ড. মাহ্বুব উল্লাহ্
আজ বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এমন একটি দিনে হিসাব-নিকাশ করতে হয় অতীতের দিনগুলোতে দলটির পাল্লা কোন দিকে ভারী। সেটা প্রধানত সাফল্যের নাকি প্রধানত ব্যর্থতার। একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য ও ব্যর্থতা হিসাব কষতে গিয়ে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত তা হলো- দলটির আদর্শ জনগণের মনোজগতে ছায়া ফেলেছে কি না। দলটি অভীষ্ট অর্জনে কতটুকু সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো সঙ্কট ও সমস্যাসঙ্কুল সমাজে দলটি সমাজের সাথে নিজেকে কতটুকু খাপ খাওয়াতে পেরেছে এবং দলটি কী তার আদর্শের পথে অবিচল থাকতে পেরেছে?
১৯৭৭-এ প্রতিষ্ঠার পর চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে দলটি যেমন ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করেছে; একইভাবে ক্ষমতার বাইরে থাকার ঝুঁকিপূর্ণ সময় অতিক্রম করেছে। ১৯৭৭-এ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দলটির জন্য আদর্শ নির্ধারণ করেছিলেন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। নবীন-স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল এ নবীন জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করা। একটি জাতি যদি না জানে তারা কে এবং কোথা থেকে এসেছে; তাহলে সে জাতি একদিকে যেমন ভুল পথে হাঁটবে অন্যদিকে তার রাষ্ট্রীয় সত্তা বিলীন হওয়ার বিপদও সৃষ্টি হতে পারে।
জিয়াউর রহমান সঠিকভাবে আমাদের জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করেছিলেন। এ জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে ভাষা, ধর্ম, ভূগোল, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা উপাদানের সংশ্লেষ ঘটেছে। এমন সঠিকভাবে জাতীয় পরিচয় নির্মাণে দলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সংহতি নিশ্চিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার জনগণ একইভাবে বাংলা ভাষাভাষী হওয়া সত্তে¡ও এক রাষ্ট্রের নাগরিক নয় কেন? আমরা বাংলাদেশীরা প্রথমত বাংলাদেশী এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশী। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠী প্রথমত ভারতীয় এবং শুধু আঞ্চলিক পরিচয়ে বাঙালি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের এমন পৃথক সত্তা তৈরির পেছনে রয়েছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে মুক্তি।
সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের তুলনায় ১০০ বছর এগিয়ে থাকলেও তারা বাংলাদেশীদের মতো বাংলা ভাষার প্রতি ভাবাবেগ ও মমত্ব প্রকাশ করেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ বুদ্ধিটাই প্রবল হয়েছে। তারা বৃহত্তর ভারতীয় বাজারে চাকরি পেতে বাংলা ভাষার প্রতি আবেগ ও ভালোবাসা দেখাতে চায়নি। অথচ বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলা ভাষা তথা মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইতে প্রাণ দিয়েছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য এক অভূতপূর্ব বিজয়মাল্য। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ অংশ মুসলমান। তাদের ধর্ম এবং সংস্কৃতি বাংলাদেশকে পৃথক সত্তায় ভূষিত করেছে। আরো মনে রাখার বিষয় হলো- ১৯৪৭-এ ‘যে ভূখণ্ড লইয়া পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হইয়াছে তাহাই হইবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড’। সংবিধানে নির্দেশিত ভূখণ্ডগত এ সংজ্ঞা বাংলাদেশের পরিচয় অমোঘ করে দিয়েছে। তাই বলতে হয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথাটা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে শহীদ জিয়া বাংলাদেশ এবং তার তৈরি করা দল বিএনপির জন্য রেখে গেছেন এক কালজয়ী আদর্শ। এ আদর্শ বিএনপিকে ভিন্ন এক মর্যাদায় ভূষিত করেছে। প্রতিষ্ঠার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশী-বিদেশী চক্রান্তে শাহাদত বরণ করেন। তিনি দলটিকে একটি টেকসই অবস্থায় দাঁড় করানোর আগে দৃশ্যপট থেকে অপসারিত হন। এ কারণে দলটি তার মূল নেতার পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হয়। কিছুটা বিপথগামীও হয়। তার মৃত্যুর পর সুবিধাবাদী অনেক নেতা এরশাদের টোপ গিলে দল ছেড়ে চলে যান। জিয়াউর রহমান দলটিকে আদর্শিক বন্ধনে বেঁধে দিতে দলের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু করেছিলেন। দলের নেতাদের রাজনৈতিক সচেতনতা পরীক্ষায় দেশের ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে তিনি পরীক্ষা চালু করেছিলেন। দেখা গেছে, কোনো কোনো নেতা খুব নাম করা হওয়া সত্তে¡ও পরীক্ষায় সুবিধা করতে পারেননি। জিয়াউর রহমানের এ প্রয়াস যদি পরবর্তীকালে অব্যাহত থাকত তাহলে দলটি আরো সুসংহত হয়ে উঠতে পারত এবং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো সক্ষম হয়ে উঠত। ইদানীং দলটির মধ্যে কিছু বিষয়ে যে বেসুরো অবস্থা লক্ষ করা যায়, তার পেছনে রয়েছে জিয়াউর রহমানের চালু করা উদ্ভাবনমূলক কর্মকাণ্ডগুলো বজায় রাখতে না পারা। দলটিতে নানা রাজনৈতিক স্রোতের জাতীয়তাবাদীরা জড়ো হয়েছিলেন। বিভিন্ন ধারা থেকে আসায় দলটি সাংগঠনিকভাবে খুব মজবুত হয়ে উঠতে পারেনি। জিয়াউর রহমান যে কাজটি যেভাবে শুরু করেছিলেন তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে দলটি আরো বলিষ্ঠ ও সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারত।
জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর দলটিতে দুই ধরনের মতবাদ পরিলক্ষিত হয় এবং তা দলটিকে প্রায় ভাঙনের পর্যায়ে উপনীত করেছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলের প্রথম দিকে বেগম খালেদা জিয়া দলটির নেতৃত্বের হাল ধরেন। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন গৃহবধূ। এমন একজন মানুষ এতবড় একটি দলের নেতৃত্ব দেবেন এবং দলটির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবেন তা ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা এবং আপসহীনতা তার নেতৃত্বকে অতুলীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অচল অনড়। তার এ দৃঢ়চিত্ততায় দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক এরশাদ নব্বইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন। ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিজয় মাল্যে ভূষিত হয়। এ বিজয়ের মূলে রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার সেই উক্তি যাতে তিনি বলেছিলেন, ‘ওদের হাতে পরাধীনতার শৃঙ্খল, আমাদের হাতে স্বাধীনতার ঝাণ্ডা’। বিএনপি সেদিন পরাধীনতার শৃঙ্খলের সাথে স্বাধীনতার ঝাণ্ডার পার্থক্য নির্ণয় করতে পেরেছিল বলে এবং স্বাধীনতার ঝাণ্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল বলে নির্বাচনে বিজয় অর্জনে সফল হয়েছিল। বিএনপি সার্থকভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে যে, কারা আমাদের মিত্র এবং কারা আমাদের শত্রু। তার ফলে শত্রুকে পরাজিত করা দুঃসাধ্য হয়নি। বিএনপির জন্য আজও এ কথা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বন্ধুহীন হয়ে পড়লে বিএনপি বিপর্যয়ের মধ্যে পরে। অন্যদিকে সঠিকভাবে বন্ধু নির্বাচন করতে পারলে সংগ্রামে বিজয়ী হয়। ১৯৯১-৯৬ পর্বে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সাফল্যের মধ্যে ছিল খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি প্রবর্তন এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ। খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি চালু করায় গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে স্কুলে যেতে শুরু করে। ভ্যাট পদ্ধতি চালু করায় সরকারের রাজস্ব সঙ্কট অনেকাংশে সমাধান হয়ে যায়। উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থের জোগান বাড়ানো সম্ভব হয়। বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করায় আমলাতান্ত্রিকতার বেড়াজালে পরে যে অর্থনীতি নিষ্প্রাণ নিথর হয়ে পড়েছিল সেই অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠে। সেই সাথে বর্ধিত প্রবৃদ্ধির পথে পরিচালিত হয়। এরশাদের আমলে উন্নয়ন কর্মসূচির ৯০ শতাংশ অর্থায়িত হতো বৈদেশিক সাহায্যে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে দেশীয় উন্নয়ন কর্মসূচিতে দেশীয় অর্থায়ন ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতি স্বনির্ভরতার পথে অগ্রসর হয়। একই সাথে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার অর্জন সম্ভব হয়। স্মরণযোগ্য, ভ্যাট প্রবর্তনের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের সূচনা হয়। অথচ এই আওয়ামী লীগ নিজেদের শাসনামলে ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
১৯৯৪ থেকে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে আওয়ামী লীগ তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আন্দোলনের সূচনা করে। এ আন্দোলনে ১৭৩ দিন হরতাল পালিত হয়। দেশের অর্থনীতিকে বিদেশী সংস্থাগুলো যখন উদীয়মান ব্যাঘ্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল; তখন এ আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতা অর্থনীতির চাকাকে স্থবির করে ফেলে। শুরুতে বেগম খালেদা জিয়া তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রশ্নে নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করলেও এক পর্যায়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে গঠিত সংসদের মাধ্যমে তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিল পাস করে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেন। এ সংসদ ছিল ক্ষণস্থায়ী। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি যেদিন ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করেন সেদিন অপরাহ্নে জনতার দরবারে হাজির হয়েছিলেন নয়াপল্টনের অফিসের সামনে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায়। তার ঘোষণায় একই স্থানে পরদিন আগের দিনের তুলনায় আরো অনেক বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সব জনসভায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টির জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-কে দায়ী করা হয়।
১৯৯৬-তে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিএনপির তুলনায় বেশি আসন পায়। কিন্তু তাও সরকার গঠনে যথেষ্ট ছিল না। এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে এরশাদের জাতীয় পার্টি এগিয়ে আসে। বিএনপি ১১৬টি আসনে বিজয়ী হয়ে স্মরণকালের বৃহত্তম বিরোধী দলে পরিণত হয়। ১৯৯৬-২০০১ পর্বে আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। অবশ্য শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেও ভয়াবহ জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্য, জোট হয়ে নির্বাচন করায় সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় লাভ করে। এ পর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে। দুর্ভাগ্যের বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু আনাড়ীপনায় আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ভয়াবহ কিছু ঘটনার অবতারণা ঘটায়। দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হয়। আমেরিকার টুইন টাওয়ারের ঘটনা পুঁজি করে যেভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের সূচনা করা হয় তার ছায়াভষ্ম বিএনপির উপরও বর্ষিত হয়। সব মিলিয়ে বিএনপি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। আসল এক-এগারের সংবিধানবহিভর্ূত ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিনের তথাকথিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার। ওই সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্রসন্তানসহ গোটা বিএনপির ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। সাংগঠনিকভাবে বিএনপি প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিনের সরকার নিরাপদ প্রস্থানের কৌশল হিসেবে শেখ হাসিনার সাথে আঁতাত করে ২০০৮-এ যে নির্বাচন দেয়। তাতে হেকমত করে বিএনপিকে বিপুলভাবে পরাজিত দেখানো হয়। সেই সাথে আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে শুরু হয় আওয়ামী দুঃশাসনের সাড়ে ১৫ বছর। তিন-তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেননি। প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামীবন্ধু ভারতের ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার নির্লজ্জ প্রয়াস। একটি নির্বাচনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে নগ্ন হস্তক্ষেপের অবতারণা ঘটান। এটাই হলো গণতান্ত্রিক ভারতের আধিপত্যবাদী চেহারা। এই সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির ওপর অমানসিক নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। হাজার হাজার মিথ্যা মামলা, জেল-জুলুম বিচারবহিভর্ূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরের নিকৃষ্টতম নির্যাতনে বিএনপিকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করা হয়। আনন্দের বিষয় হলো, ভয়াবহ প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি প্রতিরোধের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে রাখে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দল হিসেবে ঐক্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। প্রবাসে থেকে তিনি এক ভিন্নধর্মী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ সময় তার মা বয়োবৃদ্ধ বেগম খালেদা জিয়া ঢাকার পুরনো সেন্ট্রাল জেলের পরিত্যক্ত কুঠুরিতে সলিটারি কনফাইনমেন্টে থেকে কারা নির্যাতন ভোগ করেন। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়ান। তাকে দেশের বাইরে চিকিৎসাসেবা নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। এমন এক পর্যায়ে তরুণদের নেতৃত্বে ঘটল চব্বিশের জুলাইয়ে দেশ কাঁপানো ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান। ফ্যাসিবাদী শাসক হাসিনার পুলিশ ও র্যাবের গুলিতে দুই হাজার নারী-পুরুষ ও ছাত্র-শ্রমিক নিহত হলেন। আরো কয়েক হাজার আহত হলেন। শেখ হাসিনা প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে তার প্রভুর দেশে পালিয়ে গেলেন। তাকে অনুসরণ করলেন তার দলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। শেখ হাসিনা পালায় না বলেও শেষ পর্যন্ত পালালেন। প্রমাণিত হলো জনতার শক্তি অপ্রতিরোধ্য। বিএনপি এ অভ্যুত্থানে ব্যাপক ও বিশালভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। দলটির প্রায় চার শ’ কর্মী ওই আন্দোলনে নিহত হয়েছেন। বিএনপির সহযোগিতায় গঠিত হয়েছে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
রমজানের আগে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে দেশে জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের বিদ্যমান হালচাল দেখে অনেকে শঙ্কিত ঘোষিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না। বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন ভণ্ডুল করার ষড়যন্ত্র চলছে। এখন দেখার বিষয় হলো বিএনপি তার রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করে দেশকে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মহাসড়কে পৌঁছাতে পারে কি না।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ