মো: শাহাদত হোসেন
ফ্যাসিবাদের সময় যেসব রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পরস্পরের বন্ধু ছিল, যারা একসাথে লড়াই করেছে, দুঃখজনক হলেও সত্যি, তারাই এখন পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে, তারাই একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে। সাদা চোখে একে ক্ষমতার লড়াই মনে হলেও এটি মূলত সামাজিক অবক্ষয়ের ফল।

ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ সতের বছরে দেশে এক অশ্লীল রাজনৈতিক বীজ বুনে গেছে। দলীয় আনুগত্যের বাতাবরণে বিগত ১৭ বছর সব রকমের অন্যায়, অপকর্ম ও অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ফলে অনেকের মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে, দলীয় আনুগত্যের মাধ্যমে সব ধরনের খারাপ কাজ করাও জায়েজ! এই বিষয়গুলো যে কেবল তাদের নেতাকর্মীদের মাথায় ঢুকিয়েছে সেটা নয়, যারা গণ-অভ্যুত্থান করে তাদের বিতাড়িত করেছে তাদের অনেকের ভেতরও ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অবক্ষয়ে সামাজিক অবক্ষয় এতটাই প্রসার পেয়েছে, মানুষ পরস্পরকে তুচ্ছ করতে দ্বিধা করে না, গালাগালি করতে দ্বিধা করে না। শুধু তাই নয়, সমাজের সম্মানিত নারীদের অশ্লীল ছবি তৈরি করে অসঙ্কোচে পোস্ট শেয়ার করছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনেও আছে অশ্লীল ফটোকার্ড। পতিত ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলের কেউ কেউ এসব ফটোকার্ড তৈরি করে ফেক আইডি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়। কুরুচিকর এসব পোস্ট জেনে বা না জেনে অনেকেই শেয়ার করে। সঙ্গতকারণেই নিজদলীয় নেতাকর্মীরা এসব দেখে ক্ষুব্ধ হয় এবং যাচাই-বাছাই না করেই প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এই যে যাচাই-বাছাই না করে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, গত ১৭ বছরে এটি তাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অতীতে রাজাকার ট্যাগ দিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে এবং এগুলোকে বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ পালিয়ে গেলেও সেই ট্রমা থেকে দেশবাসী এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি।

এ থেকে বুঝা যায়, দীর্ঘ ১৭ বছর শোষণকারীরা এখন সুকৌশলে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। দেশের মানুষ মনস্তাত্ত্বিক কারণেই তাদের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে। মানুষকে এই মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় থেকে টেনে তুলতে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের কাছে এটি জনগণের প্রত্যাশাও।

ফ্যাসিবাদী সরকার শুধু রাজনীতি ও অর্থনীতি ধ্বংস করেই থেমে থাকেনি। তারা মানুষের মনুষ্যত্বও ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। একে পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়। এই যে দেশে এত দলান্ধ ও চামচামি করার মতো লোক সৃষ্টি হয়েছে, এটি বিগত স্বৈরশাসনের প্রত্যক্ষ ফল। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র না থাকলে দলেও গণতন্ত্র থাকে না, তখন দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষও গণতান্ত্রিক চেতনার চেয়ে বশ্যতা স্বীকার করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দীর্ঘ ১৭ বছরে এভাবে পুরো একটি জাতিকে বশংবদ জাতিতে পরিণত করা হয়েছে।

কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা জরুরি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এই কাজ সাফল্যের সাথে করে গেছে। আমাদের সংস্কৃতি তথা শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, মানবিকতা, সততা, সহনশীলতা খুবই ভালোভাবে ধ্বংস করে যেতে পেরেছে। নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্ট করা হয়েছে। ফলে মানুষ হয়ে উঠেছে অসহিষ্ণু, অস্থির, দুর্নীতিপরায়ণ, অমানবিক ও বিকৃত রুচির। অপসংস্কৃতির প্ররোচনায় তারা অন্যকে হেনস্তা করতে, লজ্জা দিতে, ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি যে, মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু একই সাথে এটিও সত্য, মানুষ রাজনৈতিক জীব। একজন মানুষের জন্ম, মৃত্যু, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পোশাক, আচার-ব্যবহার, কৃষি, শিল্প, ব্যবসায়, যোগাযোগ সবকিছুই রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়।

একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবটাই রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই যেখানে রাজনীতি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল, সেখানে সমাজও উন্নত। কিন্তু আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর একটি পচা-দুর্গন্ধময় রাজনীতির মধ্যে বসবাস করেছি। এর প্রভাব সামাজিক জীবনেও পড়েছে। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সামাজিক পটপরিবর্তন হয়নি। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক দলগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় আবারো একটি সুশৃঙ্খল ও উন্নত সমাজ গড়ে উঠবে। যেখানে প্রাধান্য পাবে গণতন্ত্র, মানবিকতা, সহনশীলতা ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ

sahadot.hossain@gmail.com