মাওলানা ওলীউর রহমান
রমজান মাসে জাকাত আদায় করা উত্তম। কারণ এই মাসে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায় এবং হিসাবের ক্ষেত্রেও সুবিধা। জাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। পবিত্র কুরআনে নামাজের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮২ বার জাকাতের আলোচনা এসেছে। প্রতিটি সামর্থ্যবান আজাদ, বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মুসলমানের ওপর জাকাত ফরজ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— ‘তোমরা সালাত আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসূল সা:-এর আনুগত্য করো যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পারো।’ (সূরা নূর-৫৬)
রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করবে তাকে জান্নাতের বিশেষ দরোজা ‘বাবুস সাদাকাহ’ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মিশকাত-১/৩২৬)
জাকাতের নিসাব : জাকাতের নিসাব হলো— যে পরিমাণ সম্পদ হলে জাকাত ফরজ হয়। এ ক্ষেত্রে শরিয়ত দু’টি পরিমাপ ধার্য করেছে। একটি হলো স্বর্ণ আর অপরটি হলো রৌপ্য। স্বর্ণের নিসাব হলো আরবি ওজনের ভিত্তিতে ২০ মিসকাল, যা তোলার হিসাবে সাড়ে সাত তোলা। আর রুপার নিসাব হলো ২০০ দিরহাম, যা তোলার হিসাবে সাড়ে ৫২ তোলা। কারো কাছে যদি তার নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদ ছাড়া সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য অথবা এর সমমূল্যের সম্পদ থাকে তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ। (হেদায়া-১/২১১, তাতারখানিয়া-জাকারিয়া-৩/১৫৫)
নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদ : নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদ অর্থাৎ— যে সম্পদের ওপর জাকাত আসে না, সেগুলো হলো— বসবাসের ও ভাড়া দেয়ার ঘর, ফ্ল্যাট, ঘরের আসবাবপত্র, ব্যবহারের কাপড়-চোপড়, চলাচলের বাহন, চাষাবাদের পশু, কারখানার যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারপত্র, নিজের ও নিজের উপর নির্ভরশীল স্বজনদের দৈনন্দিন খরচ ইত্যাদি। এসব সম্পদের উপর জাকাত আসে না। (কিতাবুল মাসায়িল-২/২২৩)
জাকাতের হিসাব : যদি কারো কাছে কিছু স্বর্ণ, কিছু রৌপ্য এবং কিছু টাকা পয়সা থাকে তাহলে সবগুলোর মূল্য একত্র করে যদি কোনো একটি নিসাব পূর্ণ হয়ে যায় (যেমন— সবগুলো একত্র করে যদি সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বর্তমান বাজার মূল্যের সমান হয়ে যায়) তাহলে সেই নিসাব অনুযায়ী জাকাত আদায় করা ওয়াজিব। (হিন্দিয়া-১/১৭৯, দুররে মুখতার-৩/২৩৪)
বর্তমানে সোনা ও রুপার মধ্যে কোনটির হিসাব ধরতে হবে : রাসূল সা:-এর যুগে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা এবং সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্য প্রায় সমান ছিল। বর্তমান সময়ে দু’টির মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান হয়ে গেছে। তবে সোনা থেকে রুপার দাম কম হওয়ায় রুপার দামেই জাকাতের হিসাব করতে হবে। কারণ এর দ্বারা দরিদ্র মানুষের বেশি উপকার হয়।
বর্তমানে সর্বনিম্ন মূল্যের সনাতনী রুপার ভরি চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। তবে বিক্রয় মূল্য আরো ২০ শতাংশ কম হবে। এই হিসাবে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম হবে এক লাখ ৬৮ হাজার থেকে এক লাখ ৮৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ— কারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদ ছাড়া সোনা, রুপা, নগদ টাকা, ব্যবসায় নিয়োজিত পণ্যসামগ্রী, ব্যাংক বা অন্যান্য অর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ী হিসাবে রক্ষিত অর্থ, প্রাইজবন্ড, বীমা পলিসি, পোস্টাল সেভিংস সার্টিফিকেট, ডিপোজিট পেনশন স্কিম এবং এরূপ নিরাপত্তামূলক তহবিলে জমাকৃত অর্থ একসাথে হিসাব করে যদি এক লাখ ৬৮ হাজার টাকা হয়ে যায় এবং এই সম্পদ তার কাছে পূর্ণ এক বছর থাকে, তাহলে সে এই সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫ শতাংশ) জাকাত বাবদ আদায় করতে হবে। তবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ নিজের দায়িত্বে সোপর্দ না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর জাকাত ধার্য হবে না।
জাকাত আদায় করতে হবে চন্দ্রবর্ষের হিসাবে : জাকাত আদায় করতে হয় চন্দ্রবর্ষের হিসাবে। (শামি-করাচি-২/২৫৯, শামি-জাকারিয়া-৩/১৭৫) আর চন্দ্রবর্ষ হলো ৩৫৪ অথবা ৩৫৫ দিনে। আর সৌরবর্ষ হলো ৩৬৫ অথবা ৩৬৬ দিনে। অর্থাৎ— সৌরবর্ষ হতে চন্দ্রবর্ষ ১১ বা ১২ দিন কম। তাই সৌরবর্ষের হিসাবে আপনি জাকাত আদায় করলে মূল জাকাতের সাথে অতিরিক্ত আরো ১২ দিনের হিসাব যুক্ত করে জাকাত দিতে হবে। অর্থাৎ— শতকরা ২.৫ এর পরিবর্তে ২.৫৭ শতাংশ আদায় করতে হবে।
লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব, পূর্বভাটপাড়া জামে মসজিদ, ইসলামপুর, মেজরটিলা, সিলেট