বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা নতুন নয়। সামরিক শাসন, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার, সংসদীয় সরকার, প্রায় প্রতিটি পর্বের পরই আমরা বলেছি, আর যেন সব ক্ষমতা একজন ব্যক্তি, একটি কার্যালয় বা একটি দলের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চায়, ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলই প্রায়শ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেই রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন তাদের যুক্তি থাকে, পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকলে সরকার কাজ করবে কিভাবে?
প্রশ্নটি উল্টো দিক থেকেও করা দরকার। সব ক্ষমতা এক জায়গায় রেখে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা জনগণকে এমন কী অসাধারণ সুফল দিয়েছেন, যা ক্ষমতার বণ্টিত কাঠামোয় দেয়া সম্ভব ছিল না? কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কি আমাদের প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ করেছে, দুর্নীতি কমিয়েছে, পুলিশকে নিরপেক্ষ করেছে, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করেছে, বিচারপ্রাপ্তি সহজ করেছে কিংবা নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করেছে? অভিজ্ঞতা বরং দেখায়, ক্ষমতা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার, ভয়ের সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিহীনতা তত বেড়েছে।
অতএব আসল বিতর্ক ‘শক্তিশালী সরকার’ বনাম ‘দুর্বল সরকার’ নয়। বিতর্কটি হলো, সরকারকে কাজ করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েও কিভাবে সেই ক্ষমতাকে আইন, প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির মধ্যে রাখা যায়। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে সর্বশক্তিমান শাসক নয়; শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো এমন রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের আইনসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের সীমা অতিক্রম করলে তাকে থামাতে পারে।
ক্ষমতাকে অবিশ্বাস নয়, এর প্রকৃতি বোঝা
রাজনৈতিক দর্শনের বড় একটি অংশই আসলে ক্ষমতাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। জন লকের সামাজিক চুক্তির ধারণায় সরকার জনগণের সম্মতি থেকে সীমিত ক্ষমতা পায়; ক্ষমতা শাসকের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। রুশোর জনপ্রভুত্বের ধারণাতেও সার্বভৌমত্ব জনগণের, প্রতিনিধিরা তা প্রয়োগ করেন, মালিকানা অর্জন করেন না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদও বলে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সুতরাং ক্ষমতার বণ্টন জনগণের ক্ষমতা কমানো নয়; জনগণের ক্ষমতা যাতে কোনো এক প্রতিনিধি আত্মসাৎ করতে না পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
মন্টেস্কুর ক্ষমতা পৃথকীকরণের তত্ত্বের মর্ম তিনটি বিভাগকে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা নয়। এর উদ্দেশ্য হলো, ক্ষমতার সামনে পাল্টা ক্ষমতা দাঁড় করানো। জেমস মেডিসন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক নকশায় একই বাস্তবতা স্বীকার করেন।
বাংলাদেশের সংবিধানে ভারসাম্য; কেন্দ্রের ওজন অতিরিক্ত
বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্যের কোনো প্রতিফলনই নেই এ কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার নির্দেশ আছে; সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিচারিক স্বাধীনতার স্বীকৃতি আছে; নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আছে। ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ নির্বাচিত স্থানীয় সরকার, স্থানীয় কর, বাজেট ও তহবিলের সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়েছে। ৭৭ অনুচ্ছেদ ন্যায়পালের কথাও বলেছে।
কিন্তু এসব বিধানের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কাঠামো অনেক ভারী। ৫৫(২) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা বা তার কর্তৃত্বে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে অধিকাংশ দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের অধীন করেছে। এর সাথে ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হলে সংসদ সদস্যের স্বাধীন বিচারবোধ সঙ্কুচিত হয়। দলীয় নেতৃত্ব, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নির্বাহী ক্ষমতা যখন একই কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সংসদের পক্ষে সরকারকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে সংবিধানের ভাষা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের সংস্কৃতিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা সরকারপ্রধান হবেন এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন, মন্ত্রিত্ব, সংসদীয় ভোট, প্রশাসনিক পদায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, উন্নয়ন বরাদ্দ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, সবকিছুর ওপর যদি একই নেতৃত্বের কার্যত নির্ণায়ক প্রভাব থাকে, তবে কাগজে পৃথক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তবে একটি ক্ষমতার পিরামিড তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র : ক্ষমতার সামনে ক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট আইনসভার সদস্য নন; কংগ্রেসের নিজস্ব নির্বাচনী বৈধতা আছে; সুপ্রিম কোর্ট নির্বাহী ও আইনসভার পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে পারে। কংগ্রেস অর্থ বরাদ্দ, তদন্ত, শুনানি এবং অভিশংসনের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ও বিচারিক নিয়োগে সিনেটের প্রয়োজন পড়ে। ফেডারেল কাঠামো কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যেও ক্ষমতা ভাগ করেছে।
এই ব্যবস্থাও নিখুঁত নয়। বিভক্ত সরকার অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে; দলীয় মেরুকরণ তদারকিকে নীতির বদলে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করতে পারে; জরুরি ক্ষমতা ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রেসিডেন্সির বিস্তার নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক আছে। তবু যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘সৎ’ থাকার আহ্বান জানিয়ে ভারসাম্য তৈরি হয় না; তাকে থামানোর মতো আইনগত ক্ষমতা, অর্থ, জনবল ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারসহ অন্য প্রতিষ্ঠান থাকতে হয়।
যুক্তরাজ্য : ক্ষমতার সংমিশ্রণ; জবাবদিহির সংস্কৃতি
যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যে ক্ষমতার কঠোর পৃথকীকরণ নেই। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংসদ থেকেই গঠিত হয়; ফলে নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন রয়েছে। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে পারে, তবে তার বিপরীতে আছে মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত ও যৌথ দায়। বিরোধী দলের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা, পেশাদার ও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিস, বিচারিক পর্যালোচনা, তথ্যপ্রকাশের ব্যবস্থা এবং স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। মন্ত্রীদের নীতি, সিদ্ধান্ত ও দফতরের কাজের জন্য পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে হয়।
ভারত : কেন্দ্রীয় প্রবণতার মধ্যেও বহুতল ক্ষমতা
ভারত সংসদীয় ঐতিহ্যের দেশ; তার ফেডারেল কাঠামো ক্ষমতাকে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভাগ করেছে। লোকসভা ও রাজ্যসভা, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট, সাংবিধানিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পঞ্চায়েত-মিউনিসিপ্যালিটির কাঠামো মিলিয়ে সেখানে ক্ষমতার একাধিক স্তর আছে। সংবিধানের ৭৪ ও ৭৫ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা এবং লোকসভার কাছে তার যৌথ দায় নির্ধারিত ।
ফ্রান্স : দ্বৈত নির্বাহী ও তার সতর্কতা
ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রে সরাসরি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি একজন প্রধানমন্ত্রী আছেন, যার সরকার পার্লামেন্টের কাছে দায়বদ্ধ। সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ সরকারকে জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে; ২১ অনুচ্ছেদ প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের কাজ পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। আবার প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, মন্ত্রিসভায় সভাপতিত্ব করেন, জাতীয় পরিষদ ভেঙে দিতে পারেন এবং বিশেষ সঙ্কটে ১৬ অনুচ্ছেদের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের হলে ক্ষমতার এই দ্বৈত প্রকৃতিকে আরো দৃশ্যমান করে।
ফরাসি মডেলের শিক্ষা দ্বিমুখী। একদিকে, নির্বাহী ক্ষমতা এক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পৃথক বৈধতা ও দায়িত্বের কেন্দ্র তৈরি করা যায়। বাংলাদেশে ভারসাম্য আনার অর্থ সরাসরি নির্বাচিত শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি সৃষ্টি করা নয়। দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাহী কেন্দ্র বানানোর আগে তাদের ক্ষমতা, দায় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি স্পষ্ট হতে হবে।
বিকেন্দ্রীকরণের মানে
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জেলা বা উপজেলায় বসেন; কিন্তু সিদ্ধান্ত, অর্থ ও পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ ঢাকাতেই থাকে। কেন্দ্র কোনো কাজ অন্য কর্তৃপক্ষকে দেয়; কিন্তু ইচ্ছা করলে তা ফিরিয়ে নিতে পারে। প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে তখনই, যখন নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আইন দ্বারা সুরক্ষিত নিজস্ব এখতিয়ার, রাজস্ব, বাজেট, জনবল এবং জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধতা পায়।
আমাদের প্রয়োজন তৃতীয়টি। যে সিদ্ধান্ত নাগরিকের সবচেয়ে কাছের সক্ষম স্তরে নেয়া যায়, তা অকারণে ওপরের স্তরে নেয়া উচিত নয়। তবে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতা দিয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাচার সৃষ্টি করাও সমাধান নয়। স্থানীয় বাজেট উন্মুক্ত করতে হবে, নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে, সভা ও ভোটের তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং নাগরিকের অভিযোগ ও প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ক্ষমতা নিচে যাবে; জবাবদিহিও তার সাথে যাবে।
বাংলাদেশের জন্য সংস্কারের রূপরেখা
প্রথমত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সীমিত করতে হবে। সরকারের অস্তিত্ব নির্ধারণকারী আস্থা ভোট, অনাস্থা ভোট এবং অর্থবিল বা বরাদ্দ-সংক্রান্ত ভোটে দলীয় শৃঙ্খলা থাকতে পারে; সাধারণ আইন, নীতি, নিয়োগ ও সাংবিধানিক বিতর্কে সংসদ সদস্যকে বিবেক, নির্বাচনী এলাকার স্বার্থ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ভোট দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। সংসদ সদস্য যদি প্রতিটি প্রশ্নেই দলীয় নির্দেশের বাইরে যেতে না পারেন, তবে সংসদ রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কমিটিকে প্রকৃত তদারকি ক্ষমতা দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দল ও বিভিন্ন দলের মধ্যে আনুপাতিকভাবে বণ্টন করা যেতে পারে। কমিটিকে নথি তলব, সরকারি কর্মকর্তাকে হাজির করা, শপথের অধীনে সাক্ষ্য নেয়া এবং জনশুনানি করার কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। বাজেট বিশ্লেষণের জন্য স্বাধীন পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সরকারি ব্যয়ের ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নির্বাহী জবাবদিহি অসম্পূর্ণ।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, পুলিশ নেতৃত্ব, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ পদে নিয়োগ একক নির্বাহী ইচ্ছার বাইরে নিতে হবে। বহুদলীয় সাংবিধানিক নিয়োগ কমিশন, প্রকাশ্য যোগ্যতার মানদণ্ড, সংক্ষিপ্ত তালিকা, স্বার্থের ঘোষণা এবং সংসদীয় শুনানির সমন্বিত ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মেয়াদ, বাজেট ও অপসারণের সুরক্ষা না থাকলে প্রতিষ্ঠান কেবল নামেই স্বাধীন থাকবে।
চতুর্থত, মন্ত্রিসভাকে আবার প্রকৃত যৌথ সিদ্ধান্তের প্রতিষ্ঠান করতে হবে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট, বাস্তবায়নের দায়িত্ব কে পেলো এসবের নিয়মিত রেকর্ড থাকতে হবে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের পরিচয়, দায়িত্ব, পারিশ্রমিক, স্বার্থের সঙ্ঘাত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা প্রকাশ করা উচিত।
পঞ্চমত, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদকে কাগজ থেকে বাস্তবে আনতে হবে। স্থানীয় সরকারের জন্য পূর্বনির্ধারিত সূত্রে সরাসরি অর্থ হস্তান্তর, নিজস্ব রাজস্বের ক্ষেত্র, স্থানীয় প্রশাসনিক জনবলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ও সময়মতো নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ সদস্যের কাজ হবে জাতীয় আইন ও তদারকি; স্থানীয় প্রকল্প বণ্টন বা স্থানীয় নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ নয়।
ষষ্ঠত, সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদের ন্যায়পাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। প্রশাসনিক অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাবঞ্চনার সহজ প্রতিকার থাকতে হবে। বিচার বিভাগের নিয়োগ, পদায়ন, বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার জন্যও স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সাথে তথ্য অধিকারকে শক্তিশালী করে সরকারি চুক্তি, ক্রয়, সম্পদ ঘোষণা, স্বার্থের সঙ্ঘাত, উপদেষ্টাদের ভূমিকা এবং বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করতে হবে। জনস্বার্থের তথ্য রাষ্ট্রকে নিজে থেকে প্রকাশ করতে হবে।
সপ্তমত, জবাবদিহি শুধু ব্যাখ্যা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এর অন্তত চারটি ধাপ আছে : কে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা শনাক্ত করা; তিনি কী কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা প্রকাশ করা; স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দিয়ে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা এবং অপব্যবহার প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, দেওয়ানি বা ফৌজদারি পরিণতি নিশ্চিত করা। শাস্তির বাস্তব সম্ভাবনা ছাড়া ‘জবাবদিহি’ একটি শালীন শব্দমাত্র।
ক্ষমতা কমানো নয়, সাংবিধানিক করা
বাংলাদেশের সমস্যা এই নয় যে, রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা আছে। আইন প্রয়োগ, কর আদায়, জননিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োজন। সমস্যা হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রায়ই প্রতিষ্ঠান অতিক্রম করে ব্যক্তি ও দলীয় কেন্দ্রের সাথে মিশে যায়। তখন সরকারি ক্ষমতা আর জনগণের থাকে না; তা রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
আমাদের এমন ব্যবস্থা দরকার, যেখানে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে; কিন্তু সিদ্ধান্ত গোপন রাখতে পারবে না, প্রশাসন কাজ করতে পারবে; কিন্তু আইন অতিক্রম করতে পারবে না, সংসদ সরকার গঠন করবে; কিন্তু সরকারের অধীন হয়ে যাবে না, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষমতা পাবে; কিন্তু নিরীক্ষার বাইরে থাকবে না, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নির্বাহীকে প্রশ্ন করবে, আবার নিজেরাও স্বচ্ছ নিয়োগ ও পর্যালোচনার অধীন থাকবে।
ক্ষমতার ভারসাম্য কোনো বিমূর্ত সাংবিধানিক সৌন্দর্য নয়। এটি নাগরিকের নিরাপত্তা। কারণ ক্ষমতা যখন ভাগ করা থাকে, নথিবদ্ধ থাকে এবং চ্যালেঞ্জ করা যায়, তখন একজন নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কোনো এক ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশের পরবর্তী সাংবিধানিক যাত্রার মূলনীতি তাই হওয়া উচিত- ক্ষমতা এক জায়গায় নয়, দায়িত্ব নির্দিষ্ট জায়গায়; সিদ্ধান্ত গোপনে নয়, নথিতে এবং অপব্যবহার হলে ক্ষমা নয়, দৃশ্যমান জবাবদিহি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক