বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী দেশ, যেখানে ধান শুধু একটি প্রধান খাদ্যশস্য নয়, এটি কৃষি অর্থনীতিরও মূল চালিকাশক্তি। দেশজুড়ে কৃষকরা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে ইউরিয়া সারের ওপর নির্ভর করেন, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রচলিত সারের ব্যবহারপদ্ধতি, বিশেষ করে মাটিতে ছিটিয়ে দেয়া, খুব বেশি কার্যকর নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রয়োগকৃত নাইট্রোজেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ’ বাষ্পীভবন, ধৌতকরণ ও প্রবাহিত হওয়ার কারণে হারিয়ে যায়, যা গাছের বৃদ্ধিতে এর কার্যকারিতা সীমিত করে।

এই ক্ষতির অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ৩৫৯.৩৩ ডলার ধরে, বাংলাদেশ ধান চাষে সার কেনার জন্য প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা (৭৭৬ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় করে। যেহেতু এই সারের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়, তাই দেশটি প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই অপচয় কৃষকদের উৎপাদনখরচ বাড়ায় এবং সরকারি ভর্তুকির উপরও চাপ সৃষ্টি করে।

এছাড়া, অত্যধিক ইউরিয়া প্রয়োগের ফলে নাইট্রোজেন প্রবাহিত হয়ে পানিদূষণ এবং ইউট্রোফিকেশন ঘটায়, যা জলজ বাস্তুতন্ত্রে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এছাড়া, ইউরিয়া প্রয়োগের ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইড (ঘ২ঙ) নির্গত হয়, যা কার্বন-ডাই অক্সাইডের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিন হাউজ গ্যাস, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশ যখন খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে দক্ষ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষিপদ্ধতি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর, একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন : এই চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিক্রিয়ায়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর তৈরি করেছে, যা ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) পদ্ধতিতে ইউরিয়ার ব্যবহারকে অপটিমাইজ করে। প্রচলিত মাটির উপর ছিটিয়ে দেয়ার পদ্ধতির বিপরীতে, ইউডিপি পদ্ধতিতে ইউরিয়া মাটির সাত থেকে ১০ সেন্টিমিটার নিচে স্থাপন করা হয়, যা নাইট্রোজেনের অধিকতর অংশ গাছের গ্রহণের জন্য নিশ্চিত করে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমায়।

২০২৪ সালের টি-আমন চাষের মৌসুমে গাজীপুর, রাজবাড়ী ও মাদারীপুরে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় এই অ্যাপ্লিকেটরের কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়েছে। যেসব কৃষক এই যন্ত্রটি ব্যবহার করেছেন, তারা ইউরিয়ার ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমিয়েছেন, যা উল্লেখযোগ্য খরচ সাশ্রয় করেছে। এই হ্রাসের অর্থ হলো- যেসব কৃষক আগে প্রতি বিঘায় ২৪ কিলোগ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগ করতেন, তারা এখন মাত্র ১৬ কিলোগ্রাম ইউরিয়া দিয়ে একই বা আরো ভালো ফলাফল পাচ্ছেন, যা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমায়।

জাতীয় পর্যায়ে, বাংলাদেশ যদি ইউরিয়ার ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমায়, তবে এটি প্রতি বছর তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করবে, যা ব্যক্তিগত কৃষক এবং সরকার উভয়ের জন্যই আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে। এই পরীক্ষাগুলো আরো প্রকাশ করেছে যে, ধানের ফলন ৬ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেখায় যে, ভালো নাইট্রোজেন ব্যবস্থাপনা উচ্চ উৎপাদনশীলতার দিকে নিয়ে যায়। কৃষকরা শুধু সারের উপর কম খরচ করছেন না; বরং তাদের ফসল থেকে বেশি আয়ও করছেন, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করছে।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা : ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর ফলন বিসর্জন না দিয়েই সারের ব্যবহার কমিয়ে উৎপাদনখরচ উল্লেøখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এটি ধান চাষকে আরো লাভজনক এবং টেকসই করে তোলে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য যারা উচ্চ উৎপাদন খরচের সাথে সংগ্রাম করেন।

এছাড়া, ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর নাইট্রোজেনের ক্ষয়ক্ষতি কমায়, যা নিশ্চিত করে যে কম ইউরিয়া বায়ুমণ্ডল এবং পার্শ্ববর্তী বাস্তুতন্ত্র যেমন- নদী ও হ্রদে প্রবেশ করে। মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাগুলো দেখিয়েছে যে, মিথেন নির্গমন ১২ থেকে ১৩ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন ২১ থেকে ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ধান চাষকে পরিবেশগতভাবে আরো দায়িত্বশীল করে তোলে।

বড় আকারে ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর গ্রহণ করা বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ২০২৩-৫০ এর অধীনে কৃষিজাত কার্বন পদচিহ্ন কমানোর প্রতিশ্রুতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং সারের দক্ষতা উন্নত করে বাংলাদেশকে আরো জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সহায়তা করবে।

প্রচলনের বাধা ও উত্তরণের উপায় : স্পষ্ট সুবিধা সত্তে¡ও ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটরের ব্যাপক গ্রহণ একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অনেক কৃষক ইউডিপি পদ্ধতির সাথে অপরিচিত এবং তারা তাদের প্রচলিত সারের ব্যবহারপদ্ধতি পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। সঠিক বোঝাপড়া ছাড়া, তারা এই পরিবর্তনকে অপ্রয়োজনীয় বা কঠিন বলে মনে করতে পারেন।

এটি সমাধানের জন, কৃষি সম্প্রসারণ সেবাগুলোকে কৃষকদের শিক্ষিত করতে আরো সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করতে হবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, মাঠ প্রদর্শনী এবং কৃষক সমবায়গুলো ব্রি প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর ব্যবহারের প্রতি আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই), এনজিও এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের একসাথে কাজ করতে হবে যাতে কৃষকরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও চলমান সহায়তা পেতে পারেন এই প্রযুক্তিকে তাদের চাষাবাদ পদ্ধতিতে একীভ‚ত করার জন্য।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো- অ্যাপ্লিকেটর কেনার প্রাথমিক খরচ। যদিও যন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত সারের খরচ কমিয়ে কৃষকদের অর্থ সাশ্রয় করে, তবুও প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছু ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য অসাধ্য বলে মনে হতে পারে। এই সমস্যাটি সরকারি ভর্তুকি, ক্ষুদ্রঋণ অর্থায়ন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে, যা এই প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী ও ব্যাপকভাবে উপলব্ধ করে তোলে। স্থানীয় উৎপাদন ও বিতরণে বিনিয়োগ করাও খরচ কমাতে সাহায্য করবে, যা দেশের সব কৃষকের জন্য যন্ত্রটিকে আরো সহজলভ্য করে তুলবে।

এছাড়া এই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য স্থানীয় উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা করা উচিত। সরকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে, যা নিশ্চিত করবে যে, সরবরাহ শৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকে এবং সব অঞ্চলের কৃষক, বিশেষ করে জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর কৃষকরা বিলম্ব বা মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াই অ্যাপ্লিকেটর পেতে পারেন।

জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুততর হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে- এ পরিস্থিতিতে নাইট্রোজেন ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা আর সহ্য করা যাবে না। ব্রিআরআরআই প্রিলড ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর একটি কম খরচে, উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন প্রযুক্তি যা ধান চাষে সার অপচয় কমিয়ে, খরচ কমিয়ে এবং ফলন বাড়িয়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। নীতিনির্ধারকদের উচিত জাতীয় কৃষি কর্মসূচিতে এই প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং কৃষকদের এই পদ্ধতিতে রূপান্তরের জন্য জ্ঞান ও আর্থিক সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা। এটি বাংলাদেশের জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও কৃষি-জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রিআরআরআই)