বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ, নির্বাহী বিভাগের প্রভাব, দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন; আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে প্রশাসনিক সংস্কার; স্বাধীনতা ও সময়মতো বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার সংস্কার; শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কার তথা রাষ্ট্র সংস্কারের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এ দেশের আপামর মানুষের চাওয়া শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে জনগণের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হবে, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা জনগণের শাসক না হয়ে সেবক হবে, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার। একটি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এরূপ রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্ভব। উন্নত গণতন্ত্র তথা জবাবদিহি ও সবার অংশগ্রহণমূলক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন আবশ্যক।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation, সংক্ষেপে PR) হলো এমন একটি নির্বাচনপদ্ধতি, যেখানে সংসদ বা পার্লামেন্টের আসনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর মোট ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা আসন পাবে। সংসদে ৩০০টি আসন আছে। একটি দল যদি ৩০ শতাংশ ভোট পায় তবে তারা ৯০টি আসন পাবে; আরেকটি দল ১০ শতাংশ ভোট পেলে তারা ৩০টি আসন পাবে। এতে ছোট ছোট দলও সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবে। পিআর পদ্ধতির বেশ কিছু ধরন আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত দু’টি হলো : ১. List PR System ও ২. Mixed-Member Proportional (MMP)। List PR System আবার দুই ধরনের : ক. Closed List : ভোটাররা কেবল দলকে ভোট দেন। কোন প্রার্থী সংসদে যাবেন, তা দল ঠিক করে; খ. Open List : ভোটাররা দলকেও ভোট দেন, আবার প্রার্থীর নামও বেছে নিতে পারেন। কে সংসদে যাবে, তা ভোটারের পছন্দে নির্ধারিত হয়। Mixed-Member Proportional (MMP) পদ্ধতিতে কিছু আসন হয় সরাসরি নির্বাচনের (First-Past-The-Post), বাকি আসন হয় আনুপাতিকভাবে। এতে সরাসরি নির্বাচনের উপকারিতা এবং পিআরের ভারসাম্য থাকে। যেমন- জার্মানিতে এই পদ্ধতি আছে। পিআর পদ্ধতির বহুবিধ সুবিধা আছে, যেমন- ছোট দলগুলোরও সংসদে যাওয়ার সুযোগ হয়, এতে জনগণের বিভিন্ন মতামত প্রতিফলিত হয়; ভোটের অপচয় কম হয়, অর্থাৎ বর্তমানের First-Past-The-Post (FPTP)-এর মতো ‘হারলেই শূন্য’ অবস্থা হয় না, ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলে প্রায় সব ভোটের মূল্য থাকে; একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন। ফলে বিভিন্ন দলকে মিলেমিশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয় এবং এতে একনায়কত্বের ঝুঁকি কমে যায়। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পিআর পদ্ধতির মূল অসুবিধা হলো- ছোট দলের সহজেই সংসদে ঢোকার সুযোগে সরকারে চরমপন্থী দলের প্রবেশ ঘটতে পারে ও তাদের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব মতামত হলো- সংস্কারেই এরূপ নিয়ম সংযোজন করা উচিত যে, কোনো দল ১৫ বা ১০ শতাংশের কম ভোট পেলে বা আইনানুযায়ী কোনো দলকে চরমপন্থী দল হিসেবে ঘোষণা করা হলে তারা সংসদে কোনো আসন পাবে না। সংসদে চরমপন্থী দলের অনুপ্রবেশের এই অসুবিধাটি ছাড়া গণতন্ত্রে উন্মেষের জন্য পিআর পদ্ধতির বিকল্প নেই। তাই বিশ্বের বহু দেশেই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের আরো সঠিক উপায় মনে করা হয়।
Closed List পিআর পদ্ধতিতে যেহেতু সারা দেশই একটি constituency, ভোটাররা যেহেতু কোনো ব্যক্তিকে নয়; বরং দলকে ভোট দেন এবং দল এমপি নিয়োগ দেয়, তাই আশা করা যায়- অযোগ্য, অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত, চরিত্রহীন, কালো টাকার মালিক বা সন্ত্রাসী কোনো ব্যক্তি সংসদ-সদস্য হতে পারবে না। এতে করে ভোটচুরি হবে না, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তির প্রভাব নিয়ে মারামারি-হানাহানিও থাকবে না, থাকবে না ভোটের মাঠে কালো টাকার দৌরাত্ম্য। মোদ্দা কথা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য নির্বাচনপদ্ধতি, যা ভোটারদের মতামত ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য সংসদে উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র গড়তে পিআর পদ্ধতি একটি কার্যকর পন্থা।
পিআর পদ্ধতিতে সংস্কার প্রক্রিয়ায় বহু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, সংস্কারের যাত্রা দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো গোষ্ঠীর সংস্কার দমন করার প্রচেষ্টা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচার ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, আন্দোলনে বিভাজন বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ভেতরে জুজুর ভয় যে, পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনে ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের মতো জনগণের ওপর ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব ফলাতে পারবে না, জুলুম করতে পারবে না, একচ্ছত্র দাপট দেখাতে পারবে না! এ ছাড়াও দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ে তোলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। কেননা, কেউ তা করলে কোয়ালিশন সরকারের ভেতর থেকেই কথা উঠবে। কেউ কেউ সমালোচনার জন্যই শুধু সমালোচনা করে বলছে, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কলুষিত স্বৈরতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, লুটপাটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তখন জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তার শুশ্রুষা করতে হবে বৈকি!
পিআর পদ্ধতির নির্বাচনী সংস্কারে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিয়েছে দেশের একটি বড় দলের অনীহা ও বিরোধিতা। সংস্কারে বড় দলটির বাধা দেয়ার কারণ তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক। দেশটা কোনো দলের একার সম্পত্তি নয়, দেশটা ১৮ কোটি মানুষের। এখানে একক কোনো রাজনৈতিক দলকে দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য, কল্যাণের জন্য লিখে দেয়া হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক যা সব রাজনীতিবিদের মনে রাখতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থান শুধু আন্দোলন নয়, সুসংগঠিত রূপান্তর প্রচেষ্টা, জনসচেতনতা, ঐক্য ও নেতৃত্ব সংস্কারের দিকনির্দেশনা। জুলাই অভ্যুত্থান শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে বিদায় নয়; বরং এটি দেশ পরিবর্তনের এক টার্নিং পয়েন্ট। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক রূপান্তর নয়; বরং একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার গণভিত্তিক পুনর্গঠনের রূপরেখা তৈরি করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনা সম্ভব না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের সহস্রাধিক শহীদের রক্তের সাথে গাদ্দারি করা হবে। অন্য দিকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশ সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে এবং শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের রক্তদান, আন্দোলনকারীদের প্রচেষ্টা সফল হবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক