এলাহী নেওয়াজ খান
ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন। অর্থাৎ নিজে অপরাধ করে অন্যের কাঁধে দোষ চাপিয়ে তার বিরুদ্ধে অপারেশন চালানো। কাশ্মিরের পহেলগাম নিধনযজ্ঞের পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ দেখে অনেক ভারতীয়ই এটিকে ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন হিসেবে দেখছেন। প্রথমত, ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তান সীমান্ত থেকে কাশ্মিরের ২২০ কিলোমিটার ভেতরে। দ্বিতীয়ত, অধিকৃত কাশ্মির হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চল যেখানে রয়েছে নি-িদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন এসে যায়, এত কঠিন নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে কিভাবে একটি সশস্ত্র গ্রুপ এত ভেতরে গিয়ে এরকম একটি হত্যাকাণ্ড চালাতে পারল। শুধু তাই নয় তারা, এত বড় একটি অপারেশন চালিয়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে যেতেই বা পারল কিভাবে?
এটিকে ভারতীয় কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে’ দেখার চেষ্টা করছেন। আবার ভারতের এবং বাইরের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি কোনো অবস্থাতেই ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা’ নয়। এটি ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। কারণ ঘটনার পরপর কোনো ধরনের তদন্তের উদ্যোগ না নিয়ে যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে এটি বুঝা যায়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হচ্ছে, যে অঞ্চলটি নি-িদ্র নিরাপত্তা জাল দ্বারা আচ্ছাদিত, যে অঞ্চলটিতে ঘরে ঘরে গোয়েন্দা তৎপরতা রয়েছে সেই অঞ্চলে সশস্ত্র একটি গ্রুপ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অপারেশন চালিয়ে কিভাবে নির্বিঘেœ ফেরত গেল? কিংবা একটি গোলযোগপূর্ণ এলাকায় পর্যটকদের জন্য কেন বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হলো না? তা ছাড়া যদি ধরেই নিই যে, মোদির বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত করতে পেরেছে বলে বিশ্ববাসীকে দেখাতে চায়, তাহলেও পর্যটকদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তা রাখা হয়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কেন রাখা হলো না? নাকি নিজের জনগণকে বলি দিয়ে শত্রুর ওপর দোষ চাপিয়ে তাকে আঘাত করাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য?
পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম উদাহরণ বহু আছে, নিজে অপরাধ করে সেই অপরাধের দোষ শত্রুর কাঁধে চাপিয়ে শত্রুকে শেষ করা। যেমন অ্যাডলফ হিটলারের কথাই ধরা যাক। ইতিহাসের এই জঘন্যতম ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কমিউনিস্টদের সাথে তার দ্ব›দ্ব লেগেই থাকত। তিনি কোনো অবস্থাতেই কমিউনিস্টদের মেনে নিতে পারছিলেন না। সে জন্য রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে কিভাবে কমিউনিস্টদের শেষ করা যায় সেই পথ খুঁজছিলেন। তাই একদিন নিজের লোক দিয়ে পার্লামেন্ট ভবনে আগুন লাগিয়ে দোষ চাপিয়ে দিলেন কমিউনিস্টদের ওপর। এতে কাজও হলো। জনগণ কমিউনিস্টদের ওপর প্রচণ্ডভাবে ক্ষেপে উঠল। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হিটলারের পক্ষে বেশ সুবিধা হলো। হিটলার কমিউনিস্টদের দমন করলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে।
একইভাবে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণের অজুহাত খুঁজছিলেন। একদিন তিনি নিজের একটি সশস্ত্র গ্রুপ দিয়ে সীমান্তবর্তী একটি জার্মানি রেডিও স্টেশনে আক্রমণ করিয়ে দেন এবং আক্রমণকারীরা দাবি করল, রেডিও স্টেশন অঞ্চলটি পোল্যান্ডের। অথচ আক্রমণকারীরা সবাই ছিল হিটলারের নিজস্ব সৈনিক। কিন্তু আক্রমণের দায় পোল্যান্ডের ওপর চাপিয়ে তিনি আক্রমণ করে বসেন এবং সম্পূর্ণ পোল্যান্ড দখল করে বসেন। এগুলো সবই ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের দৃষ্টান্ত। ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশেই এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটেছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা দু’দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আভাস দিচ্ছে। তবে ভারতের অনেক সমরবিশারদ যুদ্ধ বাধার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও বিজেপি ও আরএসএস নেতারা যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ায় কোনো কোনো বিজেপি নেতা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে কটাক্ষ করছে এই কারণে যে, কেন এখনো তারা পাকিস্তান আক্রমণ করেনি।
কিন্তু সমরবিদরা মনে করছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের এরকম একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অর্থ দাঁড়াবে- চীনের সাথেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। কারণ ২০১৯ সালের ৫ মে ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর চীন ঘোষণা দেয়, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন সবধরনের সাহায্য করবে। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ দ্বারা কাশ্মিরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এটি বাতিল করার মধ্য দিয়ে ভারত সরকার বিশ্ববাসীকে এটি বুঝাতে চেয়েছিল যে, কাশ্মির বিশেষ কোনো অঞ্চল নয়, এটি ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরপর ভারত পাকিস্তানের দিকে হাত বাড়াবে সেটি চীন তখনই ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল বলেই ওই ঘোষণা দিয়েছিল।
সুতরাং ভারত যদি এখন পাকিস্তান আক্রমণ করে বসে তাহলে অবধারিতভাবে চীন পাকিস্তানের সাহায্যে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসবে। সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এরকম পরিস্থিতিতে চীন প্রথমেই সাইবার অ্যাটাকের মাধ্যমে ভারতের কমিউনিকেশন সিস্টেম অকার্যকর করে দেবে। তারপর ব্যাংক থেকে শুরু করে বিমানবন্দর, নৌবন্দর- সব জ্যাম করে দেবে। এ ছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সাপ্লাই লাইন। অর্থাৎ দ্রুত অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত থাকা। কিন্তু আকাশ ও নৌপথ ছাড়া ভারতের দ্রুত সরবরাহ পাওয়ার কোনো স্থল-রুট নেই। পক্ষান্তরে পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সব অস্ত্রশস্ত্র চীনের কাছ থেকে পেতে থাকবে অব্যাহতভাবে। অন্য দিকে চীন ছাড়াও তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরো অনেক দেশ এর মধ্যেই পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। অন্য দিকে যে দু’টি অঞ্চল দিয়ে ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে সে দু’টি অঞ্চল হচ্ছে পাঞ্জাব ও কাশ্মির। আর দু’টি এলাকার জনগণ চরম ভারতবিরোধী। এরকম একটি বৈরী পরিবেশে বিশ্বের যেকোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করা খুবই কঠিন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে বৈরিতা মোকাবেলা করেছিল বাংলাদেশে।
এসব কিছু ছাড়াও যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় করে দেখা দিয়েছে সেটি হচ্ছে- একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করার সক্ষমতা ভারতের আছে কি না। ইতোমধ্যে একটি ভিডিও ক্লিপ বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিও ক্লি¬পে দেখা যাচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জেনারেলদের সাথে বৈঠক করছেন। তিনি জেনারেলদের বলছেন, পাকিস্তানের সাথে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে; কিন্তু যুদ্ধের অপারগতা স্বীকার করে জেনারেলরা বৈঠক ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে একটি টিভি টকশোতে বলেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ণাঙ্গ একটি যুদ্ধে যাওয়ার অবস্থায় নেই। যেমন যেখানে বিমানবাহিনীর ৪২ স্কোয়াড্রন দরকার সেখানে আছে ৩০ স্কোয়াড্রন। আবার এর বিরাট একটি অংশ মোতায়েন রাখতে হবে চীন সীমান্তে। অন্য দিকে সেনাবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৬০ শতাংশের রয়েছে খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব। এরকম একটি পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে সর্বাত্মক একটি যুদ্ধে জড়ানো খুবই কঠিন।
তাই সর্বশেষ ভারতের সমরবিদরা বালাকোটের মতো একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাই করার কথা ভাবছে, যা কার্যত নরেন্দ্র মোদির ৫২ ইঞ্চি বক্ষকে ২০ ইঞ্চিতে পরিণত করবে।