বিদ্যুৎ আধুনিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ- জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয় রোধ ও সাশ্রয় নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সীমিত সম্পদ দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে হলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।
দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং দীর্ঘদিনের সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি ছিল। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। এ বাস্তবতায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগটি সময়োপযোগী বলেই মনে হয়।
বর্তমান সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার বিষয়টি সামনে রেখে বিদ্যুৎ ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগও সেই বৃহত্তর দায়িত্বশীলতার অংশ। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল খোলার সময়সীমা কমানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে জারি করা এক স্মারকে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। অর্থাৎ আগের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠান এক ঘণ্টা আগে বন্ধ করতে হবে। এর আগে গত ১১ জুনের নির্দেশনায় রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান ও মার্কেট খোলা রাখার সুযোগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে রাত ৮টার পর এসব প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে না।
এর পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট, মার্কেট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের আলোকসজ্জা না করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। নিছক আনুষ্ঠানিক সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় করার যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সঙ্কটের সময়ে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা নিঃসন্দেহে সাশ্রয়ের কার্যকর উপায় হতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় শুধু সরকারি নির্দেশ জারি করলেই সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। দোকানপাট নির্ধারিত সময়ে বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় বাতি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখা, অফিস-বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের অপচয় কমানো-এসব অভ্যাসকে সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরিÑবিদ্যুৎ সাশ্রয় মানে কেবল কিছু সময় দোকান বন্ধ রাখা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, উৎপাদন ব্যয়, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ। এক ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানে শুধু একটি বাতি কম জ্বালানো নয়; এর মাধ্যমে উৎপাদন ও জ্বালানির ওপর চাপও কিছুটা কমানো যায়।
সরকারের এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নির্দেশনা জারি করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; এর যথাযথ প্রয়োগ, নজরদারি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সাথে ব্যবসায়ীদের অসুবিধা ও ভোক্তাদের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নামে যেন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত না হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু এখন নির্বাচিত সরকারের সামনে জনগণের দেয়া দায়িত্ব আরো স্পষ্ট। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার ও জনগণ যদি একসাথে কাজ করে, তাহলে এর সুফল কেবল বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় তাই কোনো সাময়িক কর্মসূচি নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব। আজ আমরা যে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করব, সেটিই আগামীকাল কোনো শিল্পকারখানা, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগতে পারে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় একটি সফল জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক