আছিয়ার কাছে লজ্জিত পুরো দেশ। আজ আছিয়া এমন এক দেশে যেখানে ধর্ষক নেই, নেই ধর্ষিত হওয়ার ভয়। নেই অকালে ঝরেপড়ার বেদনা। নেই আছিয়ার শান্তিতে বিঘ্ন ঘটানোর পরিবেশ। আমরা আছিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তার পরিবারের সবার সাথে আমরাও সমব্যথি। আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে এ দুঃখ, বেদনা সইবার তৌফিক দেন। হঠাৎ কেন দেশব্যাপী ধর্ষণের মহোৎসব? পত্রিকার পাতা খুললেই কেন যেন মনের ভেতর ভয় জাগে। এই বুঝি আরেকটি ধর্ষণের খবর, হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দেবে। ইদানীং আমাদের মানবিক চেতনায় মরীচিকা ধরেছে। ফলে বীভৎস পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ধর্ষকের বিচারের ব্যাপারে এখন সবাই সোচ্চার, উচ্চকণ্ঠ একমত। কোনোক্রমেই যেন ধর্ষক ছাড়া না পায়, এই দাবি এখন সারা দেশে। অনেক ব্যক্তিত্ব এটিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করছেন পানি ঘোলা করার। এই সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয় সে জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। মাত্র ক’দিন আগে শাহবাগের স্লোগানকন্যা-খ্যাত লাকীকে দেখা গেল প্রকাশ্যে ধর্ষণবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দিতে। ৫ আগস্টের অনেক আগেই পরিত্যক্ত লাকী হঠাৎ কেন মাঠে আবির্ভূত হয়েছে তা বোঝা কঠিন নয়। নিকট অতীতে ইয়াসমীন ধর্ষণের আড়ালে ষড়যন্ত্রের মতো নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে কি না এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
অনেকে আগ বাড়িয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছেন। কিছু কিছু নারীবাদী নারীদের ঘরের চার দেয়ালে বন্দী করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী এরকম ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে পত্র-পত্রিকায় বয়ান ছেড়েছেন। এদের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে এ দেশে এ ধরনের ঘটনা এর আগে যেন কখনো ঘটেনি। বাস্তবতা কিন্তু অন্য। ১১ মার্চ দেশের একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিক আমার দেশ খবর ছেপেছে পতিত সরকারের শেষ ছয় বছরে সাত হাজার শিশুসহ প্রায় ৪৩ হাজারের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক লাখ ৩৭ হাজার নারী ও শিশু। ছাত্রাবাস থেকে শুরু করে রাজপথ সর্বত্রই ছিল ধর্ষণের মহোৎসব। এমনকি নিকট অতীতে প্রকাশ্যেই ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালন করা হয়েছে ঘটা করে। শাস্তির পরিবর্তে ধর্ষক নেতাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে উচ্চপদের চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের শাসকগোষ্ঠীর ছাত্রী সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন নেতা, ব্যবসায়ী, আমলা, মন্ত্রীদের কাছে জোরজবরদস্তি ও ভয় দেখিয়ে ভেট পাঠিয়েছেন স্বার্থসিদ্ধির জন্য। ভুক্তভোগী ছাত্রীরা প্রতিবাদী হয়ে এসব প্রকাশ করে দিলে ব্যাপারটি জানাজানি হয়। পত্রপত্রিকায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু কাউকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। মহিলা এমপির ‘পাপিয়াকাণ্ড’ মেয়েদের নিয়ে মধুকুঞ্জ পরিচালনা করার নোঙরা কদর্য ইতিহাস। ট্রেনে, বাসে, হোটেলে, লঞ্চে শুধুই ধর্ষণের অবাধ রাজত্ব। তখন শাহবাগী লাকীকে মিছিল নিয়ে বেরুতে দেখা যায়নি। দেখা যায়নি নারীবাদী বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদী চেহারা। সবাই অজানা স্বার্থে চুপটি মেরে ছিলেন। স্বার্থে বিঘ্ন ঘটায় এখন চেষ্টা করছেন, কোনোভাবে আবারো যদি হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া যায়। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে ধর্ষকদের রাজনৈতিক আশ্রয় দানের কারণে আজ সমাজের এই কদর্য চেহারা। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি অনুগত শ্রেণী তৈরির মানসিকতার প্রকাশ এই অবস্থার। সমাজে, রাষ্ট্রে, বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানে, শিক্ষাক্ষেত্রে নৈতিকতা, চারিত্রিক মর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা, দায়বদ্ধতার অভাব পরিস্থিতিকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এ থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। না আসতে পারলে দেশ ও জাতির অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়বে নিঃসন্দেহে। নৈতিকতা-সততা-দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাবে সমাজ থেকে। সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আজ ধর্ষণের বিরুদ্ধে একমত। এই চেতনাকে ধারণ করে ধর্ষকদের দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। এ ব্যাপারে একটি কথা না বললেই নয়। যারা সুবিচার, আইনের শাসনের কথা বলেন তারা যদি একাট্টা হয়ে ধর্ষকের পক্ষ অবলম্বন না করেন তা হলে ধর্ষণের হার অতিদ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। ধর্ষক যখন বুঝবে তার কোনো আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই, সে স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে আসবে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা, চারিত্রিক সততা-বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। দরকার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় ধর্ষণের উৎসাহ দেয়ার মতো চরিত্র, সংলাপ, সঙ্গীত অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। প্রয়োজন আকাশপথে উন্মুক্ত সংস্কৃতির প্রবাহ বন্ধ করার। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত কতজন ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই জাতির রয়েছে। আর একটি অপমানজনক ব্যাপার হলো ধর্ষিতাকে এমনভাবে ধর্ষকের আইনজীবী জেরা করেন তা দেখলে ও শুনলে কানে আঙুল দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী মহোদয় কি কখনো ভেবেছেন ধর্ষিতা তার স্ত্রী, বোন বা কন্যা হলে তিনি কি এসব চরিত্র চিত্রণ করতে পারতেন? অবস্থাটা হচ্ছে ধর্ষক কাঠগড়ায় নির্লিপ্ত, আর ধর্ষিতাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে তিনি কিভাবে কখন কোথায় ধর্ষিত হয়েছেন। আইনে ধর্ষিতার পরিচয় সামাজিক কারণে প্রকাশ নিষিদ্ধ থাকলেও তা সবিস্তারে প্রকাশ করেই শুধু মিডিয়াকর্মীরা ক্ষান্ত হন না, একই সাথে ধর্ষণচিত্রের রসাত্মক বর্ণনা দেন যা আইন ও শালীনতাবিরোধী। এসবের তোয়াক্কা না করে মিডিয়ায় ধর্ষিতাদের আদ্যোপান্ত পরিচয় প্রকাশ করে তাকে পরিবার, সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের কাছে ছোট করে ফেলা হয়, জীবনমৃত করে তোলা হয়। অনেকেই এই অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এ ক্ষেত্রে বর্তমান আইনের কঠোর প্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সংশোধন অত্যন্ত জরুরি। বিচার দ্রুততর করার জন্য প্রয়োজন বিচারিক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধর্ষণবিরোধী অবস্থানের সাথে এ ধরনের কোনো ব্যক্তিকে দলীয় বলয়ে স্থান না দেয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক নেতাদেরকে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঠিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থাকে মৌলিক মানবিক গুণাবলি সম্পৃক্ত করার। সমাজের সর্বস্তরের সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমেই শুধু ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। বিকল্প নেই নৈতিক শিক্ষার।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ