এবারের ঈদের লম্বা ছুটি সামনে-পেছনে মিলে ৯ দিন, ক্ষেত্র বিশেষে ১১ দিন। ফলে অনেক দিন অনেক বছর পর এরকম লম্বা ছুটির আমেজে গোটা দেশ ঈদ আনন্দে মেতে উঠেছিল। দীর্ঘ ছুটিতে ঢাকা এক নীরব শহরে পরিণত হয়েছিল। গ্রামগুলো হয়ে উঠেছিল কলরব আর কোলাহলে পূর্ণ। সবার মতো আমিও সপরিবারে নাড়ির টানে গ্রামমুখী হই। দীর্ঘদিনের ছুটি থাকায় মানুষ শেকড়ের টানে গ্রামে গ্রামে নিজ বাড়িতে যায়। প্রতিটি জনপদেই ঈদের আগেই যেন ঈদের সমারোহ। হাটবাজারে, দোকানে সর্বত্র ঈদের আমেজ। হঠাৎ করেই গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রগুলো সরব, কোলাহলময়। কাপড়ের দোকান, জুতার দোকান, মসলার দোকান, গোশতের দোকান সর্বত্রই জনারণ্য। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা যেন হঠাৎ নতুন করে জেগে উঠেছিল, সেজেছিল নতুন সাজে। পেয়েছিল নতুন গতি।

এর মধ্যে গ্রামে গ্রামে বিয়েরও ধুম লেগেছিল। নগরবাসী আত্মীয় স্বজন-পরিজনদের উপস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোও হয়ে উঠেছিল আনন্দময় ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। শহরের ছোট ছোট শিশুদের আবার কৌতূহল কিভাবে গ্রামের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিভাবে এত এত মেহমানের আপ্যায়ন করা হয়Ñ ডেকোরেটর-বাবুর্চির অনুপস্থিতিতে। বাড়ির কিশোর-কিশোরীরা কিভাবে বিয়ে বাড়ির সমস্ত আয়োজন অনায়াসে নিজেরাই করে ফেলে, পাড়ার যুবকরা কিভাবে নিজেরাই রান্নার আয়োজন করে। আবার তারাই বরযাত্রী বরণ করে খাবারের টেবিলে খাবার পরিবেশন করে। সব কিছুতেই যেন সামাজিকতা ও সহযোগিতার এক অর্পূব প্রকাশ যা আমি নিজেও বহু বছর দেখিনি।

এবারের ঈদ বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছিল লক্ষণীয়। সরকারের কঠোর নজরদারি গোটা রমজান এবং ঈদ বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য দ্রব্যাদির মূল্য সাধারণের নাগালের মধ্যে ছিল। ফলে গ্রামীণ ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদের বাজার করেছেন ঈদ আনন্দ উপভোগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি অভাবনীয় চিত্র দেখা গেছে গোশতের দোকানে। ঈদের আগের দিন থেকেই ক্রেতাদের লম্বা লাইন। অথচ গত ঈদেও দেখেছি ক্রেতার খরা। গরুর গোশতের দোকানে হাতেগোনা কয়েকজন গ্রাহক। এবার সে জায়গায় শত লোকের দীর্ঘ সারি। এ যেন হঠাৎ করেই জেগে ওঠা ঘুমন্তপুরী। এর পেছনে আরো একটি কারণ ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। তা হলো নির্বাচন প্রার্থী প্রত্যাশীদের সরব উপস্থিতি। এলাকায় তাদের উপস্থিতি এবারে গ্রামীণ ঈদ আনন্দকে করে তুলেছিল বর্ণিল ও আনন্দময়। সাথে যোগ হয়েছিল শহর থেকে গ্রামে ফেরা শেকড়ের সন্ধানীরা।

সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল ঈদ-পরবর্তী ঈদ উৎসব। বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয়েছিল মেলা-ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, যা উন্মুক্ত ছিল সবার জন্য। সব ধর্মাবলম্বীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল এসব অনুষ্ঠান। সর্বজনীনতার রূপ লাভ করেছিল এবারের ঈদ আনন্দ, যা ছিল অভূতর্পূব । এ যেন সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেয়ার এক অপূর্ব দৃশ্য।

অপরদিকে গ্রামীণ জনপদে সর্বজনীন ঈদ আয়োজনের কোনো চিত্র আমাদের কোনো ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় প্রতিভাত হয়নি। তুলে ধরা হয়নি আপামর জনগণের ঈদ আনন্দ ও উচ্ছ্বাসকে। আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম এই উৎসবের আদলে তৈরি কোনো অনুষ্ঠানমালা দেখা যায়নি ইলেকট্র্রনিক মিডিয়াগুলোতে। নায়ক-নায়িকাদের প্রেম কাহিনী, বিভিন্ন সঙ্গীত আয়োজনে চ্যানেলগুলো মুখর ছিল, যা রমজান ও ঈদ চেতনার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। একই সাথে দেখা যায়নি দেশের প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানটের কোনো আয়োজন ঈদকে ঘিরে। রমজান ও ঈদুল ফিতরকে নিয়ে জাতীয় কবির চেতনার আঙ্গিকেও কোনো অনুষ্ঠান দেখা যায়নি। কেবলমাত্র ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ পরিবেশন ছাড়া।

ইলেকট্র্রনিক মিডিয়াগুলোর জাতীয় চেতনা বিমুখিনতা নিয়ে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা ছিল কি না এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন। প্রতিবেশী দেশের চ্যানেলগুলো দিন-রাত তাদের জাতীয় চেতনা ও বিশ্বাসের প্রচারণা চালাচ্ছে তাতে কারুর কিছু বলার নেই। কিন্তু এ দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উল্লেখযোগ্য অংশ এ দেশের চ্যানেলগুলোতে মুসলিম চেতনাসমৃদ্ধ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে ভীষণ আপত্তি উত্থাপন করে। তাদের ভাষায় এগুলো সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ। অথচ বিদেশী চ্যানেলগুলোর অব্যাহতভাবে তাদের ধর্মীয় চেতনায় তৈরি অনুষ্ঠানমালার ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চেতনা-চিন্তা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীতে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালার ব্যাপারে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। শুধুমাত্র চাঁদ রাতে মেহেদি উৎসব ও ঈদের পরদিন আনন্দ শোভাযাত্রা জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনার ধারক নয় এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। জাতীয় বিশ্বাস ও চেতনার সাথে শহুরে ভোগবাদী চেতনার মাধ্যমে জাতিসত্তার বিভাজনকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না জাতীয় উৎসব ঈদকে কেন্দ্র করে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

shah.b.islam@gmail.com