দেশের বহু এলাকায় চুলা জ্বলে না, শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস পায় না, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না এবং সার উৎপাদন ব্যাহত হয়। অথচ জনগণকে প্রায় একই ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে— গ্যাসক্ষেত্র পুরনো, মজুদ কমছে, তাই ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি অনিবার্য।
এই বক্তব্য আংশিক সত্য; কিন্তু আংশিক সত্য দিয়ে পূর্ণ ব্যর্থতা আড়াল করা যায় না। গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন একসময় কমবে— এটি বহু বছর আগে থেকেই জানা ছিল। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল সেই পতনের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেয়া, বিদ্যমান উৎপাদন রক্ষা করা এবং পুরনো ক্ষেত্রের জায়গায় নতুন উৎপাদন যুক্ত করা। সময়মতো সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাই আজকের সঙ্কট ভয়াবহ করে তুলেছে।
একটি ধারাবাহিক ক্যালেন্ডার-বর্ষভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ২০২০ সালে ছিল ৮৬৮ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ঘনফুট বা বিসিএফ। ২০২১ সালে তা কমে ৮৫১ বিসিএফ, ২০২২ সালে ৮২৩ দশমিক ৮০ বিসিএফ এবং ২০২৩ সালে ৮২২ দশমিক ৩০ বিসিএফে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ২০২০-২৩ সময়ে জাতীয় নিট উৎপাদনের যৌগিক বার্ষিক পতন ছিল প্রায় ১ দশমিক ৮২ শতাংশ।
এই ১ দশমিক ৮২ শতাংশ প্রতিটি গ্যাসক্ষেত্রের প্রাকৃতিক ক্ষয়হার নয়। কোনো কোনো পুরনো ক্ষেত্রের উৎপাদন নিশ্চয়ই আরো দ্রুত কমেছে। কিন্তু ওয়ার্কওভার, নতুন কূপ, কম্প্রেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদন পুনরুদ্ধার কিংবা অন্য ক্ষেত্র থেকে অতিরিক্ত সরবরাহের মাধ্যমে সামগ্রিক পতনের বড় অংশ তখন সামাল দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ নিজেই দেখিয়েছিল যে সক্রিয় ব্যবস্থাপনায় জাতীয় উৎপাদন-পতন সীমিত রাখা সম্ভব।
এরপরই ঘটে উদ্বেগজনক পরিবর্তন। একই পরিসংখ্যান-ধারায় ২০২৪ সালে উৎপাদন প্রায় ১৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে আরো ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ কমেছে। সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে মোট উৎপাদন ও পতনের হারে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে সেগুলো এক-২০২৩ সালের পর দেশীয় উৎপাদনের পতন দ্রুত বেড়েছে এবং তা ৭ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
এটি নিছক পরিসংখ্যানগত ওঠানামা নয়; গুরুতর কাঠামোগত বিচ্যুতি। যে জাতীয় ব্যবস্থা কয়েক বছর উৎপাদন-পতন প্রায় ১ দশমিক ৮২ শতাংশে সীমিত রেখেছিল, সেটি হঠাৎ এত দ্রুত ভেঙে পড়ল কেন— জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে তার পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কোন গ্যাসক্ষেত্র ও কোন কূপ থেকে কত উৎপাদন কমেছে? কতটুকু ছিল অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক ক্ষয়? কতটুকু কমেছে যান্ত্রিক ত্রুটি, কম্প্রেসরের অভাব, বিলম্বিত ওয়ার্কওভার, অসম্পূর্ণ উন্নয়ন কূপ, প্রক্রিয়াকরণ সীমাবদ্ধতা কিংবা পাইপলাইন না থাকার কারণে? সময়মতো বিনিয়োগ করলে কত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা যেত?
এসব প্রশ্নের পৃথক ও যাচাইযোগ্য উত্তর না দিয়ে সবকিছুকে ‘মজুদ কমে গেছে’ বলে শেষ করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাকৃতিক ক্ষয় মন্ত্রণালয়ের অপরাধ নয়; কিন্তু জানা ক্ষয়ের বিপরীতে সময়মতো বিনিয়োগ না করা, উৎপাদন পুনরুদ্ধারের প্রকল্প বিলম্বিত করা এবং বিকল্প সরবরাহ তৈরিতে ব্যর্থ হওয়া অবশ্যই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ভূগর্ভের চাপ কমতে পারে, তাতে সরকারের দায় কমে না।
একটি সক্ষম জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় তিনটি কাজ একই সাথে চলার কথা। প্রথমত, পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ওয়ার্কওভার, কূপের পুনঃসমাপ্তি, কম্প্রেশন এবং প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার উন্নয়নের মাধ্যমে বিদ্যমান উৎপাদন রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান অবকাঠামোর কাছাকাছি আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা। তৃতীয়ত, পুরনো ক্ষেত্রের উৎপাদন কমার আগেই ধারাবাহিক অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপের মাধ্যমে নতুন সরবরাহ প্রস্তুত করা।
২০২৩ পরবর্তী উৎপাদন-ধস দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে যে এই তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। রক্ষণাবেক্ষণ ও কম্প্রেশন প্রয়োজনের তুলনায় ধীর হয়েছে, আবিষ্কৃত গ্যাস উৎপাদনে আনতে সময় লেগেছে এবং অনুসন্ধান দেশের গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির চাহিদার সাথে তাল রাখতে পারেনি। সঙ্কট প্রতিরোধের আগাম পরিকল্পনার বদলে ঘাটতি প্রকট হওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এটি জ্বালানি পরিকল্পনা নয়; এটি ব্যর্থতার পেছনে দৌড়ানো।
দেশীয় উৎপাদন কমার সাথে সাথে এলএনজির ভূমিকা বেড়েছে। ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। এই পুরো আমদানি এড়ানো সম্ভব ছিল— এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। দেশীয় উৎপাদন ভালো থাকলেও মোট চাহিদার বিপরীতে কিছু ঘাটতি থাকত।
কিন্তু এটিও বলা যায় না যে, এলএনজি ব্যয়ের কোনো অংশই এড়ানো সম্ভব ছিল না। বিলম্বিত ওয়ার্কওভার, প্রয়োজনীয় কম্প্রেসর না বসানো, উন্নয়ন কূপ পিছিয়ে দেয়া এবং অনুসন্ধানে ঘাটতির কারণে দেশীয় গ্যাসের যে উৎপাদন পাওয়া যায়নি, তার প্রতিটি ইউনিট আমদানির প্রয়োজন বাড়িয়েছে।
তাই বিতর্কটি ‘এলএনজি চাই কি চাই না’-এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, দেশীয় উৎস থেকে প্রতিটি অতিরিক্ত বিসিএফ গ্যাস উৎপাদনের পূর্ণ ব্যয় ও সময় কত, আর জাহাজভাড়া, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর, টার্মিনাল চার্জ, ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকিসহ আমদানি করা এলএনজির পূর্ণ ব্যয় কত। এই তুলনামূলক হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি কেন?
অনুসন্ধান, উন্নয়ন কূপ, ওয়ার্কওভার, কম্প্রেশন, প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা ও পাইপলাইনে কত অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল? এর বিপরীতে এলএনজি ক্রয়, পরিবহন, টার্মিনাল ব্যয় ও ভর্তুকিতে কত গেছে? দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর প্রকল্প বিলম্বিত রেখে আমদানিতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে কি না, জনগণ তা জানার অধিকার রাখে।
এলএনজি জরুরি ভারসাম্যকারী জ্বালানি হতে পারে; কিন্তু তা দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনের বিকল্প হতে পারে না। সাময়িক ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা যদি স্থায়ী আমদানিনির্ভরতায় পরিণত হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের মূল্য এবং বিদেশী সরবরাহব্যবস্থার হাতে চলে যাবে।
দেশীয় উৎপাদন কমেছে, ঘাটতি বেড়েছে এবং সেই ঘাটতির সুযোগে এলএনজি আমদানি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা একা দুর্নীতি প্রমাণ করে না, কিন্তু একটি গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্ন অবশ্যই তোলে : এটি কি শুধু অদক্ষতা, অবহেলা ও ভুল পরিকল্পনার ফল, নাকি আমদানিনির্ভর স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য অনুকূল নীতি তৈরির অংশ? জনগণ অনুমান নয়— স্বাধীন তদন্ত, চুক্তি পরীক্ষা, বিনিয়োগের তুলনামূলক হিসাব এবং দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চায়।
এ কারণেই এলএনজি ক্রয়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, টার্মিনাল দায় এবং দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ— সবকিছুর সমন্বিত ও স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। বিদেশী সরবরাহকারী বা বৈধ চুক্তিকে অকারণে প্রশ্নবিদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রতিটি আমদানি সিদ্ধান্তের আগে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে কম ব্যয় ও কম ঝুঁকিতে একই গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওয়া সম্ভব ছিল না।
ষড়যন্ত্র প্রমাণিত না হলেও জ্বালানি মন্ত্রণালয় দায়মুক্ত হতে পারে না। একটি মন্ত্রণালয় অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়াও দুর্বল সিদ্ধান্ত, দেরি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও ব্যর্থ তদারকির মাধ্যমে দেশের বিপুল ক্ষতি করতে পারে। জনগণের কাছে ফলই শেষ কথা : গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ ব্যাহত, শিল্প ক্ষতিগ্রস্তু অথচ আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
এখানে দায় শুধু কোনো একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের নয়। নীতি ও বিনিয়োগের রাজনৈতিক দায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের; পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পেট্রোবাংলার; আর ক্ষেত্রভিত্তিক উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর। দায়ের এই শৃঙ্খল অস্পষ্ট রেখে মূল রাজনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থাও পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। সমস্যাটি ব্যক্তিগত সদিচ্ছার নয়; সমস্যাটি তথ্য যাচাইয়ের কাঠামোয়। যে মন্ত্রণালয়ের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার যদি সেই মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা ব্যাখ্যার ওপরই প্রধানত নির্ভর করে, তবে সিদ্ধান্ত একমুখী বা অসম্পূর্ণ তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কোনো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রতিটি কূপের চাপ, উৎপাদনক্ষমতা, কম্প্রেসরের অবস্থা, পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতা এবং এলএনজি চুক্তির আর্থিক শর্ত নিজে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। মন্ত্রীদের প্রতি ব্যক্তিগত আস্থা স্বাধীন কারিগরি যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি অধীনে প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ, উৎপাদন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, নিরীক্ষক ও ক্রয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন জ্বালানি পর্যালোচনা পরিষদ গঠন করতে হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিজের কার্যক্রমের বিবরণদাতা, বিশ্লেষক ও বিচারক— তিনটিই একসাথে হতে পারে না।
এখন প্রয়োজন তিন ধাপের জরুরি ব্যবস্থা। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিটি ক্ষেত্র ও কূপের টেকসই সক্ষমতা, প্রকৃত উৎপাদন এবং আটকে থাকা উৎপাদনের যাচাইকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে ওয়ার্কওভার, কম্প্রেশন, উন্নয়ন কূপ, প্রক্রিয়াকরণ ও পাইপলাইন প্রকল্পের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এরপর দুই বছরের কর্মসূচিতে প্রতিটি প্রকল্পের বিনিয়োগ, সম্ভাব্য অতিরিক্ত উৎপাদন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও সমাপ্তির সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
একই সাথে অবৈধ সংযোগ, লিকেজ, ভুল মিটারিং এবং অগ্রাধিকারহীন বণ্টন বন্ধ করতে হবে। উৎপাদন বাড়িয়েও যদি অপচয় ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকে, জনগণ তার সুফল পাবে না। প্রতি মাসে প্রাকৃতিক পতন, পুনরুদ্ধার করা উৎপাদন, নতুন উৎপাদন, আটকে থাকা সক্ষমতা এবং গ্রাহকের কাছে বাস্তবে পৌঁছানো গ্যাসের পৃথক হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
‘সঙ্কট’ শব্দের আড়ালে ভূতত্ত্ব, যান্ত্রিক ব্যর্থতা, বিনিয়োগে বিলম্ব ও প্রশাসনিক অবহেলাকে আর একসাথে লুকানো যাবে না। প্রতিটি হারানো বিসিএফের কারণ, দায়ী কর্তৃপক্ষ, পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ও সময়সীমা জনগণকে জানাতে হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে স্লোগান দিয়ে নয়, কূপে কূপে উৎপাদনের হিসাব এবং প্রকল্পে প্রকল্পে বিনিয়োগের ফল দিয়ে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে হবে।
যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত উৎপাদন-পতনের কথা জেনেও দেশীয় গ্যাসে সময়মতো বিনিয়োগ করেনি, সঙ্কটকে ভয়াবহ হতে দিয়েছে এবং পরে ডলারখেকো এলএনজিকে প্রধান সমাধান হিসেবে জনগণের সামনে হাজির করেছে— সেই মন্ত্রণালয়কে এখন প্রতিটি হারানো বিসিএফ, প্রতিটি ব্যর্থ প্রকল্প এবং জনগণের প্রতিটি টাকার হিসাব দিতে হবে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য