৭ এপ্রিল ২০২৫ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় উত্তরায় তার বাসা থেকে গ্রেফতার হন। ঘটনাটি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার। যে সময়ে মো: জব্বার নামে একজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছিলেন। যদিও ড. আফরোজ যথেষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তি এবং ট্রাইব্যুনালে তার মেয়াদকালে পেশাগত অসদাচরণ ও নৈতিক ত্রুটির অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি, তবু এ ধরনের গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগে তার গ্রেফতার আইনের শাসন সম্পর্কে অনেকটাই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তাকে আটকের পর, পুলিশ একটি সংবাদ সম্মেলন করে, যেখানে তারা প্রকাশ করে যে তুরিনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একমাত্র জিনিসগুলো হলো তার মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত কম্পিউটার। তাদের দাবি, এগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকারের সমালোচনামূলক ফেসবুক পোস্ট রয়েছে। তবে এসব পোস্ট এবং কথিত খুনের চেষ্টার মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র উপস্থাপন করা হয়নি, অথবা পুলিশ কোনো নির্দিষ্ট ফেসবুক বিষয়বস্তু চিহ্নিত করেনি, যা একটি ফৌজদারি অপরাধ গঠন করতে পারে। তা সত্ত্বেও ৮ এপ্রিল ২০২৫ পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১০ দিনের রিমান্ড চায় এবং শেষ পর্যন্ত ৪ দিনের রিমান্ডের আদেশ নিশ্চিত করে।
ড. আফরোজ আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন যে, কথিত ঘটনার সময় তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তদুপরি ঘটনার আট মাস পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের বিলম্বও এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। সুস্পষ্ট অপরাধমূলক প্রমাণের অনুপস্থিতি, গ্রেফতারের সময় এবং উদ্ধার করা আইটেমগুলোর প্রকৃতির কারণে, আইন প্রয়োগকারীরা মাছ ধরার অভিযানে (প্রায়ই পুলিশ কর্তৃপক্ষ দ্বারা সংঘটিত একটি অনির্দিষ্ট অপরাধমূলক অনুসন্ধানের তথ্যের জন্য অনানুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা) জড়িত হয়ে থাকতে পারে এমন উদ্বেগ বাড়ছে, কোনো মৌলিক ভিত্তি ছাড়া একটি ফৌজদারি মামলা তৈরি করতে চাইছে। যদিও ড. আফরোজের অতীত তাকে একটি মেরুকরণকারী ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে পারলেও তার দাবির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের দ্বারা ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে যেন আপস করা না হয় তা নিশ্চিত করতে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ড. তুরিন আফরোজকে গ্রেফতারের আশপাশের পরিস্থিতি বোঝাতে, তিনি কে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার ভূমিকা সম্পর্কে চিন্তা করা প্রয়োজন। ড. আফরোজ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল-এর সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফেব্রুয়ারি ২০১৩-এ, তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল এই আশায় যে, তার নিয়োগ প্রসিকিউশনের ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করবে : এ ঘাটতি হলো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বোঝার অভাব।
ড. আফরোজ প্রসিকিউশন দলে যোগদানের আগে, তার বেশির ভাগ সহকর্মী ছিলেন ট্রায়াল আইনজীবী যাদের আন্তর্জাতিক আইনের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলস্বরূপ, যখন কমান্ডের দায়িত্ব, যথাযথ প্রক্রিয়া বা ন্যায্য বিচারের মানের মতো আন্তর্জাতিক আইনি নীতির সাথে জড়িত সমস্যাগুলো কার্যধারা চলাকালীন সামনে আসে, তখন প্রসিকিউশন প্রায়ই কার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হিমশিম খায়। ড. আফরোজের নিয়োগকে তাই আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ইস্যু মোকাবেলায় প্রসিকিউশনকে সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে প্রসিকিউশন দলে তার প্রবেশ বাধাহীন ছিল না। ড. আফরোজের বাস্তবিক আদালতের অভিজ্ঞতা এবং আইনি পেশাগত শিষ্টাচারসংশ্লিষ্ট জ্ঞানের অভাব ছিল। এটি তার এবং বেশ কয়েকজন সিনিয়র প্রসিকিউটর (আওয়ামী লীগের নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যদের) মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে যাদের বিচারের ব্যাপক অভিজ্ঞতা ছিল; কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের এক্সপোজার ছিল ন্যূনতম। এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলাসহ বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল মামলায় প্রসিকিউশনের প্রতিনিধিত্ব করেন ড. আফরোজ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ড. তুরিন আফরোজের সাথে আমার পেশাগত মোকাবেলায় শুধু তার সীমিত বোধগম্য আইনি অনুশীলনের প্রকাশ ঘটেনি, সেই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা এবং পেশাগত মানকে অবজ্ঞা করার একটি সমস্যাজনক প্যাটার্নও সামনে আসে। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও অ্যাডভোকেট শামসুল হকের দু’টি উল্লেখযোগ্য মামলায় তার বিরোধিতা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রে আদালতে তার আচরণ এবং তিনি যে আইনি যুক্তি দিয়েছিলেন তা এ ধরনের ঐতিহাসিক আর আইনি গুরুত্বের বিচারে জড়িত একজন উকিলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের অসঙ্গতি সম্পর্কিত একটি জটিল বিষয় ছিল। এ অসঙ্গতিকে সৎভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে, ড. তুরিন আফরোজ পূর্ব তিমুরের একটি আদালতের মামলার পরিস্থিতির তুলনা করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, সে ক্ষেত্রে সাক্ষীর বিবৃতিগুলো অসঙ্গত হলেও গ্রহণ করা উচিত, কারণ সাক্ষীরা অশিক্ষিত বা অসাক্ষর। কিন্তু পূর্ব তিমুরের মামলাটি আরো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনি ঘটনাকে ভুলভাবে আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন।
বাস্তবে পূর্ব তিমুর আদালত সে অসঙ্গতিকে উপেক্ষা করেনি। যদিও সেখানে সাক্ষীরা বলেছিলেন যে, তারা অশিক্ষিত, আদালত এর পরও তাদের অসঙ্গতিগুলো গুরুত্বসহকারে নেন। আদালত বিশেষ করে দ্বন্দ্ব-পরবর্তী সেটিংসে জোর দেয় যে সাক্ষীরা সহজে তদন্তকারীদের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে অথবা অনুভূত প্রত্যাশাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে ত্রুটিপূর্ণ স্মৃতি পুনর্গঠনের শিকার হতে পারে। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয় যে, শুধু নিরক্ষরতা অসঙ্গতি উপেক্ষা করাকে সমর্থন করে না। ডক্টর আফরোজের এ মামলার ভুল বর্ণনা আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্রকে অসৎভাবে তুলে ধরে আদালতকে বিভ্রান্ত করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলে মনে হয়।
অ্যাডভোকেট শামসুল হকের মামলায় তার ত্রুটিপূর্ণ আইনি যুক্তি আবারো সামনে চলে আসে। এখানে, তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে শান্তি কমিটি বা আল-বদরের মতো সংগঠনে নিছক সদস্যপদ অপরাধ বিবেচনার কারণ হতে পারে। যুক্তিটি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইনি নীতিগুলোকে উপেক্ষা করে, যা সরাসরি ব্যক্তিগত দায়িত্ব বা নির্দিষ্ট অপরাধমূলক আচরণের প্রমাণের অনুপস্থিতিতে ‘সদস্য অপরাধ’ ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করে। সদস্যপদ, নিজেই, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ফৌজদারি দায়বদ্ধতার নিরূপক নয়। একবার আমি এ সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থান আদালতে উপস্থাপন করলে তুরিনের যুক্তি খারিজ হয়ে যায়। এ ধরনের আইনগতভাবে অযোগ্য অবস্থানে ফৌজদারি দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে তার প্রচেষ্টা কেবল অযোগ্যতা নয়, দোষী সাব্যস্ত করতে মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করার ইচ্ছারও প্রমাণ।
মীর কাসেম আলীর বিচারের সময় তার পেশাগত অপ্রতুলতার সবচেয়ে বড় নজির জনসমক্ষে চলে আসে। এ ক্ষেত্রে আদালতে তার কার্যক্ষমতা এতটা খারাপ ছিল যে, এটি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সরাসরি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, যিনি তাকে উন্মুক্ত আদালতে তিরস্কার করেছিলেন।
২০১৯ সালে ড. তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ওঠে, যা তার পেশাগত সততার ওপর আরো সন্দেহ সৃষ্টি করে। তার বিরুদ্ধে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ওয়াহিদুল হকের সাথে সাক্ষাতের অভিযোগ আনা হয়, যিনি তখন মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তদন্তাধীন ছিলেন। জানা গেছে, ঢাকার একটি হোটেলে বৈঠকটি হয়, যেখানে ড. আফরোজ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে কোনো আইনিব্যবস্থা নেয়া হবে না নিশ্চিত করার বিনিময়ে ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক এনএসআই কর্মকর্তা তাদের কথোপকথন রেকর্ড করেন, যা তার অনৈতিক অসদাচরণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রদান করে।
এসব বিষয় প্রকাশ হওয়ার পর ড. তুরিন আফরোজকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। সুস্পষ্ট ও অনস্বীকার্য অসদাচরণে তার নিয়োগ বাতিল করা ছাড়া আইনমন্ত্রীর কোনো উপায় ছিল না। অপরাধের গুরুতরতা সত্ত্বেও ড. আফরোজ ঘুষ চাওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগের সম্মুখীন হননি। কিংবা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পেশাগত অসদাচরণের জন্য তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। মোটকথা আইনি ও পেশাগত জবাবদিহির পুরো দায় তিনি তার অবস্থান হারানোর সামান্য খরচে এড়াতে পেরেছিলেন।
অবশ্য ড. তুরিন আফরোজকে ঘিরে বিতর্ক শুধু তার পেশাগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি তার ব্যক্তিজীবনেও প্রসারিত হয়, যা তার পাবলিক ইমেজ আরো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০১৭ সালে একাধিক মিডিয়া আউটলেট তার নিজের পরিবারকে জড়িত করে একটি বিরক্তিকর ঘটনার রিপোর্ট করে। গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদনে ড. আফরোজ তার বৃদ্ধা মা ও ভাইকে উত্তরায় তাদের পৈতৃক বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মা সরাসরি অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে আসার পরে বিষয়টি ব্যাপকভাবে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, তার মেয়ে কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা তাদের সুস্থতার বিষয় বিবেচনা ছাড়াই জোরপূর্বক তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
তার আইনি অনুশীলন ও ব্যক্তিগত জীবন উভয় ক্ষেত্রে নৈতিক ত্রুটির এ সংমিশ্রণ তার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করেছে। সেই সাথে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের বিচারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তার সাম্প্রতিক উপস্থিতিতে, ড. তুরিন আফরোজ আওয়ামী লীগ সরকার থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন যে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ প্রশাসনের সময় একজন প্রসিকিউটর হিসেবে তার বরখাস্তের দিকে ইঙ্গিত করে এ দাবিটির ন্যায্যতা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, তার অপসারণ রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ ছিল। তবে এ বিবরণ বিভ্রান্তিকর।
ড. আফরোজকে প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন দলে আনা হয়েছিল এমন একটি প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়ার সুস্পষ্ট লক্ষ্যে, যা ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তের আওতায় এসেছে। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে সরকারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার মধ্যে তিনি একজন কৌশলগত ব্যক্তিত্ব হিসেবে অবস্থান করেছিলেন। অথচ ড. আফরোজের অনৈতিক আচরণ এবং জনসমক্ষে বিতর্কের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। জনসাধারণের সমালোচনা এবং তার অসদাচরণের প্রমাণের সম্মুখীন হয়ে, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে ট্রাইব্যুনালের সুনামের ক্ষতি সীমিত করতে তাকে বরখাস্ত করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
সুতরাং ড. তুরিন আফরোজের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার দাবি এ কারণে ভুল। তার অপসারণ আদর্শগত দ্বন্দ্বের ফল নয়, বরং তার নিজের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত উভয় ব্যর্থতার অনিবার্য পরিণতি।
তবে এটি অবশ্যই স্পষ্টভাবে বলা উচিত যে ড. তুরিন আফরোজের একজন প্রসিকিউটর হিসেবে পূর্বের অসদাচরণ বা অনৈতিক আচরণ অথবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে অন্যায়ের সাথে তার জড়িত থাকার বিষয় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তাকে গ্রেফতারের ন্যায্যতা দেয় না, বিশেষ করে যেখানে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের অভাব রয়েছে। এমনকি পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাথে তার পরিচিত সম্পর্ক, যার অধীনে অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়েছিল, সেটিও এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের জন্য আইনি ভিত্তি প্রদান করে না। ন্যায়বিচার হতে হবে সত্যের ওপর ভিত্তি করে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা নৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে নয়।
কর্তৃপক্ষ যদি ড. আফরোজকে জবাবদিহি করতে চায়, তাহলে বৈধ উপায় সে ক্ষেত্রে পাওয়া যেত। তার বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ, প্রসিকিউটরিয়াল ক্ষমতার অপব্যবহার বা পেশাগত অসদাচরণ আইনানুগ তদন্ত ও বিচারের ভিত্তি তৈরি করতে পারত। এগুলো এমন অভিযোগ যা বেশ কিছু নথিভুক্ত প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত এবং সম্ভবত আইনি যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো। এর পরিবর্তে তাকে হত্যার চেষ্টার অস্পষ্ট ও দুর্বলভাবে প্রমাণিত অভিযোগে গ্রেফতার করে, রাষ্ট্র অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকে ভিকটিম বা শিকার হিসেবে চিত্রিত করেছে।
উদ্বেগজনকভাবে পদ্ধতিটি সেই শাসনামলের নিপীড়নমূলক কৌশলের মতো যার অধীনে ড. আফরোজ কাজ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত স্তব্ধ করতে বানোয়াট বা রাজনৈতিক অভিযোগে মামলা করার জন্য কুখ্যাত ছিল। আশা করা হয়েছিল যে, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার সাথে সাথে এ ধরনের প্রথা পিছিয়ে যাবে। সন্দেহজনক অভিযোগের মাধ্যমে বিরোধীদের অনুসরণ করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ক্রমাগত ব্যবহার শুধু আইনের শাসনকে দুর্বল করে না, বরং নতুন প্রশাসন অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ভেঙে ফেলবে বলে যে প্রত্যাশা রয়েছে সেই অন্যায় ফিরে আসার ঝুঁকিও তৈরি করে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি