পদত্যাগ করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

Printed Edition

বিবিসি

ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির দলীয় প্রধানের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। নিজের রাজনৈতিক দলটির ভেতরে আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর স্টারমার গতকাল সোমবার এই আকস্মিক ও বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন যে বর্তমানে তার দলের ভেতরের মূল জিজ্ঞাসা ছিল যে আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলকে সফলভাবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না। নিজের দলের সহকর্মীদের সেই অভ্যন্তরীণ মনোভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি এবং অত্যন্ত সদ্বিবেচনার সাথে সেই উত্তরটি গ্রহণ করছি।’ তিনি আরো দাবি করেন যে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেয়া তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই মূলত ‘নিজের ভালোবাসার দেশকে সবার আগে স্থান দেয়ার’ উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছিল। নিজের দল ত্যাগের সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে কিয়ার স্টারমার ঘোষণা করেন, ‘আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করবো।’ সোমবার সকালেই তিনি ব্রিটেনের রাজা চার্লসের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে নিজের এই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাকে বিশদভাবে অবহিত করেছেন।

দলীয় প্রধানের এই আকস্মিক ঘোষণার পর তিনি লেবার পার্টির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটি তথা ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির কাছে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা টাইমটেবিল তৈরির অনুরোধ জানিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী ৯ জুলাই থেকে নতুন দলীয় প্রধান পদের জন্য আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন নেয়া শুরু হবে এবং সংসদের আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটির আগেই এই সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হবে।

নতুন এই রাজনৈতিক সময়সূচি অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট পুনরায় চালু হওয়ার আগেই লেবার পার্টি তাদের একজন নতুন স্থায়ী দলীয় প্রধান পেয়ে যাবে। কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে নতুন দলীয় প্রধান বা উত্তরসূরি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের সরকারি দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় পদে বহাল থাকবেন।

১০ বছরে ৭ প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিতে অস্থিরতা

দুই বছর আগে বিশাল জয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র বিদ্রোহ ও চাপের মুখে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রিটেনের এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট থেকে, যেখানে ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেন। এই সিদ্ধান্ত দেশটির ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক আনুগত্য এবং দ্বিদলীয় কাঠামোকে পুরোপুরি দুর্বল করে দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ-তে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে গণভোটে হেরে পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে একে একে থেরেসা মে (ব্রেক্সিট চুক্তি পাসে ব্যর্থতা), বরিস জনসন (একাধিক কেলেঙ্কারি), লিজ ট্রাস (মাত্র ৪৯ দিনের সংক্ষিপ্ত মেয়াদ) এবং ঋষি সুনাক (২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভরাডুবি) সবাইকে বিদায় নিতে হয়েছে। গড়ে প্রতি দেড় থেকে দুই বছরে দেশটিতে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসা কিয়ার স্টারমারও দুই বছরের কম সময়ে নানা নীতিগত পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। বিশেষ করে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঘটনাটি তার সরকারকে বড় ধরনের বিতর্কে জড়ায়। এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ব্রেক্সিটের অন্যতম রূপকার নাইজেল ফারাজের দল ‘রিফর্ম ইউকে’ সাম্প্রতিক নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়ে ব্রিটিশ রাজনীতির মূলধারায় চলে এসেছে। জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মোর ইন কমন’-এর পরিচালক লুক ট্রাইল বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনই ছিল মূলত প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ; কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসায় এই অস্থিরতা কাটছে না। বর্তমানে লেবার পার্টির নতুন নেতা ও দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেকারফিল্ড থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যান্ডি বার্নহাম সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।