নাগরিক নিরাপত্তা বাংলাদেশে ভঙ্গুর অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে। দৃশ্যত আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হলেও ভেতরগত দুর্বলতা বিদ্যমান। ফ্যাসিবাদী জমানায় শুধু ক্ষমতাসীন ছাড়া অন্য কারো পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না। সেই অন্ধকার সময়ের অবসান হলেও ক্ষেত্রবিশেষে কিছু নিরাপত্তা সঙ্কট বেশ উদ্বেগ তৈরি করছে। সম্প্রতি একজন ডাক্তারকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। অপরাধী চক্র এতটা নির্বিঘ্নে ঘটনা ঘটিয়েছে, যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তারা কোনো হুমকি মনে করে না। নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জায়গা থেকে এটি উদ্বেগজনক। সমাজের উপরের শ্রেণীর এক সদস্যের ওপর এত সহজে আক্রমণ হলে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা কোথায়?

সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর। ঘটনার সূত্রপাত ৬ আগস্ট ডাক্তারকে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবির মাধ্যমে। বার্তায় ভুক্তভোগীর কাছে দুর্বৃত্তরা ১৫ হাজার ডলার অর্থ দাবি করে। ১৫ আগস্টের মধ্যে নির্ধারিত অঙ্ক পরিশোধের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। প্রতারক চক্র ভেবে তিনি এটিকে গুরুত্ব দেননি। সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৭ আগস্ট শান্তিনগরে তার ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। নিশানা করে চোখে আঘাত করা হয়। তাতে কর্নিয়া দুই স্থানে কেটে গেছে। রেটিনার রক্তক্ষরণ হয়েছে।

চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী ঘটনাটির বিশেষ দিকটি হলো সন্ত্রাসীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। আহত করার প্রসিদ্ধ এই ডাক্তারকে বার্তা পাঠিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে ‘এখন কেমন লাগছে?’ বলা হয়েছে- ‘তুমি কি আমাদের সাথে আরো লাগতে আসবা?’ আশঙ্কার দিকটি হলো- তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে, সরকারের যেকোনো সংস্থা এমনকি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সাহায্য চেয়েও লাভ হবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সরকারের কেউ তাকে ও তার পরিবারকে স্থায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারবে না। হুমকিদাতারা নিজেদের ‘ডেভিড ও ইমন’ নামে পরিচয় দিয়েছে।

দেশের বিশিষ্ট একজন নাগরিককে এভাবে হুমকি-ধমকি দেয়া এবং প্রকাশ্যে আক্রমণ চালিয়ে প্রাণহানির শঙ্কা তৈরি করা বিস্ময়কর ঠেকলেও এ ধরনের একটি সংস্কৃতি সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা গেছে। এগুলোর কিছু ঘটেছে ক্ষমতাসীন রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে। কিছু ঘটেছে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী চক্রের দ্বারা। এমন অপরাধীরা যে অক্ষত এবং নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, এই ডাক্তারের ওপর হামলার ঘটনাটি তার ইঙ্গিত দেয়।

ছয় মাস আগে সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও আন্ডারগ্রাউন্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধারাবাহিক খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে। নতুনভাবে বিন্যস্ত হলেও এ চক্রের পুরনো কাঠামো রয়ে গেছে। এমনকি নতুন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সখ্য গড়ে তুলতে পেরেছে সন্ত্রাসী চক্র। যে কারণে ডাক্তারকে হুমকি দেয়া হয়েছে- পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় চেয়েও কোনো লাভ হবে না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সত্যিকার উন্নয়ন করতে হলে এ ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করতে হবে। এদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনাটি টেস্ট কেস হিসেবে নিয়েছেন নাগরিকরা- সরকার আসলেই কী অপরাধী চক্র নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক।