১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এ, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন বাংলাদেশের সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। এর একটি মূল প্রস্তাব হলো সরকারের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা, যা আরো ঘন ঘন নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং জনগণকে দ্রুততম সময়ে দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়ার সুযোগ দেবে। কমিশন আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রস্তাব করেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর একই সাথে রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা উভয় পদ রাখা উচিত হবে না। এটি আরো নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের লক্ষ্যে দেশের নেতৃত্বের সরকারি ভূমিকা থেকে রাজনৈতিক প্রভাবকে আলাদা করতে সহায়তা করবে। কমিশন আরো সুপারিশ করেছে, রাষ্ট্রপতি জাতীয় সাংবিধানিক কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পরই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। এটি নিশ্চিত করে, এ ধরনের একটি বড় সিদ্ধান্ত সাবধানে বিবেচনা করা হবে এবং একক একজন ব্যক্তি দ্বারা তা নেয়া হবে না। এর বাইরে, প্রস্তাবটিতে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা তৈরি করাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ আইনসভায় দু’টি কক্ষ থাকবে, একটি উচ্চকক্ষ এবং আরেকটি নিম্নকক্ষ। নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের দ্বারা প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হবেন, যাতে প্রক্রিয়াটিকে আরো গণতান্ত্রিক এবং জনগণের মতের প্রতিফলনকেন্দ্রিক হবে। সবশেষে দেশের সব বিভাগে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এটি সারা দেশে বিচারব্যবস্থাকে আরো সহজলভ্য ও দক্ষ করে তুলবে। এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর লক্ষ্য একটি ন্যায্য এবং আরো জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং তা বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যকে আরো উন্নত করবে।

অবশ্য, এই নিবন্ধে আমি কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশের যথার্থতা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। এই সুপারিশগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক করছে। আমি এই পরিবর্তনগুলো বর্তমান সংবিধানের সংশোধন নাকি একটি নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়েও আলোচনা করতে চাই না। এর পরিবর্তে, এই নিবন্ধে আমার লক্ষ্য হলো একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থার সফল কাঠামো তৈরির জন্য সঠিক পরিবেশ বিদ্যমান আছে কি না এবং কেন রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তাবিত সংস্কারের বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে তার কারণ অন্বেষণ করা।

আমেরিকান রাজনৈতিক দার্শনিক জন রাউলস (John Rawls) একটি সমাজ এবং এর আইন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আদর্শ পরিবেশের প্রতি মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত বই A Theory of Justice-এ, রাউলস কিভাবে সিদ্ধান্তগুলো ন্যায্যভাবে নেয়া উচিত সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ‘অজ্ঞতার পর্দা’ (Veil of Ignorance) ধারণার প্রবর্তন করেন।

রাউলসের মতে, এর অর্থ হলো ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আইন প্রণয়নের জন্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অবশ্যই কল্পনা করতে হবে, তারা যে সমাজ তৈরি করতে চলেছেন সেখানে তাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। শুধু যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এ অবস্থানে থাকে, অর্থাৎ, যেখানে তাদের লিঙ্গ, জাতি, অবস্থান, সম্পদ বা ক্ষমতা সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না, তখন তারা যে আইন প্রণয়ন করবে তা সমাজে তাদের অবস্থান বা মর্যাদা নির্বিশেষে ন্যায়সঙ্গত হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন ধনী ব্যক্তিকে একটি কর আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়, তবে তিনি নিশ্চিত করবেন, তার নিজের সম্পদ রক্ষা করার জন্য ধনীদের ওপর কর কম হবে। তবে, যদি একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে একই আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়, তবে তিনি নিশ্চিত করবেন, সম্পদের বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য ধনীদের ওপর ভারী কর আরোপ করা হয়েছে। সংক্ষেপে, প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব স্বার্থের পক্ষে যায় এমন স্কিম বেছে নেয়। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি সচেতন না থাকে যে, সে সমাজে ধনী বা দরিদ্র কোথায় তার শেষ পরিণতি হবে তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য ভিন্নভাবে কাজ করবে।

রাউলসের ‘অজ্ঞতার পর্দা’র পেছনের ধারণাটি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা যদি তারা যে সমাজ তৈরি করতে চলেছেন সেখানে নিজেদের সম্পর্কে বিস্তারিত না জানেন তাহলে, তারা ন্যায্য এবং আরো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা এমন আইন ও ব্যবস্থা বেছে নেবেন যা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের রক্ষা করবে, কারণ তারা নিজেরাই সেই দুর্বল গোষ্ঠীতেও থাকতে পারেন। এভাবে, সিস্টেমের সিদ্ধান্ত-নির্মাতারা যে অবস্থানেই নিজেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যান না কেন তাদের ডিজাইন প্রত্যেকের জন্য ন্যায্য হবে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির সময় ‘অজ্ঞতার পর্দা’র আড়ালে থেকে কাজ করতে ইচ্ছুক কি না। বাংলাদেশে এক বছরের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। একসময়ের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অঙ্গনে একেবারেই অনুপস্থিত। অধিকাংশ মানুষই মনে করছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল সুস্পষ্ট। এখন যদি একটি রাজনৈতিক দল নিশ্চিত হয় যে, তারা পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করবে, তাহলে তারা কি ন্যায্য ও ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ‘অজ্ঞতার পর্দার’ আড়ালে কাজ করতে পারবে? প্রকৃতপক্ষে, যদি একটি দল নিশ্চিত হয় যে, এটি পরবর্তী নির্বাচনে জিতবে, তবে দলটি তার নিজের স্বার্থে কাজ করবে এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন যে ক্ষমতাকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করবে যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন সে ক্ষমতাকে সীমিত করার বিধান প্রতিহত করবে।

তাই এ ধরনের রাজনৈতিক দল সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে (কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী) চার বছর করার প্রস্তাব সমর্থন করবে বলে আশা করা যায় না। এটি এমন সংশোধনীকে সমর্থন করবে বলেও আশা করা যায় না, যা প্রধানমন্ত্রীকে একই সাথে সংসদের নেতা এবং তার রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করবে। এটি একটি জাতীয় সাংবিধানিক কমিশনের (National Constitutional Commission) কাছে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাইবে না। অথবা এই জাতীয় রাজনৈতিক দল হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণকে সমর্থন করবে বলেও আশা করা যায় না, কারণ বিকেন্দ্রীকরণের অর্থ হবে সরকার বা ক্ষমতায় থাকা দলের জন্য বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করা।

অন্য দিকে যদি একটি রাজনৈতিক দল নিশ্চিত হয়, তারা সংসদে বিরোধী বেঞ্চে বসবে তবে তারা সে সংশোধনীগুলোকে সমর্থন করবে, যা নির্বাহী সরকারকে দুর্বল করে দেবে। সুতরাং, এটি কমিশনের প্রস্তাবিত সরকারের স্বল্পমেয়াদের পক্ষে হবে। এটি একজন দুর্বল প্রধানমন্ত্রীকে দেখতেও পছন্দ করবে। এ ধরনের একটি রাজনৈতিক দল বিকেন্দ্রীকৃত হাইকোর্ট বিভাগ দেখতে চাইবে, কারণ এটি নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের জন্য কম সংবেদনশীল হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশে বিরোধীরা প্রায়ই তার অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের ওপর নির্ভর করে।

দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে বর্তমানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ‘অজ্ঞতার পর্দার’ আড়ালে কাজ করছে না। রাজনৈতিক দৃশ্যপট এমন যে, এমন অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করা সম্ভব নয়। আগামী বছরের মধ্যে যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে তার ফলাফল সম্পর্কে তারা নিশ্চিত। তাই রাজনৈতিক দলগুলো এমন পর্দার আড়ালে কাজ করবে এবং নিজেদের স্বার্থ দেখবে না তা আশা করাটা অবাস্তব হবে। এভাবেই আগামী নির্বাচনে জয়লাভের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক দল সংবিধান কাঠামোর এমন পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে, যা তাদের শক্তিকে দুর্বল করে দেবে। আর বিরোধী দলে থাকার সম্ভাব্য রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী সরকারের ক্ষমতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

১৯৯১ সালের মতোই পরবর্তী নির্বাচনে কে জিতবে সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি ‘অজ্ঞতার পর্দা’ বিদ্যমান থাকত। যখন একটি নির্বাচনের ফলাফল অস্পষ্ট থাকে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে বাধ্য করা হয় যে, তারা যদি ক্ষমতায় না আসে, অথবা যদি তারা এমন একটি গোষ্ঠীর অংশ হয় যাদের কম সুবিধা বা ক্ষমতা আছে। এই পরিস্থিতিতে দলগুলো একটি ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা তৈরি করার দিকে মনোনিবেশ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা কেবল ক্ষমতায় থাকা নয়, ক্ষমতা নির্বিশেষে সবার উপকার করে। তারা এমন পরিবর্তনের জন্য চাপ দেবে, যা সরকারকে পুরো দেশের জন্য কাজ করতে বাধ্য করে, শুধু যে দলের নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতা আছে তার জন্য নয়। এর অর্থ হলো তারা শুধু তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সুবিধার দিকে মনোনিবেশ না করে সাংবিধানিক সংস্কারকে সমর্থন করবে, যা সব নাগরিকের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করে, ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার এবং সমতা নিশ্চিত করে।

অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘অজ্ঞতার পর্দার’ আড়ালে কাজ করতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে। এই কমিশনের সদস্যদের কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নির্বাচিত করা হয়েছিল এবং তাদের সংবিধানের পর্যালোচনা ও পরিবর্তনের প্রস্তাব করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, যা কেবল বর্তমান বা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অভিজাতদের জন্য নয়, সব নাগরিকের সর্বোত্তম স্বার্থ পরিবেশন করে। অন্তর্বর্তী সরকারও সংস্কারের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনাকে উৎসাহিত করছে। এই স্বচ্ছ আলোচনাগুলো সব রাজনৈতিক দলকে কেবল তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ শক্তির কথা না ভেবে সমাজের প্রত্যেকের জন্য কী ভালো তা চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।

উপসংহারে এটি স্পষ্ট যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ দলগুলোর জন্য ‘অজ্ঞতার পর্দার’ আড়ালে কাজ করা কঠিন করে তুলছে। পরবর্তী নির্বাচনের ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে পূর্বনির্ধারিত বলে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো পুরো জাতির জন্য কোনটা ন্যায্য তা বিবেচনা না করে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং জনসাধারণের আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে, নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এটিকে অসম্ভাব্য করে তোলে যে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে ন্যায্যতা ও সমতাকে অগ্রাধিকার দেবে। এভাবে, নিরপেক্ষ সংস্কার অর্জন করা একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি