এলবার্ট পি. কষ্টা
জুলাই বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার গত ৫ আগস্ট জাতির সামনে জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়া উপস্থাপন করে। ওই একই দিনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আগামী নির্বাচনের টাইম ফ্রেমও ঘোষণা করা হয়। এই দু’টি বিষয় জাতির সামনে উপস্থাপনা করা হলে প্রাথমিকভাবে জনগণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট আছে বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এর একদিন পর থেকেই রাজনীতিতে এই দু’টি বিষয় নিয়ে দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান জাতির সামনে আসতে শুরু করে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি স্পষ্টত জুলাই সনদ নিয়ে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে দেয় এবং আগামী নির্বাচন নিয়েও তাদের অবস্থান ‘যদি/কিন্তু’তে আটকে যায়। তারা প্রাসঙ্গিক করে তোলে নির্বাচনের জন্য পিআর (সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন) পদ্ধতির বিষয়টি। এখন যত দিন গড়াচ্ছে পরিস্থিতি ততই ঘোলা হতে শুরু করেছে। আগামী কয়েক দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করা কঠিন।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে জনগণের সামনে উৎসবমুখর পরিবেশে নিজ প্রার্থী ও দলীয় কর্মসূচি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার কথা সেখানে স্থান করে নিয়েছে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বৈরিতা। এমনকি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। নির্বাচন পদ্ধতি সংশোধন করে দাবি পূরণ না করলে নির্বাচন থেকে বাইরে থাকার ঘোষণা দিয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামী। চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও পিআর পদ্ধতির দাবি জানাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদার নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপিও পিআর পদ্ধতির পক্ষে। সেই সাথে তারা গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি নতুন করে সামনে এনেছে। দলটি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, জুলাই ঘোষণাপত্রে তারা ছাড় দিয়েছে কিন্তু জুলাই সনদের বিষয়ে একবিন্দু ছাড় দেবে না। এই দলগুলোর বক্তৃতা বিবৃতির ভাষা ক্রমে কঠোর হয়ে উঠছে।
নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ গরম করা বক্তব্য বিবৃতি খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশের নির্বাচনী মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা জনগণের জন্য কী করতে চায় তার পরিবর্তে প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ইতিহাস ও ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরে রাজনীতির মাঠ গরম করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এমনকি পরস্পরকে হুমকি ধমকি দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কখনো অনিশ্চিত করে তোলে না। এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্নতর। জামায়াতে ইসলামী বলছে, পিআর পদ্ধতি না হলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং নির্বাচনকে প্রতিহত করবে। এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী একটি অনুষ্ঠানে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। সরকারের ওপর যথেষ্ট প্রভাবশালী দল হিসেবে এনসিপি যখন কোনো ‘যদি/কিন্তু’ ছাড়াই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না- তখন নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এখন প্রতিদিনই নানা ইস্যু সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। রাজনৈতিক রেটোরিক এই মুহূর্তে মূল সঙ্কটের কারণ নয়। মূল সঙ্কট হলো আস্থার সঙ্কট, বিশ্বাসের সঙ্কট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কটও বাংলাদেশের ইতিহাসে পুরনো অনুষঙ্গ। অতীতে দলগুলো তাদের ওয়াদা শতভাগ পালন করেছে এমন নজির ৫৫ বছরের ইতিহাসে কখনোই স্থাপন করতে পারেনি। দোষারোপের রাজনীতির ভেতর দিয়ে সবসময়ই তাদের ওয়াদা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে কিংবা আংশিক পালন করেছে। আজ নতুন বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তাই একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা ছেলেমেয়েদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে উঠেছে যে, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ আগামীতে নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের হাতেই সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছে, এ দু’টি বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না হলে তাদের জীবন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজও একটি বিকল্প পথ সন্ধানে দৌড়ঝাঁপ করছেন। জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ দু’টিকে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কিভাবে আইনগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায় তা নিয়ে নানা পরামর্শ খতিয়ে দেখছে। জটিলতা ও বৈপরীত্যের আইনগত প্রশ্ন জড়িত থাকায় শিগগিরই এর সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ খোদ বর্তমান সরকারকে এবং তার কার্যকালকে বৈধতা পেতে হবে আগামী সংসদের মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধানে এর বিকল্প নেই।
হাসিনাবিরোধী জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্বাচনহীনতা বা ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা। অস্বীকার করার উপায় নেই, নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করলে রাজনৈতিক দলের কী পরিণাম হতে পারে তার জ্বলন্ত প্রমাণ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সমর্থক ৩০-৩৫ শতাংশ নাগরিকও যদি আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোটাধিকারে অংশগ্রহণ করতে পারতেন, তবে দলটির এমন করুণ পরিণতি হতো না। কিন্তু তা হলো না। বরং ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিলেন, পুরো দলকেও পালাতে হলো। এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বায়তুল মোকাররমের ইমাম সাহেবকেও পালাতে হয়। এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় আরেকটি আছে কি না আমাদের জানা নেই।
জাতিকে এ সঙ্কট থেকে বের করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের হাতে সম্ভবত বেগম খালেদা জিয়াই একমাত্র অপশন হয়ে উঠতে পারেন। ৫ আগস্টের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কেবলমাত্র বিএনপির সম্পত্তি নন। তিনি জাতীয় সম্পদ, গণতন্ত্রের সম্পদ। আমাদের জাতীয় অভিভাবক। তিনি যে আর দলীয় রাজনীতিতে ফিরবেন না তা এখন অনেকটা স্পষ্ট। কিন্তু তার নির্দেশনা, অনুরোধ ফেলতে পারেন- এমন ব্যক্তি বা দল সম্ভবত এখন বাংলাদেশে নেই। রাজনৈতিক জীবনেও তিনি স্বয়ং মুখ দিয়ে বলেছেন, আর সে ওয়াদা পালন করেননি, এমন কখনোই ঘটেনি। তাকে সাথে নিয়ে জাতির জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য আস্থার জায়গা বের করে নিতে পারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
লেখক : রাজনীতিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন