মো: সৈকত হোসেন ও মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম
চলতি বছর ২৬ জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বা সিএমবিইসি গড়ে তোলার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। এখন প্রশ্ন হলো, চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত এ করিডোর বিস্তৃত করার পরিকল্পনাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত হবে কি না।

তবে এটি কেবল আরেকটি কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রকাশ নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। এখন ঢাকার সামনে মূল প্রশ্ন হলো, করিডোরটি কতটা, কোন শর্তে এবং বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোর মধ্যে গ্রহণ করা হবে।

প্রস্তাবিত করিডোরটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এর আওতায় মহাসড়ক, রেলপথ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডিজিটাল সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের ওপর ভিত্তি করে এর বিস্তার ঘটিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সাথে আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্য আছে।

বাংলাদেশের জন্য এটি শূন্য থেকে শুরু করার কোনো প্রকল্প নয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভৌত অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ২০২৩ সাল থেকে চালু আছে। মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম পর্যন্ত এর সম্প্রসারণও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংযোগ পরিকল্পনার অংশ। একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডোর এই অবকাঠামোর অসম্পূর্ণ অংশগুলো সম্পন্ন করা এবং বর্তমানে যেসব অবকাঠামো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না, সেগুলো কার্যকর করার নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও করিডোরটির গুরুত্ব অনেক। বহু বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রফতানি ছিল মাত্র ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরতা এবং সেই সাথে রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর জরুরি প্রয়োজনকে স্পষ্ট করে। এখানে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বা সিএমবিইসি একটি পরিবহন প্রকল্পের চেয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে।

চীন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। তবে দেশটির অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জনমিতিক চাপ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কিছু শ্রমঘন শিল্পের উৎপাদনকেন্দ্র পরিবর্তনে চীনা কোম্পানিগুলো নতুন উৎপাদন স্থান ও আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজছে। বড় শ্রমশক্তি, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার, কৌশলগত অবস্থান এবং সম্প্রসারিত শিল্প সক্ষমতায় বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে বড় সুযোগ পেতে পারে।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশকে শুধু চীনা পণ্যের বড় বাজার হিসেবে নয়; বরং আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের আরো সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সুযোগ দিতে পারে। সঠিকভাবে আলোচনা ও বাস্তবায়ন করা গেলে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে, প্রযুক্তি হস্তান্তর উৎসাহিত করতে, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর এশীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে। তবে বাংলাদেশকে সংযোগ আর নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করিডোরের ডিজিটাল অংশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ একই সাথে নিজেকে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। সরকার তৈরী পোশাকের পর সেমিকন্ডাক্টরকে সম্ভাব্য বড় রফতানি খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেবা এবং উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তিতেও সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিইএআর (জৈবপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, এআই এবং রোবোটিক্স) সামিটে সরকার বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত গড়ে তুলতে বৈশ্বিক অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, এনএক্সপি, অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস ও স্যানডিস্কের মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভিয়েতনাম সেমিকন্ডাক্টর অ্যালায়েন্সের অংশগ্রহণও দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশ একটি মাত্র প্রযুক্তি অংশীদারের ওপর নির্ভর করতে চায় না। এ নীতি অব্যাহত রাখা উচিত।

চীনা বিনিয়োগ ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড অবকাঠামো, স্মার্ট লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে দ্রুততর করতে পারে। তবে এসব বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অংশীদারত্বের বিকল্প হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা তৈরি নয়।

অবকাঠামো উন্নয়নেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উন্নত সড়ক, রেলপথ, বন্দর, জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অবকাঠামো প্রয়োজন। চীনের অর্থায়ন সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা এসব প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তাই কেবল ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় চীনা অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। একইভাবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ যাচাই না করে চীনা অবকাঠামো গ্রহণ করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া সমাধান নয়; বাংলাদেশকে এমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা, যাতে উভয় পক্ষের সাথে কাজের সুযোগ থাকে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, এ নীতির গুরুত্বও তত বাড়ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটনের নিজস্ব প্রত্যাশা আছে। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস, অবকাঠামো অর্থায়নকারী এবং বিনিয়োগ অংশীদার। তাই বাংলাদেশকে এমন কোনো দ্বিমেরু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়লে চলবে না, যেখানে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান হলো কৌশলগত বহুমুখীকরণ। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। দেশটির নীতি প্রায়ই ‘বাঁশ কূটনীতি’ নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য হলো কোনো একটি শক্তির সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা। ভিয়েতনাম চীনা বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থা থেকে যেমন সুবিধা নিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের সাথেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারিত করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভিয়েতনামের চেয়ে ভিন্ন। তাই হুবহু ভিয়েতনামকে অনুসরণের প্রয়োজন নেই। তবে মূল শিক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ : একটি মধ্যম শক্তির দেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখতে পারে তখন, যখন কোনো একক বহিরাগত অংশীদারকে অপরিহার্য করে তোলে না।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; মিয়ানমার। এই করিডোর মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীল ও কার্যকর যোগাযোগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২১ সালে সামরিক ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটি রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও সশস্ত্র সহিংসতায় গভীরভাবে আক্রান্ত। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের আগের অনেক প্রকল্পও বিলম্বে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রস্তাবিত মান্দালয়-কিয়াউকফিউ রেলপথের কথা বলা যায়, যা আগের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও খুব বেশি অগ্রসর হয়নি।

বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারকে শুধু একটি ট্রানজিট দেশ হিসেবেও দেখা যাবে না। রোহিঙ্গা সঙ্কট এখনো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা ও মানবিক উদ্বেগ। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের টেকসই উন্নতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। চীন যদি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে অবকাঠামো উন্নয়নের বাইরেও বেইজিং একটি গঠনমূলক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশকে সিএমবিইসিকে শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে নয়; দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করিডোরের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতি তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

তবে সবকিছু নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় থাকাও ভুল হবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আরো গভীর করার আগ্রহ দেখিয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৮০০ একর জমির ওপর চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, যেখানে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে এগোচ্ছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এটি।

বাংলাদেশের সংযোগ আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সাথে যত বাড়বে, দেশের বন্দরগুলো প্রকৃত অর্থে উন্মুক্ত ও বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক রাখার গুরুত্বও তত বাড়বে। চট্টগ্রাম ও মোংলা কোনো একটি দেশের প্রবেশদ্বার হওয়া উচিত নয়। এসব বন্দরকে চীন, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাপান, ইউরোপ এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের সংযোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এখানেই চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের কৌশলগত মূল্য সবচেয়ে বেশি। একটি সফল করিডোর বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। লজিস্টিকস ব্যয় কমাতে পারে। বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। এ ছাড়া এশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে দেশকে আরো গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে। একই সাথে এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়িয়ে স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থও শক্তিশালী করতে পারে।

করিডোর নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিটি বড় অবকাঠামো চুক্তি বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, ঋণের স্থায়িত্ব, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবেশগত প্রভাব এবং বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। অবকাঠামোর লক্ষ্য শুধু যোগাযোগ বাড়ানো নয়; উৎপাদন সক্ষমতা সৃষ্টি করা।

বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ কাঠামোও এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। এটিকে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে এই প্ল্যাটফর্মে সংযোগ প্রকল্পের নিরাপত্তাগত প্রভাব, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সামুদ্রিক স্বার্থ এবং কৌশলগত নির্ভরতা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে পারে ঢাকা। মূল নীতিটি হওয়া উচিত খুব সরল : চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে, দুর্বল নয়। তাই বাংলাদেশের উচিত করিডোরকে স্বাগত জানানো, কিন্তু সবকিছু নিঃশর্তভাবে গ্রহণ না করা।

চীনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত দক্ষতাকে স্বাগত জানাতে হবে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অংশীদারের সাথে প্রতিযোগিতামূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে হবে। চীনা সংযোগ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে হবে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর জন্য। আমদানিনির্ভরতা আরো গভীর করতে নয়। ডিজিটাল অবকাঠামো গ্রহণ করতে হবে। এর সাথে আন্তঃকার্যক্ষমতা, প্রতিযোগিতা এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে করিডোর এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আঞ্চলিক কূটনীতি এবং রোহিঙ্গাসঙ্কট সমাধানের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।

সিএমবিইসি বাংলাদেশের সামনে যে প্রকৃত সুযোগ সৃষ্টি করছে, তা হলো বাংলাদেশকে চীনের অর্থনৈতিক বলয়ে নিয়ে যাওয়া নয়; এশিয়ার বৃহত্তর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় অংশে ঢাকাকে প্রতিষ্ঠিত করা। এ পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশকে চীন ও পশ্চিমের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে না। চীনের সাথে অবকাঠামোতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাথে বাজার ও প্রযুক্তিতে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে শিল্প উন্নয়নে এবং ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে আঞ্চলিক যোগাযোগে কাজ করা সম্ভব। লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো পক্ষের সাথে একাত্ম হওয়া নয়; অংশীদারত্বের বহুমুখীকরণ। সিএমবিইসি সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত চীনের প্রস্তাবের আকারের ওপর যতটা নির্ভর করবে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের মানের ওপর।

বাংলাদেশের উচিত করিডোর গ্রহণ করা। বিনিয়োগ গ্রহণ করা। আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও উদীয়মান প্রযুক্তির সাথে আরো গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করা। সেই সাথে নিজের বিকল্পগুলো খোলা রাখা।

লেখকদ্বয় : মো: সৈকত হোসেন চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক।

ড. মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসিজ এডুকেশন স্কুলের (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ) সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক