিত। ২০২৫ সালে আদানি বাংলাদেশে ৮ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে- দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কোনো কোনো সময়ে এই হার আরো উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই নির্ভরতা অবশ্যই কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করে।

বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১,৩২০ মেগাওয়াট। তবে এটিকে সম্পূর্ণ ‘ভারত নিয়ন্ত্রিত’ বলা সঠিক নয়। প্রকল্পটির পরিচালনাকারী বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের বিপিডিবি ও ভারতের এনটিপিসির ফিপটি:ফিপটি যৌথ উদ্যোগ। কিন্তু মালিকানার হিসাব দিয়ে কৌশলগত নির্ভরতা বিচার করা যায় না। প্রযুক্তি, জ্বালানি, ঋণ, ব্যবস্থাপনা, স্পেয়ার পার্টস এবং মেইনটেন্যান্সের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার প্রযুক্তি ও সহায়তায় নির্মিত বলে সেটিকে ‘শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন’ বলা যৌক্তিক নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ক্রিটিক্যাল স্পেয়ার পার্টসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিদেশী নির্ভরতা তৈরি করছে? সাম্প্রতিক গ্যাস সঙ্কটও এই দুর্বলতা দেখিয়েছে। মহেশখালীর একটি এলএসজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ হলে প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩,৮০০-৪,০০০ এমএমসিএফটি, অথচ সরবরাহ ২,৬০০ এমএমসিএফটির কাছাকাছি। ফলে একটি অবকাঠামোর সমস্যা বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।

‘বিদ্যুৎ নেই- সরকার নেই’ কথাটি রাজনৈতিক স্লোগান হলেও এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা আছে। আধুনিক রাষ্ট্রে বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং, বন্দর ও খাদ্য সরবরাহ হলো ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিপর্যয় শিল্প, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, যোগাযোগ, আইনশৃঙ্খলা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতবিরোধিতা নয়, ভারত-নির্ভরতা কমানো। ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী থাকবে। ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা যাবে না; কিন্তু নির্ভরতার মাত্রা পরিবর্তন করা যায়। তাই ডোমেস্টিক গ্যাস এক্সপ্লোরেশন, এলএনজি সাপ্লাই ডাইভারসিফিকেশন, রিনিউভাল এনার্জি, এনার্জি স্টোরেশ, নেপাল-ভুটান হাইড্রোপাওয়ার, নিউক্লিয়ার এনার্জি গেজ রিজিওনাল গ্রিড কানেক্টিভিটি- সবকিছুর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। জাতীয় গ্রিড এমন হতে হবে; যাতে কোনো একটি বিদেশী সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশ অচল না হয়।

একই নীতি রাজনীতিতেও প্রযোজ্য। কোনো সরকার যদি ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো শক্তির গুডউইলের ওপর নির্ভরশীল হয়, সেটি জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বলতা। সরকারের শক্তির উৎস হতে হবে জনগণ, সংবিধান ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিও আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত। তিনি দেশে ফিরলে বিচার, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, তার পরিকল্পনা রাষ্ট্রের আগে থেকে থাকা দরকার।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে বিদেশী শক্তির সক্ষমতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাদের সর্বশক্তিমান হিসেবে কল্পনা করা। ‘র’ শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা, কিন্তু সর্বশক্তিমান নয়। ভারত শক্তিশালী প্রতিবেশী, কিন্তু বাংলাদেশও ১৭ কোটির বেশি মানুষের রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত। বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত- ফ্রেন্ডশিপ উইথ অল, ডিপেন্ডেন্স অন নান। ভারতের সাথে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নির্ভরশীলতা নয়। চীনের সাথে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু চীনের বলয়ে পুরোপুরি ঢুকে পরা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সাথে অংশীদারত্ব থাকবে, কিন্তু তাদের ভূরাজনৈতিক প্রোক্সি হওয়া নয়। এসব দিকে বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, পরাগ জৈনের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ‘র কি ষড়যন্ত্র করছে’- এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র এত শক্তিশালী কি না যে র, সিআইএ, আইএসআই বা অন্য কোনো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা চাইলেও দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও শিক্ষা একই : আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বের গুণ, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তায় আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। আবার চারপাশের সবাইকে ‘মীর্জাফর’ ভাবাও ঠিক না; এতে প্রকৃত হুমকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয় বাস্তবতা প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রনীতি আবেগ দিয়ে চলে না। বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত- কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস নয়, কাউকে অকারণে শত্রুও নয়; সবকিছুর ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের স্বার্থ।

hrmrokan@hotmail.com