জাতীয় সংসদ গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। জনগণ ভোট দিয়ে যাদের সেখানে পাঠান, তাদের প্রধান দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। জনগণের সমস্যা নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করা। তাই সংসদে সরকারি দল থাকবে। বিরোধী দল থাকবে। মতের পার্থক্য থাকবে। যুক্তিতর্ক হবে। কিন্তু সেই তর্ক যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, হট্টগোলে পর্যবসিত হয়, তাহলে শুধু একটি অধিবেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা।

২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি বক্তব্য ঘিরে সাময়িক হট্টগোল নয়; এটি আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতি কোন পথে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটি এই বাস্তবতা আবার মনে করিয়ে দেয়।

বিরোধী দলের একজন সদস্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার প্রশ্নের ধরনকে ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা’র সাথে তুলনা করেন। আরেক জনের প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘পল্টনের বক্তৃতা’ বলে মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য হিসেবে দেখে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি এমন হয় যে, একপর্যায়ে ১০ মিনিটের জন্য সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো— পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সদস্যদের শৃঙ্খলা, সৌজন্য ও সংসদীয় বিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।

প্রশ্ন হচ্ছে— এ ঘটনায় দায় কার? সহজ উত্তর হতে পারে, ‘যিনি বক্তব্য দিয়েছেন, দায় তার’। কিন্তু বিষয়টি সংসদীয় গণতন্ত্রের আলোকে দেখা দরকার। কারণ সংসদীয় সরকারপদ্ধতিতে সরকার ও বিরোধী দল— দুই পক্ষের আলাদা দায়িত্ব আছে। সরকারি দলের দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি না দেখিয়ে সংযত আচরণ করা। আর বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়া, প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অবশ্যই তা হতে হবে সংসদের আচরণবিধি মেনে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। আর বিরোধী দল সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করে। ফলে বিরোধী দল সরকারের প্রতিপক্ষ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতের অন্যতম সাংবিধানিক-রাজনৈতিক উপাদান। তবে বিরোধী দলের দায়িত্ব নিছক সরকারের সমালোচনা নয়। একই সাথে বিকল্প নীতি উপস্থাপন। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ। আর জনগণের স্বার্থকে সংসদীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। নতুন সংসদের সামনে যেমন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব। তেমনই আছে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আছে একটি কার্যকর ও সহনশীল সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার কর্তব্যকাজ।

লক্ষণীয় যে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দু’টি অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তুলনামূলক সহনশীল পরিবেশ আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ২৭ আগস্ট তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের ঘটনা সেই আশাবাদে চিড় ধরিয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সংসদীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের জন্য সীমাহীন ক্ষমতার ছাড়পত্র নয়। সরকারের দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট জনস্বার্থে ব্যবহার করা। বিরোধী দলের বক্তব্য ও সমালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর নিশ্চিত করা। অন্য দিকে একটি কার্যকর বিরোধী দল প্রতিটি সরকারি প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে, এমনটি সংসদীয় গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সংসদে সরকারের সমালোচনার অর্থ হলো— নীতিগত বিরোধিতা। যে প্রস্তাব জনস্বার্থে উত্তম, তা সমর্থন করা। এটিই সংসদীয় বিরোধিতার পরিণত রূপ। এ কারণে সংসদীয় পদ্ধতিতে বিরোধী দলকে ‘বিকল্প সরকার’ বলা হয়। বিরোধী দল শুধু বলবে না সরকার কোথায় ব্যর্থ; তাদের বলতে হবে— ক্ষমতায় থাকলে তারা কীভাবে সমস্যার মোকাবেলা করতেন।

২৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যকে বিরোধী সদস্যরা তাচ্ছিল্যপূর্ণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সেই সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্য প্রত্যাহার বা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা।

ঘটনাটি নিছক একটি সংসদীয় বাদানুবাদ হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য হালকাভাবে নেয়া হবে। সংসদীয় রাজনীতিতে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বক্তব্যের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংসদ হলো রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশের সাংবিধানিক মঞ্চ। সেখানে যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপ বা এমন কোনো ভাষা ব্যবহার হয়, যা প্রতিপক্ষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তাহলে সংসদীয় বিতর্কের মান কমে যায়। অন্য দিকে বিরোধী সদস্যদেরও মন্ত্রীর বক্তব্য আপত্তিকর মনে হলে পয়েন্ট অব অর্ডার, স্পিকারের হস্তক্ষেপ বা কার্যপ্রণালীবিধির নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপত্তি জানানো উচিত।

এ ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো— স্পিকারের প্রতিক্রিয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু একে অপরকে কথা বলতে বাধা দেয়া ভালো লক্ষণ নয়। তিনি কার্যপ্রণালীবিধি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন। একই সাথে সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্পিকারের উদ্বেগ আসলে ত্রয়োদশ সংসদের জন্য সতর্কবার্তা। মতপার্থক্যের প্রকাশের পদ্ধতি সংসদীয় হতে হবে।

ওয়াকআউট সংসদীয় রাজনীতিতে স্বীকৃত রাজনৈতিক প্রতিবাদের পদ্ধতি। কোনো বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ বা জনমত তৈরিতে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু ওয়াকআউট যদি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে তা গুরুত্ব হারাতে পারে। কারণ, বিরোধী দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো সংসদের ভেতরে উপস্থিত থেকে প্রশ্ন করা, বিল পর্যালোচনা করা এবং সরকারের বক্তব্যের বিকল্প ব্যাখ্যা দেয়া।

এখানে বিরোধী দলের সামনে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন আছে। কখন সংসদে থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। আর কখন ওয়াকআউট করতে হবে— তা নির্ণয় করতে পারলেই বিরোধী দলের ভূমিকা কার্যকর হওয়া সম্ভব। তখন জনগণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হবে।

এখন প্রশ্ন হলো— ত্রয়োদশ সংসদে বিরোধী দল কি সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারছে? এখন পর্যন্ত উত্তরটি এককথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা কঠিন। বলা যায়, বিরোধী দল সঠিক ভূমিকা পালনের কিছু লক্ষণ দেখিয়েছে। সংসদীয় আচরণ কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। তবে ইতিবাচক দিক হলো— বিরোধী দল আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি সঙ্কট, রাজনৈতিক সংস্কার ও জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সংসদে তুলছে। ২৭ আগস্টও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।

বর্তমান সরকার তার ১৮০ দিনের মধুচন্দ্রিমা শেষ করেছে। এ সময় বেশ কিছু বিষয়ের মতো আইনশৃঙ্খলার অবনতি চোখে পড়ার মতো। সারা দেশের কথা বাদ দিয়ে শুধু রাজধানীর পরিসংখ্যান দিলেই পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে গলি, সবখানেই মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাই এখন নগরবাসীর নতুন আতঙ্ক। ছিনতাইকারীকে বাধা দিতে গিয়ে কেউ কেউ গুরুতর আহত হচ্ছেন। সবশেষ গত ২৯ আগস্ট এক নারী প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে রাজধানীতে ১৭২টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। (প্রথম আলো, মুদ্রণ সংস্করণ, ৩০ আগস্ট, ২০২৬)

আইনশৃঙ্খলার এই যখন পরিস্থিতি তখন সঙ্গতকারণে বিরোধী সংসদ সদস্যরা তো এ নিয়ে প্রশ্ন করবেনই। তাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গোসসা করার তো কিছু নেই? বর্তমান সংসদের এখন পর্যন্ত যে ধারা চলছে, তাতে সংসদীয় প্রক্রিয়া অন্তত কার্যকর মনে হয়। তবে নেতিবাচক দিকও আছে। ওয়াকআউটের পুনরাবৃত্তি। এ ছাড়া সরকারি দলের কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য চলাকালে বাধা দেয়া এবং সংসদীয় কমিটির কাজ থেকে বিরত থাকার মতো কৌশল দীর্ঘমেয়াদে বিরোধী দলের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা দুর্বল করতে পারে। এসব সত্ত্বেও আপাতত বলা যায়, বর্তমান সংসদে বিরোধী দল সক্রিয়।

মনে রাখা দরকার, সংসদের পরিবেশ রক্ষার দায় একতরফাভাবে বিরোধী দলের নয়। সরকার ও মন্ত্রীদেরও সংসদীয় ভাষা এবং আচরণের উচ্চ মান বজায় রাখতে হবে। কোনো মন্ত্রীর বক্তব্য যদি বিরোধী দলের কাছে অসম্মানজনক মনে হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

ত্রয়োদশ সংসদকে কার্যকর করতে হলে সরকার ও বিরোধী দল— উভয়কে কিছু নীতি মেনে চলতে হবে :

ক্ষমতাসীন অর্থাৎ সরকারকে সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করতে হবে। বিরোধী দলের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে যুক্তিসঙ্গত উত্তর দিতে হবে। বিরোধী দলকেও সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প নীতি উপস্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সংসদের প্রকৃত জবাবদিহি শুধু অধিবেশন কক্ষে বক্তৃতার মাধ্যমে হয় না; কমিটিতে বিস্তারিত পর্যালোচনা সরকারের নীতিকে গভীরভাবে পরীক্ষা করতে সহায়তা করে।

সরকারি দল ও বিরোধী দল দু’পক্ষই যদি নিজেদের ভূমিকার সীমা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে, তা হলেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীলতা এবং বিরোধী দলের গঠনমূলক বিরোধিতার সমন্বয়েই একটি কার্যকর সংসদ গড়ে ওঠে; এ কথা সব সংসদ সদস্যকে মনে রাখতে হবে। তা না হলে চব্বিশের রক্তদান ব্যর্থ হতে পারে। সেটি হলে আমাদের জাতীয় জীবনে তা হবে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এর জন্য আমাদের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

camirhamza@.yahoo.com