জাতীয় সংসদে ভোটাভুটি শেষে বাংলাদেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সজ্জন রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অভিনন্দন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে। এখন তিনি কেবল বিএনপির নন, তিনি সবার।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে। গণতন্ত্রের যাত্রায় এই প্রক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় আব্দুর রহমান বিশ্বাসের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছিল। এর পরের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। এবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী দেয়ায় বিরোধী দলগুলো প্রশংসা ও অভিনন্দনের দাবিদার। বহুদলীয় কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রার্থী দেয়ার এই সিদ্ধান্ত সংসদীয় প্রথা ও সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে, বিরোধী জোট থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ কর্নেল (অব:) অলি আহমদের মতো যোগ্য, অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতাকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনীত করা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। মানুষের অধিকার আদায়ে তার সংগ্রাম দীর্ঘ। তার পরিমিতিবোধ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রেসিডেন্টের মতো সাংবিধানিক পদে নতুন মর্যাদা যোগ করবে বলেই প্রত্যাশা করছে মানুষ।
সংসদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একক ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এ কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত ছিল, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারপরও এই নির্বাচনে বহুদলীয় অংশগ্রহণ জাতীয় সংসদকে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি পেল।
এই শুভ সময় উদযাপনের পাশাপাশি কিছু নীতিগত বিষয় নিয়ে গভীর অনুধাবনের সুযোগ রয়েছে। চব্বিশের বিপ্লবের আশা ও আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে পরিণত করতে সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনের সংলাপে অংশ নিয়েছিল সবগুলো রাজনৈতিক দল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সময়োপযোগী কিছু প্রস্তাব এসেছিল কমিশন থেকে। সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য স্বাক্ষরের পরিবর্তে গোপন ব্যালটে ভোট দেয়ার প্রস্তাব ছিল। জাতীয় সংসদ সদস্য, জেলা সমন্বয় কাউন্সিল ও সিটি করপোরেশন সমন্বয় কাউন্সিলের সমন্বয়ে ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ গঠনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছিল। একই সাথে ২০২৬ সালের সংবিধাসংক্রান্ত গণভোটে গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির যে রায় এসেছিল, সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারত।
সাংবিধানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিরপেক্ষ থাকবেন। দেশের সঙ্কটে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহনশীলতার বন্ধন তৈরি করতে তিনি অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে- ফ্যাসিবাদের পতনের পর জাতীয় সংসদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যে সূচনা হয়েছে, সেটি যেন থেমে না যায়। এর জন্য রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। গণআকাঙ্ক্ষা ধারণ করার মধ্য দিয়েই টেকসই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
আমরা নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কর্মময় ও সফল মেয়াদ কামনা করি।