নাজমুল ইসলাম

সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার একটি নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফ্রান্স জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে পূর্ণ সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটছে। এই স্বীকৃতির পেছনে নিঃসন্দেহে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উপাদান রয়েছে। তবে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক শর্ত বারবার সামনে আসছে। সেটি হলো- হামাসকে ফিলিস্তিনের রাজনীতি থেকে বাদ দেয়া।

কানাডা ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাসকে নিষিদ্ধ করা হলে তারা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে। একই সময়ে সৌদি আরব, মিসর, কাতারসহ ১৭টি আরব ও মুসলিম দেশ ‘নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশনে’ হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, হামাসকে বাদ দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কি সম্ভব, কিংবা তা কি গ্রহণযোগ্য?

হামাস শুধু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন নয়, গাজার প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর অংশ। তারা স্কুল, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, যা জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত। চলতি বছরের একটি জরিপে দেখা গেছে, গাজার ৭৫ শতাংশ মানুষ হামাসকে সমর্থন করে, যেখানে মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ পেয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ সমর্থন। এই জনপ্রিয়তা উপেক্ষা করে কি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন সম্ভব?

অনেকে মনে করেন, এই রাষ্ট্র স্বীকৃতির প্রস্তাবগুলো মূলত প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশল। দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তিগুলো এমন কৌশল অনুসরণ করছে। এর লক্ষ্য প্রতিরোধ দুর্বল করে দখলদারত্ব নিশ্চিত করা। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পশ্চিম তীর এর বাস্তব উদাহরণ।

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বহু আগেই ফিলিস্তিনিরা দখলদার ইহুদি বসতি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে। ১৯৩৫ সালে এই সংগ্রামের অগ্রণী নেতৃত্ব দেন ইযউদ্দিন কাসসাম ও ফারহন সাদি। তাদের শাহাদাতের পর ১৯৩৬ সালে কাদির হুসাইন নেতৃত্ব গ্রহণ করে মাত্র এক বছরে ৫০৬টি সাহসী কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করেন।

এ সময় ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ‘পিল কমিশন’ নামে পরিচিত একটি তদন্ত দল পাঠায়। এই কমিশন ১৯৩৭ সালে প্রস্তাব দেয়, ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হবে; এক অংশে ইহুদি রাষ্ট্র এবং অন্য অংশে আরব রাষ্ট্র। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, তৎকালীন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের মুখে পুরো ভূখণ্ড দখল করতে না পারলেও অন্তত ইহুদিদের জন্য একটি স্থায়ী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা।

এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা নতুন করে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সেনাদের প্রায় ১০ হাজার সদস্য নিহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্রিটেন বেলফোর ঘোষণা বাতিল, ফিলিস্তিন বিভক্তির পরিকল্পনা থেকে সরে আসা এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন সরকারের আশ্বাস দেয়। কিন্তু এই আশ্বাস ছিল কৌশল মাত্র।

এই আশ্বাসের পর অনেকটাই শান্ত হয় বিপ্লব কিন্তু এর আড়ালে ব্রিটিশ ও ইহুদি নেতৃত্ব গোপনে নতুন দখল পরিকল্পনা আঁটতে থাকে। এক দশক পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৯৪৮ সালে শুরু হয় ভয়াবহ গণহত্যা ও গণউচ্ছেদ, যা ইতিহাসে ‘নাকবা’ নামে পরিচিত। এর পরও বহুবার দেখা গেছে, প্রতিটি শান্তিচুক্তি ও সমঝোতা ইসরাইলের জন্য সময়ক্ষেপণ ও শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল মাত্র।

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলে, ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ প্রায়ই ইসরাইলি দখলদারত্বের বৈধতা দেয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আসেনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ প্রস্তাব সমর্থন করছে। কিন্তু এর বাস্তব রূপায়ণ প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, অধিকাংশ প্রস্তাবেই হামাসকে বাদ দিয়ে, শুধু ফাতাহ-নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে।

আরব বিশ্বও এই প্রশ্নে বিভক্ত। সৌদি আরব, মিসর ও জর্দান পরোক্ষভাবে ইসরাইলের স্বার্থরক্ষায় কাজ করছে। তারাও হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখে এবং ফিলিস্তিনের এই বিপর্যয়ের জন্য তাদেরকে দায়ী করে। গত জুন মাসে ইসরাইলের পত্রিকা হারেৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বলছে, গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত। মানবিক এই বিপর্যয় নিঃসন্দেহে হামাসের সামরিক কৌশলকে বিতর্কিত করেছে। এই বিপর্যয়ের মুখেও হামাস ফিলিস্তিনিদের কাছে আত্মমর্যাদার প্রতীক।

অন্য দিকে, কাতার ও তুরস্ক হামাসকে রাজনৈতিক আশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ‘হামাস সন্ত্রাসী সংগঠন নয়, এটি প্রতিরোধ আন্দোলন।’ কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও, হামাসকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছে। এই দ্বৈততা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক সুবিধাবাদের দৃষ্টান্ত।

এই প্রেক্ষাপটে, হামাসকে বাদ দিয়ে যে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চলছে, তা বাস্তবতা-বিবর্জিত এবং ইসরাইলপন্থী একটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। ইতিহাস বলছে, প্রতিরোধ না থাকলেও ইসরাইলের দখল, উচ্ছেদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন থেমে থাকেনি। অস্ত্র জমা দেয়া ফাতাহ সরকারের সময়েই পশ্চিম তীরে সবচেয়ে বেশি ইহুদি বসতি বেড়েছে।

আজকের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চাইছে, যেখানে প্রতিরোধ থাকবে না, থাকবে কেবল আনুগত্য। গাজা পুরোপুরি দখল করা না গেলেও এখন কূটনৈতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে একতরফা কাঠামো চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

সত্যিকারের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন ফিলিস্তিনিদের ঐক্য। হামাস ও ফাতাহের মধ্যে পুনর্মিলন, একটি যৌথ প্রশাসনিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদিচ্ছা। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, ইসরাইলের প্রতি চাপ সৃষ্টি করা, গাজার অবরোধ প্রত্যাহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

হামাসকে বাদ দিয়ে যে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এটি একদিকে যেমন ফিলিস্তিনিদের গণইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে, অন্য দিকে দখলদারিত্বকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনীতিকে দুর্বল করবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক