দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট এলাকা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার পাহাড়বেষ্টিত। প্রকৃতির অপার দান হলেও প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। বৃহত্তম চট্টগ্রামের ১৫ হাজার ৮০৯ বর্গমাইল বিস্তৃত এলাকায় মূলত পাহাড়ধসের ঘটনা বেশি ঘটে।

লক্ষণীয়, এক দিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাহাড় কাটা, অন্য দিকে পাহাড়ের পাদদেশে অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে পাহাড়ধসের মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

যখন কোনো স্থানে পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু হয়, তখন এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এমন কথা আমাদের জানা নেই।

নয়া দিগন্তের উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি জনপদ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস এখন এক আতঙ্কের নাম। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত লাখো মানুষ এখনো ঝুঁকিতে। গত এক দশকে (২০১৫-২৪) উখিয়া ও আশপাশ এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।

পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হলে প্রবল বৃষ্টিতে মাটি ধরে রাখা পাহাড়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। গাছের শিকড় মাটি শক্ত করে ধরে রাখার কাজ করে। তাই নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় উজাড় করা হলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। কিছু লোভী মানুষ পাহাড়ের পাদদেশের জায়গা দখল করে সেখানে গরিব মানুষের কাছে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকে। এভাবে একসময় খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হয়।

সঙ্গত কারণে পাহাড়ধস কমিয়ে আনতে হলে বনায়ন করা, গাইড ওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ও শক্ত করে সীমানা প্রাচীর তৈরি করা, পাহাড়ের পানি ও বালু অপসারণের ব্যবস্থা নেয়া, বসতি স্থাপন টেকসই করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালু উত্তোলন না করা, পাহাড় এলাকায় ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, আবাসন প্রকল্প করতে না দেয়া, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন।

একেকটি পাহাড় ধরিত্রীর জন্য খিলানস্বরূপ। কিন্তু এর প্রাকৃতি বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হলে পাহাড় আর ভূ-পৃষ্ঠের ভারসাম্য রক্ষা করার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। অতীতে পাহাড়ধস রোধে প্রশাসনের তরফ থেকে একগুচ্ছ সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই। সেটি কার্যকর করা হলে পাহাড়ধসের পরিমাণ অনেক কমে যেত। কার্যত প্রশাসনিক বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাবে পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। পাহাড়ের কোন অঞ্চল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তা চিহ্নিত করা সত্ত্বেও কেন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না এটি একটি বড় প্রশ্ন। আমরা কি এভাবে প্রতিনিয়ত পাহাড়চাপা পড়ে মরব? অথচ মানুষের জীবন কোনো ছেলেখেলার বিষয় নয়। নয় তুচ্ছ কিছু।